মহান ভাষার মাস
ভাষাশহীদদের ঋণ শোধ কীভাবে হবে: মুহাম্মদ ইসমাইল
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে উচ্চশিক্ষা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ইংরেজির অপ্রয়োজনীয় আধিপত্য লক্ষ করা যায়। অনেক সময় নাগরিকরা নিজ দেশে বাংলা ভাষায় সেবা পেতে বাধার সম্মুখীন হন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসমাইল মনে করেন, ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়, এটি আত্মপরিচয়, অধিকার ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।
রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ যে তরুণরা রাজপথে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাদের রক্তে রচিত হয়েছিল ভাষার অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়-এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও বার্ষিক শ্রদ্ধা নিবেদনই কি ভাষাশহীদদের ঋণশোধের জন্য যথেষ্ট ভাষা শহীদদের ঋণ শোধ শুধু শহীদ মিনারে যাওয়া, ফুল দেওয়া কিংবা আলোচনা সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত ঋণশোধ নিহিত আছে তাদের আত্মত্যাগের মূল চেতনা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মধ্যে। সেই চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা।
তিনি আরও বলেন, দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার এত বছর পর বাংলা ভাষা আজও নানা ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। উচ্চশিক্ষা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ইংরেজির অপ্রয়োজনীয় আধিপত্য স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে নিজের দেশের নাগরিক হয়েও মানুষ বাংলা ভাষায় সেবা পেতে বাধার সম্মুখীন হন। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। এই বাস্তবতায় ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের ঋণ কীভাবে শোধ হবে, সে প্রশ্ন আরও গভীর হয়।
ভাষাশহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সব সরকারি দপ্তর, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল সেবায় বাংলার বাধ্যতামূলক প্রয়োগ প্রয়োজন। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই হতে পারে ভাষাশহীদদের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার ভূমিকা নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। গবেষণায় প্রমাণিত, মাতৃভাষায় শিক্ষা শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করে। ইংরেজি বা অন্যান্য ভাষা শেখা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন বাংলাকে প্রতিস্থাপন না করে। বাংলা হবে শিক্ষার ভিত্তি, আর অন্যান্য ভাষা হবে দক্ষতা বৃদ্ধির সহায়ক-এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাতি গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আমরা দেখতে পাই, সব গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো ভিনদেশি ভাষায় লেখা। আমরা নিজেদের জন্য বইগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদটা পর্যন্ত করতে পারিনি। অথচ উন্নত দেশগুলোতে মাতৃভাষার বাইরে অন্যান্য ভাষাগুলো শুধু দক্ষতা হিসাবেই শেখানো হয়। উদাহরণস্বরূপ চীন, ফ্রান্স ও জাপান।
ভাষাশহীদদের ঋণশোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাংস্কৃতিক চর্চা। বাংলা সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও লোকসংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুদ্ধ ও সৃজনশীল বাংলা ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজন। অযথা বিদেশি শব্দের আগ্রাসন, বিকৃত বানান ও ভাষাগত অবহেলা বাংলার সৌন্দর্য ও শক্তিকে ক্ষুণ্ন করছে। এ প্রবণতা রোধে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করা জরুরি।
