Logo
Logo
×

শেষ পাতা

হাতিয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা

Icon

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হাতিয়ায় গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা

নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভ্রান্তি ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর দাবি-জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার জেরে তার ওপর হামলা ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির দাবি এটি একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এদিকে, ভুক্তভোগীর স্বামী নিখোঁজ থাকায় মামলা হয়নি। ওই নারীর নিরাপত্তায় হাসপাতালে বডি ওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রোববার নোয়াখালীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা দিলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। এর আগে শনিবার রাতে ঢাকায় এনসিপি বিক্ষোভ করে। এদিকে, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে কমিটি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

হাতিয়ার নলেরচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তিন সন্তানের জননী (৩২) ভুক্তভোগী নারী শনিবার দুপুরে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে প্রথমে মারধরের কথা বললেও পরে চিকিৎসকদের কাছে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে মারধরের অভিযোগ ছিল। পরে যৌন নির্যাতনের কথা জানালে তাকে গাইনি বিভাগে ভর্তি করা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ভুক্তভোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে থানা বা আদালতের নির্দেশনা না থাকায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখনো করা সম্ভব হয়নি।

হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নুরুল আনোয়ার জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ, মেডিকেল রিপোর্ট, সাক্ষ্য ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এটি অতিরঞ্জিত প্রচারণা হতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম বলেন, এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে শুক্রবার রাত ও শনিবার সকালে এনসিপি ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা এখনো মেলেনি। অভিযোগ পেলে বিস্তারিত তদন্ত করা হবে। সুধারাম মডেল থানা পুলিশের ওসি মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তায় পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।

ভুক্তভোগী নারী আরও জানান, শুক্রবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তিন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করে। ‘কালা এমরান’ ও অজ্ঞাতনামা একজন দরজায় পাহারায় ছিল এবং ‘রহমান’ নামের এক ব্যক্তি তাকে আলাদা কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় তার স্বামীকে বেঁধে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়াই ছিল হামলার মূল কারণ। ঘটনার পরদিন সকালে ৫০ থেকে ১০০ জনের একটি দল লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী নারী। ঘরের দরজা-জানালা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয় এবং তাকে টেনে বের করে মারধর করা হয়। শাপলা কলিতে ভোট দেওয়া নিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। তিনি বলেন, প্রথমে সামাজিক লজ্জা ও ভয়ের কারণে বিষয়টি গোপন রাখলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসা নিতে এসে ঘটনাটি প্রকাশ করেন।

এদিকে, ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত রহমান বলেন, এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তার দাবি-তাকে একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার জন্য অর্থের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল; তা প্রত্যাখ্যান করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।

শনিবার রাতে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে ১১ দলীয় জোটের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ হাসপাতালে গিয়ে ভুক্তভোগীর খোঁজ নেন। একই সময় নোয়াখালী-৪ আসনে পরাজিত জেলা জামায়াতের আমির ইসহাক খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলাম ভিডিও কলে ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় নেতারা সোমবার নোয়াখালী সফর করবেন বলে কেন্দ্র থেকে জানানো হয়েছে। এদিকে, রোববার দুপুর ১২টায় নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ থেকে এনসিপি বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিলেও তা করা হয়নি। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. বোরহান উদ্দিন জানান, কর্মসূচি একদিন পিছিয়ে সোমবার করা হয়েছে।

হান্নান মাসউদ অভিযোগ করেন, হাতিয়ায় একাধিক ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে এবং প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। দ্রুত সেনাবাহিনী মোতায়েন ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান তিনি। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য তুহিন ইমরান বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, মব সৃষ্টি করে এসব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলা উদ্দুর বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন; রাজনৈতিক কারণে ঘটনাটি প্রচার করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীর নিরাপত্তায় পুলিশ : রোববার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানান, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও একজন সহকারী উপ-পরিদর্শকের (এএসআই) নেতৃত্বে সাত সদস্যের পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এসআই সায়মার নেতৃত্বে একজন নারী এএসআই, দুজন নারী কনস্টেবল ও তিনজন পুরুষ কনস্টেবল ভুক্তভোগীর কেবিনের সামনে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগীর সঙ্গে থাকা এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির চানন্দি ইউনিয়ন আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ায় ভুক্তভোগীর স্বামী হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে ফিরিয়ে এনে মামলা করা হবে।

ভুক্তভোগীর বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা পরিদর্শন করছেন। অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। লিখিত অভিযোগ ও মেডিকেল পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

ঢাকায় বিক্ষোভ : হাতিয়ায় ধর্ষণ ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার রাত পৌনে ১২টায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শাহবাগে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনসহ নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এনসিপির নেতারা জানান, ভোটাধিকার প্রয়োগের কারণে কোনো নাগরিকের ওপর সহিংসতা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। অবিলম্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা জোরদারের দাবি জানান তিনি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম