Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

সন্তানদের চরম অনাদর-অবহেলা

এক মমতাময়ী মায়ের ট্র্যাজিক বিদায়

স্বার্থ, প্রমোশন, ক্যারিয়ার আর করপোরেট কালচারের প্রভাবে আত্মকেন্দ্রিকতা ভর করেছে * প্যারেন্টস ‘ল’ কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে-ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল

ইমন রহমান

ইমন রহমান

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এক মমতাময়ী মায়ের ট্র্যাজিক বিদায়

ছবি: সংগৃহীত

বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের যুগ্মসচিব। আরেক ছেলে আশিকুর রহমান বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক। মেয়ে ফাতিমা নাসরীন সুলতানা ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক। সন্তানদের এই অবস্থায় আনতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন নূরজাহান বেগম (৭৫)। শেষ বয়সে সন্তানরা মায়ের দেখাশোনা করবেন-এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি নূরজাহান বেগমের জীবনে। শেষ বয়সে তার খোঁজ রাখেনি দুই ছেলে। জায়গা হয়নি তাদের বাসায়। মেয়ের বাসায় জায়গা হলেও থাকতে হয়েছে চরম অবহেলা ও অনাদরে। গত রোববার রাতে এই মায়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে স্যাঁতসেঁতে ময়লা-আবর্জনাপূর্ণ এক কক্ষ থেকে। সেই লাশে পচন ধরেছে। বাসা বেঁধেছে পোকামাকড়। এমন হৃদয়বিদায়ক ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর পল্লবী এলাকায়। বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় মেয়ের বাসায় করুণ মৃত্যু হয়েছে নূরজাহান বেগমের।

একজন সফল মায়ের এমন পরিণতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল সমালোচনা। যার সন্তানরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত; তার এমন মৃত্যু অনেকের মনে দাগ কেটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি কি নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে? লাশ উদ্ধারের সময় একজন নার্স বলেছেন, ‘আমরা সন্তান জন্ম দিয়ে কি ভুল করলাম।’

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটা সামাজিক অবক্ষয়। সন্তানরা শুধু নিজেদেরকেই ভালোবাসে। ভুলে যাচ্ছে মা-বাবার ত্যাগ ও অবদানের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, ‘সব ভুলে অনেকে ক্যারিয়ার ও উন্নতি নিয়ে ব্যস্ত। মা-বাবা যে তাদের জন্ম দিয়েছেন; মা-বাবা লালন-পালন না করলে যে বড় কিছু হতে পারত না এই উপলব্ধি তাদের মধ্যে কাজ করছে না। আসলে স্বার্থ, প্রমোশন, ক্যারিয়ার আর করপোরেট কালচারের প্রভাবে আমরা অনেকেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি।’

এই সমাজবিজ্ঞানী আরও বলেন, ‘সমাজের এমন ঘটনা ঠেকাতে হলে ২০১৩ সালের প্যারেন্টস ল-কে কাঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সবাইকে এই আইন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।’

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে মিরপুর-৬ এর সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির জানান, নূরজাহান বেগম তার মেয়ের সঙ্গে একই বাসায় থাকলেও আলাদা কক্ষে অবস্থান করতেন। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পেয়ে রোববার একজন নার্সকে ডেকে আনেন তার মেয়ে। পরে ওই কক্ষে গিয়ে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান নার্স। এরপর পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, যে কক্ষে নূরজাহান বেগম বসবাস করতেন সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন ও অগোছাল। কক্ষজুড়ে আবর্জনা। এমন পরিবেশ দেখে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধা প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও যত্ন থেকে বঞ্চিত ছিলেন।’

ওসি বলেন, ‘বৃদ্ধার মেয়ের সঙ্গে কথা বলে মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি মায়ের মৃত্যুর সঠিক সময়ও বলতে পারেননি। এ কারণে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

এলাকার কয়েকজন জানান, বৃদ্ধার মৃত্যুর পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে নার্সকে আনা হয়েছিল। সেই নার্সই সন্দেহজনক মৃত্যু মনে করে কল দেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। আর যারা লাশ ধোয়ার কাজ করেছেন তারা জানান, লাশে পচন ধরেছিল। জন্ম নিয়েছিল পোকাও। কয়েকদিন আগে যে মৃত্যু হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।

ওই নার্স গণমাধ্যমকে বলেন, ‘লাশ দেখে আমার মনে হয়েছে বৃদ্ধা চার-পাঁচ দিন আগে মারা গেছেন।’

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মারুফ হায়দার নামের এক প্রতিবেশী পল্লবী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। পরিবারের কাউকে না পেয়ে তিনিসহ আরও কয়েকজন মিলে লাশ হাসপাতালে নিয়ে যান। সে সময় তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়। অর্থ দিয়ে তাদের ম্যানেজ করারও চেষ্টা চলে। মারুফ হায়দার জানান, পরিবারটি চাচ্ছিল যেভাবেই হোক বৃদ্ধার কবরটা যেন খুব চুপে চুপে দিয়ে দেওয়া হয়। তারা টাকাও অফার করেছিল।

‘মা মরে পড়ে আছেন, তবুও কাউকে কিছু জানাননি কেন’-এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় জেনেই লাইন কেটে দেন মেয়ে ফাতিমা। পরে একাধিকবার ফোন করলেও ধরেননি। মৃতের দুই ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি কেউ। জানা গেছে, এ ঘটনায় সোমবার রাজধানীর পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেন ফাতিমা।

মঙ্গলবার সরেজমিন মিরপুর ৬ নম্বরের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মেইন গেট ভেতর থেকে আটকানো। চারদিকে সুনসান নীরবতা। গেট নক করলে ভেতর থেকে জহির নামে এক ব্যক্তি বের হয়ে জানান-তিনি চার বছর এই বাড়িতে ভাড়া থাকেন। নূরজাহান বেগম বাড়ির ৪ তলায় মেয়ের সঙ্গে থাকতেন। দেড় বছর আগে নূরজাহান বেগম ছেলে বুয়েটের শিক্ষক আশিকুরের আজিমপুরের বাসায় ছিলেন। বনিবনা না হওয়ার সেখান থেকে মিরপুরে মেয়ের বাসায় আশ্রয় নেন।

ওই বাসার এক প্রতিবেশী বলেন, ‘লাশটি বের করার সময় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আমরা দেখেছি রুমটি খুবই নোংরা ও অপরিষ্কার। বলা যায় অযত্ন-অবহেলায় বৃদ্ধা মারা গেছেন। তার শরীরে পোকা ধরেছিল।’

তিনি বলেন, ‘সুশিক্ষিত সন্তানদের অবহেলায় অনাদরে মা এভাবে মারা যাবে-এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এরা শিক্ষিত নামের কুলাঙ্গার। এ ধরনের শিক্ষিত ছেলেমেয়ে; যারা বাবা-মাকে দেখভাল করে না-তাদের বিচার হওয়া উচিত। দু-একটার বিচার হলে সমাজ এলার্ট হবে।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম