Logo
Logo
×

শেষ পাতা

প্রতারক বাপ্পির স্বীকারোক্তি

কাজে যোগ দিতে গিয়ে প্রার্থীরা বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন

সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাজে যোগ দিতে গিয়ে প্রার্থীরা বুঝতে পারেন প্রতারিত হয়েছেন

‘আমি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলাম। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেখানে যাওয়ার পরও ভালো কাজ পাইনি। শূন্য হাতে সেখান থেকে ফেরত আসি। দেশে আসার পর বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে মিশে যাই। চক্রের সহায়তায় মার্কিন দূতাবাসে চাকরি দেওয়ার নামে চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছি। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামেও প্রতারণা করেছি। নিয়োগ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে কম্পিউটার দোকানে তৈরি করতাম। নিয়োগপত্র হাতে দেওয়ার সময়ই টাকা নিয়ে নিতাম ভিকটিমদের কাছ থেকে। দূতাবাসে যোগ দিতে যাওয়ার পর প্রার্থী বুঝতে পারেন যে, তিনি প্রতারণার খপ্পরে পড়েছেন। এদিকে টাকা নেওয়ার পর আমি মোবাইল ফোন সেটটি পরিবর্তন করে ফেলতাম। এ কারণে প্রতারিতরা আর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন না। এভাবে আমার ভালোই চলছিল। সম্প্রতি বিদেশে লোক পাঠানোর নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করি। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধরা খেয়েছি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে।’ ডিবির জালে আটকা হওয়ার পর এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রতারক শাহারুল ইসলাম বাপ্পি।

বাপ্পির গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার খেমিরাদিয়ার গ্রামে। থাকেন টঙ্গীর স্টেশন রোডে। গ্রেফতারের পর তিনি ডিবিকে জানিয়েছেন, যার কাছ থেকে যত টাকা পেয়েছেন ততই নিয়েছেন। জনপ্রতি ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২০-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলেছেন, যেহেতু ধরা খেয়েছি, কারও সঙ্গেই বেইমানি করব না। সবার টাকাই ফেরত দেব। তিনি বলেন, বিদেশে লোক নেওয়ার নামে প্রতারণায় যুক্ত হয়েছি সাব্বির নামের একজনের সঙ্গে। তার অফিস বা বাসার ঠিকানা আমি জানি না। তার সঙ্গে দেখা হয় উত্তরার নর্থ টাওয়ারের কফিশপে। তিনি একেকবার একেক নম্বর থেকে ফোন দিত। তাকে ধরিয়ে দিতে চাপ দেওয়া হলেও আমি সেটা পারব না। প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই ধরা খেয়ে গেলাম। এর আগে কখনো এ কাজে জড়িত ছিলাম না। দূতাবাসসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করতাম।

ডিবি সূত্র জানিয়েছে, কেবল বাপ্পি একাই নয়। তার চক্রে আছেন বেশ কয়েকজন। এদের মধ্যে বাপ্পির সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে বাচ্চু মিয়া নামের এক সহযোগীকে। পালিয়ে গেছেন সাব্বির আহমেদ নামে অপর সহযোগী। তবে সাব্বিরের নামটি সঠিক না-ও হতে পারে। কারণ, তার নামটি জানা গেছেন বাপ্পির বর্ণনায়। কৌশলগত কারণে বাপ্পি ওই নামটি মিথ্যাও বলতে পারেন। তবে তার দুইটি মোবাইল নম্বর পাওয়া গেছে। তার সঠিক নাম পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি তাকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। এ চক্রের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবী থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। মামলার বাদী ডিবি মিরপুর বিভাগের এসআই রাজিব মজুমদার। মঙ্গলবার রাতে মিরপুর দারুস সালাম থানাধীন মাজার কো-অপারেটিভ মার্কেটে অভিযান চালিয়ে বাপ্পি এবং বাচ্চুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জাল নথি, সিল, স্ট্যাম্প ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। মামলার এজাহারে রাজিব মজুমদার বলেন, ১০ মার্চ রাতে বিশেষ অভিযান চলাকালে খবর পাওয়া যায়, দারুস সালাম থানাধীন মাজার কো-অপারেটিভ মার্কেটের ‘মায়ের দোয়া ফটোকপি অ্যান্ড কম্পিউটার’ দোকানে মার্কিন দূতাবাসে নিয়োগ সংক্রান্ত জাল কাগজপত্র তৈরি হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে শাহারুল ইসলাম বাপ্পি ও মো. বাচ্চু মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে চাকরির নামে তৈরি বিভিন্ন জাল কাগজপত্র, নিয়োগপত্র, সরকারি লোগো সংবলিত প্যাড, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, একাধিক সিল ও স্ট্যাম্প প্যাড, দুটি হার্ডডিস্ক, একটি এলইডি মনিটর এবং মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।

গ্রেফতার বাচ্চু মিয়ার বাড়ি সাতক্ষীরার ওয়ার্রিয়া গ্রামে। থাকেন রাজধানীর শাহআলী থানা এলাকায়। গ্রেফতারের পর নিজের দোষ অস্বীকার করে বাচ্চু ডিবিকে জানিয়েছেন, বাপ্পিকে আমি ঠিকমতো চিনি না। তিনি মাঝেমধ্যে আমার কম্পিউটার দোকানে আসতেন। নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করতেন। যা বিল হতো তা পরিশোধ করতেন। সে অফিসিয়াল পোশাক পড়ে আমার দোকানে আসতেন। আমাকে বলতেন, সে মার্কিন দূতাবাসে চাকরি করেন। আমি তার কথা বিশ্বাস করতাম। প্রথমদিন কিছু কাগজপত্র প্রিন্ট দেওয়ার পর এতদিন একটি পেনড্রাইভ নিয়ে এসে বলেন, এখানে কিছু ডকুমেন্ট আছে। এগুলো আপনার কম্পিউটারে রেখে দিন। ডকুমেন্টগুলো কারেকশন করতে হবে। পরে প্রায়ই তিনি আমার দোকানে এসে কম্পিউটারে বসে নানা কাজ করতেন। উনি যে একজন প্রতারক তা জানতাম না। তিনি যখন আমার দোকানে আসতেন তখন তার গলায় দূতাবাসের আইডি কার্ড ঝুলানো থাকত। তিনি নিজে নিজেই কম্পিউটারে বসে নিয়োগপত্র তৈরি করতেন। এছাড়া আমাকে যদি কোনো কাজ করতে বলতেন আমি সরল মনে সেটা করে দিতাম।

জানতে চাইলে ডিবি মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল যুগান্তরকে বলেন, মার্কিন দূতাবাসে চাকরি দেওয়ার এবং বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগে একটি চক্রের দুইজনকে গ্রেফতার করেছি। চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। বিস্তারিত ডিএমপি মিডিয়া সেন্টার থেকে জানানো হবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম