সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত
জুলাই যোদ্ধার বিরুদ্ধে ‘জুলাই হত্যা মামলা’
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশকে বৈষম্যমুক্ত করে নিরাপদ আর্থ-সামাজিক জীবন নিশ্চিত করতে জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন রাজিব। দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও রাজিবের জীবনে আলো আসেনি। তাকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভয়ানক সব বিপদ। এর মধ্যে জুলাই হত্যার মতো ফৌজদারি অপরাধের মামলায় জড়িয়েও তাকে চরমভাবে হয়রানি করা হয়েছে। তিনি আন্দোলনে অংশ নেন পুরান ঢাকা এলাকায়। তার ওপর তখন পুলিশের নির্যাতন নেমে আসে। মুক্ত দেশে শ্বাস ফেলার সময়ে তাকে উত্তরায় একটি হত্যা মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়। সেই থেকে রাজিব পুলিশ আর সমাজের দুর্বৃত্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে এক অবর্ণনীয় সংগ্রামে লিপ্ত। কবে তিনি জুলাই হত্যা মামলার কল্পিত দায় থেকে মুক্তি পাবেন তাও জানেন না।
যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকায় আওয়ামী লীগের পলাতক কাউন্সিলর আউয়ালসহ ফ্যাসিবাদের দোসরদের চক্রান্তের শিকার হন রাজিব। বিনা অপরাধে ৬ মাস জেল খেটেছেন তিনি। জামিন পেতে খরচ হয়েছে তার ২৫ লাখ টাকা। মামলায় জড়িয়ে হারিয়েছেন মান-সম্মান, অর্থ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সন্তানদের লেখাপড়া। দখল করে নেওয়া হয়েছে তার দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মামলা প্রত্যাহারের আশায় এখন ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। পুলিশের আচরণে তাদের প্রতিও রাখতে পারছেন না বিশ্বাস। কারণ, জুলাই আন্দোলনের পর নতুন বাংলাদেশের পুলিশের হাতেই তিনি হয়েছেন হয়রানি-নির্যাতনের শিকার।
আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে ৫ আগস্ট পরবর্তী পুলিশ। আবার এই পুলিশই তাকে ‘ভালো মানুষ’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিয়েছে। এর বিনিময়েও তাকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত রিয়াজ পুলিশের খাতায় এখন জুলাই যোদ্ধা হয়েও আজ তিনি অপরাধী। গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হয়রানির বিষয়টি নিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীর কাছে অভিযোগও করেছেন।
রিয়াজ উদ্দিন রাজিব যুগান্তরকে বলেন, ২০২৪ সালে স্বৈরাচার সরকারের বিদায়ের পর সবাই বেশ খুশিই হয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ আমলে যারা আমাকে নির্যাতন ও হয়রানি করেছে, আমার সহায়-সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে থেকে পাঁচটি মামলা ও সাতটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদের দোসররা পালিয়ে যাওয়ার পর আমি আমার সহায়-সম্পত্তি ফিরে পাই। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই ফের সক্রিয় হয়ে উঠে সেই পুরোনো দোসররা।
২০২৫ সালের জুনে চকবাজার থানার এসআই হাসান আমাকে থানায় ডাকেন। থানায় যাওয়ার পর গালাগালির পর বলেন, ‘আপনার ভোগ-দখলে যেসব দোকানপাট (১৮টি দোকান, যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা) আছে সেগুলোর চাবি দিন। চাবি না দিলে আপনার বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন। আমি তার ওই হুমকি রেকর্ড করি। এ কারণে আমাকে থানার লকআপে ঢুকিয়ে ফেলে। পরে ওই রেকর্ড ডিলিট করে আমাকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘এর কিছুদিন পর আমার হোয়াটসঅ্যাপে কল করে যুবলীগ নেতা পরিচয়ে হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে থানায় জিডি করতে চাইলে পুলিশ একটি অভিযোগ নেয়। তবে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে রাজিব বলেন, ‘২০২৫ সালের ২২ জুলাই আইনজীবী পরিচয়ে আমাকে একজন আদালতপাড়ার একটি রেস্টুরেন্টে (স্টার হোটেল) ডাকেন। সেখানে যাওয়ার পর কয়েকজন লোক আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে গাড়িতে তুলে ফেলে। এরপর বলা হয়, ‘আপনি মার্ডার করেছেন। আপনার নামে মামলা আছে। আপনাকে ডিবি অফিসে যেতে হবে।’ আমাকে বলা হয়, ‘আপনি তো আওয়ামী আমলের মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রীর ভাতিজা, আপনি আওয়ামী লীগের অর্থের জোগানদাতা ও যুবলীগ নেতা।’ এসব কথা শুনে পুরো ট্রমাটাইজড হয়ে যাই আমি। ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা সিনিয়র কর্মকর্তাকে বলেন, ‘স্যার, ‘উনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো সত্য নয়। উনি একজন জুলাই যোদ্ধা।’ পরে ওই সিনিয়র অফিসার বলেন, তার নামে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি হত্যা মামলা আছে। ওই মামলায় শেখ হাসিনাসহ প্রায় ২০০ জন আসামি। রিয়াজ হলেন ৪৯ নম্বর আসামি। আমাকে ডিবির লকআপে ঢুকিয়ে রাখা হয়। পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ওই দিন সন্ধ্যায় ডিবির উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা আমার কাছে জানাতে চান-আমি কোনো মামলা করেছি কিনা। আমি জানাই, দখলদারদের বিরুদ্ধে আমি ৫টি মামলা ও সাতটি জিডি করেছি। তখন ডিবি কর্মকর্তা বলেন, মামলা করলে তো মামলা খাবেনই। আপনার পেছনে অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা ষড়যন্ত্র করছে। আপনি কী আওয়ামী লীগের অর্থের জোগানদাতা? জবাবে আমি বলি, ‘আমার নিজেরই তো অর্থ নেই। আমি কীভাবে অর্থ দেব?’ এটা শুনে তারা আমাকে আরও মামলা দেওয়ার হুমকি দেন। বংশাল থানার এসআই মনির সেখানে হাজির হয়ে আমাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান। পরদিন বিকাল ৫টায় আমাকে উত্তরা পশ্চিম থানার মামলায় আদালতে হাজির করা হয়। আদালত আমাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন। প্রায় ৬ মাস জেল খাটার পর সম্প্রতি জামিন পাই। আমাকে জেলে নেওয়ার পর ফের আমার দোকানপাটগুলো দখল করে নেওয়া হয়।
এদিকে পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, রাজিবের বিরুদ্ধে যে মামলা দেওয়া হয়েছে সেটি সঠিক নয়। তার বাসা বংশালে। কখনো উত্তরা এলাকায় যাননি তিনি। তারপরও তাকে উত্তরা পশ্চিম থানার মামলায় আসামি করা হয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদনেই তাকে জুলাই যোদ্ধা হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অথচ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে বাসায় থাকতে পারছেন না। সব সময় ভয়ে থাকেন, কখন যেন ফের পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
জানতে চাইলে বংশাল থানার ওসি একে মাহফুজুল হক যুগান্তরকে বলেন, আমি গত ডিসেম্বরে এই থানায় যোগদান করেছি। আমি যোগদানের পর রিয়াজ উদ্দিন রাজিব নামে কাউকে থানায় ডাকা হয়নি। কোনো নির্যাতনও করা হয়নি। আগের কোনো অফিসার যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে এবং ওই অফিসার যদি এখন বংশাল থানা এলাকায় কর্মরত থাকে, তাহলে অভিযোগ দিলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
৩ জানুয়ারি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া এক প্রতিবেদনে উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই জিল্লুর রহমান বলেন, রিয়াজ উদ্দিন রাজিব সপরিবারে পুরান ঢাকার আবুল হাসনাত রোডে থাকেন। তিনি আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তার স্বভাব-চরিত্র ভালো। তার বিরুদ্ধে নীতিবিরোধী কার্যকলাপের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রভাতী সমাজ কল্যাণ সংসদের এক প্রত্যয়নপত্রে বলা হয়, সৎ চরিত্রের অধিকারী রিয়াজ উদ্দিন রাজিব কোনো নীতিবিরুদ্ধ কাজের সঙ্গে জড়িত নন। কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা দলের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। ২ জানুয়ারি বংশাল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আহসানুল ইসলাম এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, রিয়াজ উদ্দিন রাজিব একজ ব্যবসায়ী। গোপনে ও প্রকাশ্যে তদন্তে তার স্বভাব-চরিত্র ভালো বলে জানা যায়। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। ২১ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে বংশাল থানার এএসআই রিয়াজুল হকও একই ধরনের তথ্য উপস্থাপন করেন। ৫ জানুয়ারি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের এক আদেশ অনুযায়ী, রিয়াজ উদ্দিন রাজিবের দোকান ও সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কমিশনার। এর জের ধরেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

