Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

ধানমন্ডির বাহারি ইফতারসামগ্রী

স্বাদ, বৈচিত্র্য ও সামাজিক মিলনমেলার সংমিশ্রণ

মো. জহিরুল ইসলাম

মো. জহিরুল ইসলাম

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাদ, বৈচিত্র্য ও সামাজিক মিলনমেলার সংমিশ্রণ

রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি দোকানে শনিবার ইফতারসামগ্রী কিনছেন ক্রেতারা -যুগান্তর

রমজানের সোনালি বিকাল নামতেই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি রূপ নেয় এক বর্ণিল উৎসবে। করপোরেট ও সুশীল সমাজের পাশাপাশি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বসবাসের জন্য পরিচিত এই এলাকা মাহে রমজানে পায় ভিন্নমাত্রা। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাত, সড়ক, লেকপারজুড়ে বসানো হয় ইফতারের স্টল। ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোড থেকে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড ও ধানমন্ডি ১৫ নম্বর পর্যন্ত রেস্তোরাঁগুলো ভরে ওঠে রোজাদারদের ভিড়ে। বিকালের পর থেকে এলাকা ভরে যায় গরম তেলে ভাজা বেগুনি-পিয়াজু, কাবাবের ধোঁয়া, জিলাপির মিষ্টি সুবাস ও শরবতের ঠান্ডা আমেজ, যা সন্ধ্যার বাতাসকে করে তোলে অনন্য।

ফুটপাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ পর্যন্ত বড় ডেকচিতে সাজানো থাকে হালিম, কাবাব, গ্রিল চিকেন, নান-পরোটা, ফ্রুট প্ল্যাটার, ফালুদা ও শরবত। সবমিলিয়ে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।

সরেজমিন দেখা গেছে, দুপুর থেকেই ইফতার সামগ্রীর দোকানগুলোতে ভিড় শুরু হয়। তৃতীয় রোজা শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় ইফতার কেনাকাটার উৎসবে মেতে ওঠেন মানুষ। ধানমন্ডি ১ নম্বর রোড সীমান্ত স্কয়ার, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, ধানমন্ডি ১৫ নম্বর, রবীন্দ্র সরোবর ও ২৭ নম্বর সড়ক, প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়ে ইফতার বাজার, প্যাকেজ ও বাফেট। কেউ পরিবার নিয়ে ইফতার বাজার করছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বসেই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ইফতার করার আয়োজন করছেন।

ধানমন্ডি ১ নম্বরের স্টার হোটেল অ্যান্ড কাবাব-এ রয়েছে ৫২ রকমের ইফতার আইটেম। খাসির গ্রিল চাপ (১৪৫০ টাকা কেজি), লেগ কাবাব ও লেগ রোস্ট (প্রতি পিস ৮০০ টাকা), চিকেন ফুল রোস্ট (৩৪০-৪৫০ টাকা), খাসির কালাভুনা (১৫৫০ টাকা কেজি), ব্রেইন মাসালা (১১০০ টাকা কেজি), খাসির হালিম (১৩৫ টাকা পেয়ালা)সহ কাটলেট, ড্রামস্টিক, সাসলিক, চিজবল, ফিশ ফিঙ্গার, পনির সমুচা, বেগুনি, পিয়াজু, আলু চপ, জিলাপি ও মালাই জিলাপি, ছোলাবুট, ডাবলি, পেস্তা ও লাবাং শরবত। ম্যানেজার মারুফ বলেন, সবাইকে মাথায় রেখেই ইফতারের আয়োজন করা হয়।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের চাটগাঁইয়া ঐতিহ্যের গল্প রেস্টুরেন্ট-এ পাওয়া যায় বিফ হালিম (২৫০-২৫০০ টাকা), ছোলা বুট (৩০০ টাকা), সাসলিক (১২০ টাকা), বেগুনি (১৫ টাকা), পেস্তা বাদাম শরবত (৪০০ টাকা) ও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গরুর আখনি বিরিয়ানি (৩৩০ টাকা থেকে)। ম্যানেজার মো. শাওন বলেন, গত বছরের তুলনায় দাম কমিয়েছি, বিক্রিও ভালো যাচ্ছে। প্রথম ১০ রোজা তুলনামূলক শান্ত থাকলেও এরপর ভিড় বেড়ে যায়।

একই সড়কে সাবেক মুঘল কাবাব হাউজ-এ ৫০টির বেশি আইটেমের ইফতার পাওয়া যায়। এর মধ্যে বোম্বে জিলাপি (৩৮০ টাকা কেজি), রেশমি জিলাপি (৫২০ টাকা), স্পেশাল চিকেন সাসলিক (২০০ টাকা), রেশমি কাবাব (৩০০ টাকা), মহব্বতের শরবত (৪০০ টাকা লিটার), বিফ তেহারি (৩০০ টাকা), মোরগ পোলাও (২৭০ টাকা)সহ আরও নানা মুখরোচক আইটেম। ম্যানেজার মো. একরামুল হক বলেন, মূলত রমজানের ৮-১০ রোজার পর বিক্রি বেড়ে যায়।

