Logo
Logo
×

শেষ পাতা

উপকূলের জীবন

দস্যু ও বৈরী প্রকৃতির চাপে জীবনসংগ্রাম

Icon

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দস্যু ও বৈরী প্রকৃতির চাপে জীবনসংগ্রাম

ছবি: সংগৃহীত

দেশের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। চারপাশে নীল সমুদ্র, মাঝখানে পাহাড়, লবণখেত ও ম্যানগ্রোভ বন। এখানকার প্রায় চার লাখ মানুষের জীবন যেন বৈরী প্রকৃতি, দস্যুতা ও উন্নয়নের জটিল চাপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঝড়, অকাল বৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস আর ডাকাতের আতঙ্ক। অন্যদিকে মাতারবাড়ী বা অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ-সব মিলিয়ে মহেশখালীর মানুষের জীবন আজ এক কঠিন সমীকরণে।

এ উপজেলার অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি লবণচাষ। বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে হাজার হাজার শ্রমিক মাঠে নামেন লবণ উৎপাদন করতে। কিন্তু অকাল বৃষ্টি, খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বাজারমূল্যে অস্থিরতায় চাষিরা বারবার লোকসানের মুখে পড়ছেন।

কালামারছড়ার বাসিন্দা লবণচাষি আব্দুল মালেক বলেন, আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম লবণচাষ করে আসছি। আগে মৌসুম ভালো হলে সংসার মোটামুটি চলে যেত। বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরাতাম, সেই ঘামে সংসারের চাকা ঘুরত। কিন্তু এখন সবকিছুই অনিশ্চিত। হঠাৎ বৃষ্টি নামলেই মাঠ ডুবে যায়, কয়েক মাসের খাটুনি এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যায়। কখনো ঘূর্ণিঝড় আসে, কখনো অকাল বর্ষণে লবণ মাটি হয়ে যায়। তখন আর কোনো উপায় থাকে না, ধারদেনা করে দিন চালাতে হয়। তিনি বলেন, সরকারিভাবে লবণচাষিদের সহযোগিতার কথা শোনা যায়, নানা আশ্বাসও দেওয়া হয়; কিন্তু সেটা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে আমরা কোনো সাহায্য পাই না।

মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আরও দুটি খাতের ওপর নির্ভরশীল-মৎস্য আহরণ ও পানচাষ। প্রতিদিন ভোরে শত শত জেলে নৌকা বা ট্রলার নিয়ে জীবনবাজি রেখে সমুদ্রে নামেন। ঝড়-তুফান, ট্রলারডুবি কিংবা জলদস্যু আতঙ্ক যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। সোনাদিয়ার জেলে রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিদিন মৃত্যুভয়কে সঙ্গে নিয়ে মাছ ধরি। ঝড় উঠলে মনে হয় আর হয়তো তীরে ফিরতে পারব না। তবুও সংসারের দায়দায়িত্ব, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদ আমাদের পিছু হটতে দেয় না।

জলদস্যুদের ট্রলার আটকানো, মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতন-এসব ঘটনা এখন জেলেদের নিয়মিত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। সোনাদিয়ার জেলে সালাউদ্দিন জানান, রাতে সমুদ্রে যাওয়া মানেই আতঙ্ক। কখন দস্যু এসে সব নিয়ে যাবে বলা যায় না। জীবন ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। আমাদের প্রতিদিন সতর্ক থাকতে হয়।

শত শত পরিবার পানচাষের ওপর নির্ভরশীল। একসময় এই খাত তাদের আয়ের বড় উৎস ছিল। কিন্তু খরচ বেড়ে যাওয়া, রোগবালাই ও বাজারে অস্থিরতায় পানচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। মনোয়ারা বেগম বলেন, আগে পানের ফলন ভালো হতো, বাজারেও দাম মিলত। এখন সব খরচ মিটিয়ে হাতে কিছুই থাকে না, কখনো লোকসান গুনে ধারদেনা করতে হয়।

স্থানীয় সমাজকর্মী মোজাহার আলম বলেন, উপকূলের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যেমন যুদ্ধ করছে, তেমনই দস্যু-সন্ত্রাসের সঙ্গে লড়াই করছে। কার্যকর নজরদারি ছাড়া এই সমস্যা কমানো সম্ভব নয়। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের নিয়মিত টহল, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের শক্তিশালী উপস্থিতি প্রয়োজন। নীতিগতভাবে স্থানীয় প্রশাসন সচেতন হলেও মাঠে তা প্রায়ই কার্যকর হয় না।

উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আকুতি : মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলছে। সরকারের বড় উন্নয়ন প্রকল্প হলেও স্থানীয় মানুষের বাস্তব জীবনে এর প্রভাব ছিল বিপরীত। প্রকল্পটি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে না পারায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কৃষক নুরুল কবির। তিনি বলেন, আমাদের চাষের জমি চলে গেছে। ক্ষতিপূরণ পেয়েও ভবিষ্যতে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমরা চাই উন্নয়ন হোক, কিন্তু আমাদের না খাইয়ে নয়।

উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের কারণে হাজারো পরিবার উচ্ছেদ হয়েছে। অনেকেই পুনর্বাসনের জন্য অপেক্ষা করছে, তবু প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি তাড়াতাড়ি হওয়ায় তাদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠক কলিম উল্লাহ বলেন, মহেশখালী, সোনাদিয়া ও মাতারবাড়ী-এই তিনটি এলাকা শুধু কক্সবাজারের নয়, পুরো দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে অনন্য জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভ বন ও সমুদ্রসীমা। চাইলে এই অঞ্চলকে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই করা যেত। পরিবেশ রক্ষা করে, স্থানীয় মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত রেখে এবং পর্যটন, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আধুনিকায়ন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয়দের জীবিকা টিকিয়ে রাখা এবং একই সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া। মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মানুষ বহুদিন ধরে লবণচাষ, মৎস্য আহরণ ও পানচাষের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই তিনটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক ঝুঁকি, বাজারের অস্থিরতা এবং চাষাবাদের বাড়তি খরচের কারণে লবণচাষি, জেলে ও পানচাষিরা যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলো সমাধানে সরকার সচেষ্ট। তিনি আরও বলেন, জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য উপকূলের মানুষের জীবনে বড় প্রতিবন্ধকতা। তারা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে না, বরং মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে জীবিকাকে অনিশ্চিত করছে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্তিশালী নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম