সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-অপপ্রচার
সত্যতা মিলেছে ৪৪ শতাংশ অভিযোগের
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অশঙ্কা ছিল বেশি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বেশ তৎপর ছিলেন। মাঠে ছিলেন গোয়েন্দারা। অপপ্রচার নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নেওয়া হয়েছে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। ফলে ব্যর্থ হয়েছে অপপ্রচারকারীদের প্রচেষ্টা।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নির্বাচনের আগের দিন ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে বিকাল সোয়া ৪টা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ১৯০টি অভিযোগ আমলে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে দেখা যায়, এগুলোর মধ্যে ৫৬ ভাগ অভিযোগ মিথ্যা। তবে সত্যতা মিলেছে ৪৪ ভাগ অভিযোগের। এক্ষেত্রে সত্য অভিযোগ ছিল ১০৬টি। এছাড়া মিথ্যা অভিযোগ ছিল ৮৪টি। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
অভিযোগ-১ : অভিযোগ ছড়ানো হয় নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের ধনকুন্ডা পপুলার হাইস্কুল কেন্দ্রে অবৈধভাবে সিল মারছেন স্থানীয় জামায়াতের সাবেক আমির। নির্বাচনের আগের রাতে ভোটকেন্দ্রে উত্তেজনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া জামায়াতের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সাবেক আমির বলে অভিযোগ করেন বিএনপির প্রার্থী আজহারুল ইসলাম (মান্নান)। তার অভিযোগ ছিল বশিরুল হকের সহযোগিতায় কেন্দ্রের ভেতর রাতে ব্যালট পেপার খোলা হয়েছে এবং তাতে সিল মারারও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে দেখেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বশিরুল হক ব্যালট পেপারগুলো বিভিন্ন কক্ষের জন্য সংখ্যা অনুযায়ী আলাদা করছিলেন। অভিযোগের সত্যতা মেলেনি।
অভিযোগ-২ : লক্ষ্মীপুরে বিএনপি কর্মী জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে জামায়াতের অভিযোগ ছিল ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের। তবে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ যাচাই করে সত্যতা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ-৩ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে গাইবান্ধার পালাশবাড়ী থানার মহদীপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড জামায়াতের বাড়ির ছাদে বিপুল পরিমাণ লাঠি মজুত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখান থেকে ২০০টি লাঠি উদ্ধার করে।
অভিযোগ-৪ : ঢাকা-৬ আসনে জামায়াত কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে জুবলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করা হয়। তবে যাচাইকালে এই অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ-৫ : নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের (সিদ্ধিরগঞ্জ) আনারপাড় শেখ মোর্তজা আলী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে জাল ভোট দিতে গিয়ে জামায়াত কর্মী আটকের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। কিন্তু সেটিরও সত্যতা মেলেনি।
আরও অভিযোগ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়া যেসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঢাকা-৫ আসনে সামসুল হক খান স্কুল কেন্দ্রে প্রিন্সিপাল মাহবুবুর রহমানসহ ৭-৮ জন বিএনপি নেতার প্রবেশ, ঢাকা-১৬ আসনে অস্ত্রসহ জামায়াত কর্মী আটকের খবর, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে টাকাসহ হাতেনাতে চিংড়ি প্রতীকের দুই কর্মী আটক, ঝিনাইদহ-৪ আসনে সলিমুন্নেছা কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের আগাম সই করা ২৩ রেজাল্ট শিট, রাজশাহীর চারঘাটে কৃষকদল নেতার হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া, ভোটের আগের দিন সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ফরিদপুর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচন বর্জন, সিলেটের ভোটকেন্দ্রে হট্টগোল, মিরপুরে জাল ভোট দেওয়ার সময় দুই জামায়াত কর্মী আটক, বরগুনা-১ আসনের একটি কেন্দ্রে রেজাল্ট শিটে প্রিসাইডিং অফিসারের আগাম স্বাক্ষর, বগুড়ায় কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুর ওপর হামলা, ফরিদপুরের বোয়ালমারিতে মুদি দোকানের বেঞ্চে ৪০ রাউন্ড গুলি, বগুড়া-৬ আসনে জামায়াতের সিল মারার চেষ্টা, বান্দরবানে সাংবাদিক জামাল উদ্দিনের ওপর হামলা এবং সীমান্ত এলাকায় বিএনপির ভোট ডাকাতির চেষ্টা।
এর মধ্যে সত্যতা মিলেছে ফরিদুপর-২১ আসনের আশাপুর কেন্দ্রে জামায়াত প্রার্থীর অবস্থান, ডা. মাহমুদা মিতুর ওপর হামলার ঘটনার অভিযোগে উত্তেজনা, ভোলার বোরহানউদ্দিনে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, মিরপুরে সিলসহ জাময়াত কর্মী আটক, নোয়াখালীর হাতিয়ায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগে হামলায় এনসিপি কর্মী গুরুতর আহত, সিলেটে জামায়াত নেতার সঙ্গে প্রিসাইডিং অফিসারের গোপন বৈঠক, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বস্তাভর্তি টাকাসহ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা কাজল মৃধা আটক, নোয়াখালীর কবিরহাটে নগদ টাকা বিতরণের সময় জামায়াত নেতা শহিদুল ইসলাম আটক, বরিশাল-৪ আসনে ভোটারদের মধ্যে টাকা বিতরণের সময় স্থানীয় জামায়াত সেক্রেটারি আটক, মেহেরপুরের ঝা ঝা গ্রামে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, কুড়িগ্রাম-২ আসনে এনসিপি প্রার্থী আতিক মুজাহিদের ওপর হামলা, সিলেট-১ আসনে জামায়াত কর্মীর কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, বরিশাল-৪ আসনে বাসায় বাসায় গিয়ে জামায়াত নেতার টাকা বিতরণ, নওগাঁর নারায়ণপাড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ভোট কেনা, সিলেট-৪ আসনে দুই প্রিসাইডিং অফিসারের ভোট চুরির চেষ্টা, পাবনার চাটমোহরে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ জামায়াত নেতাদের এবং পঞ্চগড়ের কুড়ুলিয়ায় হিন্দুবাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ।
আরও সত্যতা মিলেছে : বরগুনা পৌরসভা কেন্দ্রে রেজাল্ট শিটে অগ্রিম স্বাক্ষর, গাইবান্ধার সাঘাটায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সিলেটের বালাগঞ্জে প্রিসাইডিং অফিসারকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা, ঝিনাইদহে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার এজেন্টের স্বাক্ষরিত রোজল্ট শিট জব্দ, ট্রাক প্রতীকের সমর্থকের বাড়িতে হামলার লাইভ ভিডিও, আশুলিয়ায় দুইটি ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা বিএনপি নেতাকর্মীদের, লক্ষ্মীপুরে ভোটকেন্দ্র অরক্ষিত রেখে জামায়াত নেতার বাড়িতে সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার খাবার খেতে যাওয়া, চট্টগ্রাম-৯ আসনে একটি বাড়ি থেকে অস্ত্রসহ রোহিঙ্গা নাগরিক আটক, ঢাকা-৬ আসনে আনসার সদস্যদের ওপর জামায়াত কর্মীদের হামলার অভিযোগ, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিএনপি সমর্থকের বাড়িতে দুই নির্বাচন কর্মকর্তা, সূত্রাপুরে জামায়াত কর্মীর টাকা বিতরণের অভিযোগ, বগুড়ায় ধুনটে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদল নেতাকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগ, বরিশালের উজিরপুরে দুই সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার বহিষ্কার, বগুড়া-৩ আসনে ভোট কেনার অভিযোগে জামায়াত নেতাকে গণধোলাইয়ের অভিযোগ, গোপালগঞ্জ সদরে ককটেল বিস্ফোরণ, বাধার মুখে রাজধানীর মির্জা আব্বাস ডিগ্রি কলেজের ভোটকেন্দ্রে শাপলা কলির পোলিং এজেন্টের প্রবেশে ১০ মিনিট দেরি, ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা-৭ আসনে ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ, ভোলা-১ আসনের এক কেন্দ্র থেকে দাঁড়িপাল্লার এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ।
ভাইরাল ভিডিও : রাজশাহীর দগুর্গাপুরের ভোটকেন্দ্র ফুটবল ও ধানের শীষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ভিডিও ভাইরাল হয়। যাচাইকালে ওই ভিডিওর সত্যতা পায় পুলিশ। আরও সত্যতা পাওয়া যায়-টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে ধানের শীষ ও তালা প্রতীকের সংঘর্ষ, মুন্সীগঞ্জের একটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত, ময়মনসিংহের ভালুকায় হরিণ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ, সুমামগঞ্জ-১ আসনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ, মেহেরপুরের মুজিবনগরে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, শেরপুরে ব্যালট বই ছিনতাই, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা ও গোপন কক্ষের ছবি তোলা, ভোটকেন্দ্রের বাইরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগে কুমিল্লা সদরে যুবদল নেতা ১২ ঘণ্টার পুলিশ হেফাজতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা, কুমিল্লা-৬ আসনের একটি কেন্দ্র থেকে দাঁড়িপাল্লার এজন্টদের বের করে দেওয়া, নোয়াখালীর সিরাজপুরে ভোটকেন্দ্রের সামনে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ এবং পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার সময় যুবশক্তি নেতা গ্রেফতারসহ বেশকিছু অভিযোগ।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে এবার আমরা আগে থেকেই কনসার্ন ছিলাম। সাইবারজগতে ওত পেতে ছিল আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম। নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো পোস্ট সামনে পড়লেই তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলোর ফ্যাক্ট চেক করা হয়েছে। যেসব পোস্টের সত্যতা মিলেছে, সেগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেগুলোর সত্যতা মেলেনি, সেগুলো এরিয়ে যাওয়া হয়েছে।