ফুটপাতের স্টলগুলোতেও ভিড় চোখে পড়ে। ছোলা ৩০-৫০ টাকা প্লেট, বেগুনি-পেঁয়াজু ১০-১৫ টাকা, আলুর চপ ১০-২০ টাকা, জিলাপি ১৮০-২৬০ টাকা কেজি, শরবত ২০-৪০ টাকা গ্লাসে বিক্রি হচ্ছে।

গাউছিয়া টুইন পার্ক-এ ৮০০-১৭০০ টাকা পর্যন্ত ইফতার ও ডিনার বাফেট রয়েছে। দ্য প্যান প্যাসিফিক লাউঞ্জে জনপ্রতি ১৭০০ টাকায় ইফতার-ডিনার, সেহরি ১৩০০ টাকা, প্রায় ২০০ আইটেমের আয়োজন ও তিন ঘণ্টার সময়সীমা। সেহরিতে দেশীয় মাছ, ভর্তা, ডাল-ভাতসহ বাঙালিয়ানা মেন্যুও থাকছে।

জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এএনজেড স্কয়ার ভবনের সপ্তমতলায় সৌদি আরবের স্বাদের খোঁজে এরাবিয়ান খেবসা রেস্টুরেন্ট-এ লাহাম কুজি (৬৫০০ টাকা, ৫-৬ জনের জন্য), চিকেন ডিজাজ মাদঘুধ ও চিকেন মাগলি (৯৯৫ টাকা, দুজনের জন্য), আলফাহাম, খেবসা, ওলাহাম কাম্বলি (৫১৫-২৫০০ টাকা) পাওয়া যাচ্ছে।

ম্যানেজার নাজমুল হক জিতু বলেন, সিগনেচার আইটেমগুলো তুলনামূলক কম দামে সবাইকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।

ধানমন্ডি ৮ নম্বর রবীন্দ্র সরোবরে জুসবার অ্যান্ড কাবাব, কাবাব বাড়ি, কাবাব কারিগরসহ আরও কয়েকটি রেস্তোরাঁতে চিকেন চাপ (১৭০ টাকা), বিফ বটি কাবাব (১৮০ টাকা), বিফ চাপ (১৭০ টাকা), খিড়ি কাবাব (১৫০ টাকা) ও বুট মুড়ি পেঁয়াজ পাওয়া যায়। সঙ্গে বিভিন্ন ফ্রুট জুস, লাচ্ছি ৭০-১৩০ টাকা।

ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের স্বাদে চাটগাঁ ঐতিহ্যের গল্প রেস্টুরেন্টে ক্রেতারা সন্তুষ্ট। স্থানীয় ড. এস এম নেওয়াজ বলেন, দাম মোটামুটি ভালো। ক্রেতারাও প্রথম থেকেই স্বাভাবিকভাবে কেনাকাটা করছেন। আমি মাঝেমধ্যে নিজেও এসব বাজার থেকে ইফতার সামগ্রী কিনি।

ধানমন্ডি ২৭ নাম্বার রোডে মুঘল কাবাব হাউজ-এ জিলাপি ও হালিম কেনার জন্য অনেকেই বাইরে থেকেও আসেন। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এরাবিয়ান খেবসা রেস্টুরেন্টও ইফতারে বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে।

জিগাতলা থেকে সাত মসজিদ রোড ফুটপাতে বিভিন্ন ইফতারির দোকান থেকে বিভিন্ন হকার ও দিনমজুররা কেনাকাটা করেন। স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ, আকাশ, রুপম ও নাসির বলেন, বড় রেস্টুরেন্ট থেকে খরচ সম্ভব নয়, তাই ফুটপাত থেকে কিনি।

ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোডে গাউছিয়া টুইন পার্কে ১২-১৪টি বাফেট, চাইনিজ ৫-৬টি ও নরমাল রেস্তোরাঁ ২৩টি। রিং জিং রেস্তোরাঁ, এরিস্ট কার্ড লাউঞ্জ, ক্যাফে ডলচে, মেরিটেজ ঢাকা, দ্য প্যান্ট প্যাসিফিক লাউঞ্জ যেখানে ৪৯৯-১০০০ টাকা পর্যন্ত বাফেট, ৫০-১২০ আইটেম। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পিলক্স, লাইলাতি, কাসুন্দি, সুবাস্তু টাওয়ারে কাচ্চি ভাই, সাং হাই রেস্তোরাঁ, ক্লাব হাউজ ঢাকা, কিংস কনফেকশনারী, হাংরি রোস্টার, সিরাজ চুরি গোস্ত, খানার, সুলতান ডাইন, কাচ্চি ডাইনসহ আরও বহু রেস্তোরাঁয় বাফেট রয়েছে।

সবমিলিয়ে ধানমন্ডিতে এখন প্রায় দুই শতাধিক রেস্তোরাঁ ও অস্থায়ী স্টলে প্রতিদিন বিকালে জমছে ইফতারের বাজার। কেউ ঐতিহ্যের টানে, কেউ অফারের লোভে, কেউ নতুন স্বাদের সন্ধানে ছুটে আসছেন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .