হাদি হত্যা মামলা
এবার ভারতে গ্রেফতার ফিলিপ সাংমা
যুগান্তর প্রতিবেদন ও কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আরেক আসামি ফিলিপ সাংমাকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। ভারতের পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী সময়ে একটি বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসটিএফ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফিলিপ ছাত্রনেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল দুই অভিযুক্তকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকতে সহায়তা করেছিলেন। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছে এসটিএফ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ফিলিপ সাংমা সীমান্ত পারাপারের একটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তিনি হাদি হত্যা মামলার মূল দুই অভিযুক্ত ফয়সাল ও আলমগীরকে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত হয়ে মেঘালয় দিয়ে ভারতে প্রবেশে সহায়তা করেছিলেন। পরে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসা হয়।
এর আগে ৭ মার্চ মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে বনগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেনকে। এ দুজনকে ভারতে পালাতে সহায়তা করায় হত্যা মামলার আসামি হন ফিলিপ সাংমা।
৮ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তাদের কাছে গোপন ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ছিল বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ করার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিক পালিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে। সুযোগ পেলে তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এসটিএফ আরও জানায়, এ তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে বনগাঁও এলাকা থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তারা হলেন পটুয়াখালীর ফয়সাল করিম মাসুদ এবং ঢাকার আলমগীর হোসেন।
গ্রেফতারের পরদিন ফয়সাল ও আলমগীরকে কলকাতার বিধাননগর আদালতে তোলা হয়। সেখানে এসটিএফের পক্ষ থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের আবেদন করা হয়। আদালত তদন্তের স্বার্থে সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। বর্তমানে দুই অভিযুক্ত এসটিএফের হেফাজতে রয়েছেন।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করেছে। সেই নেটওয়ার্কের সঙ্গে কারা যুক্ত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতেই ফিলিপ সাংমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এক তদন্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন তারা। এ তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্ত পারাপারের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের সন্ধান মিলতে পারে।
তদন্ত এগোতে থাকায় পুরো ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তপথে অভিযুক্তদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিললে এ মামলার তদন্তে আরও বড় অগ্রগতি হতে পারে।
ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীর হোসেন ভারতে গ্রেফতারের পর তাদের দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ সরকার জোর তৎপরতা শুরু করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তির আলোকে ওই দুই আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে আসামিদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ‘কনসুলার অ্যাকসেস’ চেয়েছে বাংলাদেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, হাদি হত্যার দুই আসামিকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের আইজিও আসামিদের দেশে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন।
গত বছর ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় যাওয়ার পথে ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। হাদি হত্যা মামলার তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন আলমত জব্দ করা হয়। গ্রেফতার করা হয় ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রীসহ বেশ কয়েকজনকে। তবে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল অধরাই থেকে যায়। তদন্ত চলাকালে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, মূল শুটার ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর ঘটনার রাতেই মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে বাংলাদেশের পুলিশের এ দাবি প্রথম থেকেই নাকচ করে আসছিল ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে ভারত থেকেই তারা গ্রেফতার হয়েছেন।
ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সিআইডি। ২৩ ডিসেম্বর আদালত ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন। সেদিনই ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
