Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

কয়লা খনির ময়লা পানিতে জীবনের রঙিন স্বপ্ন

বড়পুকুরিয়া খনির ড্রেন থেকে কয়লার ডাস্ট সংগ্রহ করেন শতাধিক নারী

Icon

দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কয়লা খনির ময়লা পানিতে জীবনের রঙিন স্বপ্ন

বড়পুকুরিয়া খনির ড্রেন থেকে কয়লার ডাস্ট সংগ্রহ করছেন নারীরা -যুগান্তর

দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, একদল নারী ড্রেনের কালো ময়লা পানির স্রোতের মধ্যে কী যেন খুঁজছেন অথবা মাছ ধরার চেষ্টা করছেন। কারও হাতে লম্বা লাঠি, আর বেশির ভাগ নারীই ডুবে রয়েছেন বুকসম পানিতে। কাছে গিয়ে জানা যায়, তারা খুঁজছেন তাদের জীবন ও জীবিকা। তীব্র শীত, প্রবল বর্ষণ কিংবা যে কোনো প্রতিকূল আবহাওয়ায় এভাবেই ড্রেনের ময়লা কালো পানিতে দিন-রাত জীবনযুদ্ধে লিপ্ত তারা। এ দৃশ্য দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ময়লাযুক্ত পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের। ড্রেন দিয়ে খনির ভেসে আসা কয়লার ডাস্ট (গুঁড়া) সংগ্রহ করেই জীবন ও জীবিকা চলে অতিদরিদ্র এসব নারীর।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির দক্ষিণ পাশে প্রাচীর ঘেঁষে রয়েছে একটি ড্রেন। ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন এবং শোধনের পর এ ড্রেন দিয়েই খনির ভেতরের ময়লা কালো পানি নিষ্কাশন করে খনি কর্তৃপক্ষ। এ ময়লা পানি দিয়েই ভেসে আসে কয়লার ডাস্ট। আর পালাক্রমে এ ডাস্ট কয়লা সংগ্রহ করেন এলাকার অন্তত ১২০ জন অতিদরিদ্র নারী।

সম্প্রতি ওই ড্রেনে বুকসম ময়লা পানিতে কয়লা সংগ্রহ অবস্থায় কথা হয় কয়লা খনির পার্শ্ববর্তী চৌহাটি গ্রামের কুলসুম বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, নেট সেলাই করে ড্রেনের পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখি। পানির সঙ্গে কয়লার ময়লা ভেসে যাওয়ার সময় সেগুলো নেটে আটকা পড়ে। মাঝেমধ্যে বাঁশের মাথায় লোহার তৈরি বিশেষ অস্ত্র দিয়ে ড্রেনের পানিতে থাকা ময়লা কাটি। এভাবে সবাই মিলে দল বেঁধে কাজ করি।

যেদিন যে কয়লা পাই, সেগুলো বিক্রি করে সমানভাবে ভাগ করে নিই। ওই ড্রেনে কয়লা সংগ্রহ অবস্থায় কথা হয় খনির পার্শ্ববর্তী চৌহাটি গ্রামের পঞ্চশোর্ধ্ব বয়সি নারী রাজিয়া খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, দিনমজুর স্বামী মসলেমউদ্দীন মারা গেছেন ১০-১২ বছর আগে। এরপর একটি মেয়ে সন্তান নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। মানুষের বাড়িতে কাজ করেছি। পরে এখন কয়লা সংগ্রহ করে সংসার চালাচ্ছি। তিন বছর আগে মেয়ে মসলেমার বিয়েও দিয়েছি।

একই গ্রামের কায়ফা বানু বলেন, ২১ দিন বয়সের ছেলে কামরুজ্জামান ও আমাকে রেখে স্বামী নুরজামাল মারা গেছেন ১৮ বছর আগে। বেশ কয়েক বছর কষ্টে গেছে। এরপর কয়লা সংগ্রহ করেই ছেলেকে বড় করেছি। শীত কিংবা গরমে এ পানিতে ডুবে ডুবে কয়লা সংগ্রহ করতে কষ্ট হয় না? এমন প্রশ্নের জবাবে কায়ফা বানু বলেন, জীবন এর চেয়েও বেশি কষ্টের। তাই এখানেই খুঁজে পেয়েছি জীবিকা।

সেখানে কালো ও ময়লা পানিতে ডুবে কয়লা সংগ্রহ করেই রঙিন স্বপ্ন দেখেন অনেক নারী। তাদের মধ্যে রিনা রানী রায় বলেন, আর কয়েক বছর এভাবে কষ্ট করতে হবে। মেয়ে বন্যি রায় দিনাজপুর সরকারি কলেজে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মেয়েকে লেখাপড়া করে বিয়ে দিতে পারলেই এ কাজ ছেড়ে দেব।

এ কয়লা সংগ্রহ করে জীবন-জীবিকা চললেও দিন-রাত পানিতে থেকে নানান রোগে আক্রান্ত হন তারা। দূষিত ও উষ্ণ পানিতে দীর্ঘক্ষণ কাজের কারণে চর্মরোগ, সংক্রমণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো, নেই শ্রমিক সুরক্ষাব্যবস্থা। গীতা রানী রবিদাশ নামে এক নারী বলেন, দীর্ঘক্ষণ পানিতে থেকে পায়ে ক্ষত ধরেছে। খনির আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ১২০ নারী মিলে সমবায়ভিত্তিক তারা এ কাজ করেন ১৫ থেকে ১৬ বছর। এ ১২০ জনের মধ্যে ২০-২৫ জন করে আটটি দলে বিভক্ত হয়ে দিন-রাতে পালাক্রমে পানিতে নেমে ডাস্ট কয়লা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি দল সপ্তাহে একদিন করে কয়লা সংগ্রহের সুযোগ পায়।

নারীদের সংগৃহীত এসব কয়লা কেনেন শাহীনুর ইসলাম, ইমরান আলীসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী। তারা এসব কয়লা শুকিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করে থাকেন। ইমরান আলী বলেন, তাদের কাছ থেকে ২০ মন কয়লা কিনলে শুকানোর পর ৩ মন কমে যায়। তবে ইটভাটায় এ কয়লার চাহিদা বেশ থাকায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা টন দরে এ কয়লা ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, কয়লা সংগ্রহ করতে গিয়ে নারীরা বেশ কষ্ট করেন। প্রতিদিন একজন নারী ৬শ থেকে ৮শ টাকা আয় করেন।

এ ব্যাপারে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাইলে তারা কিছু বলতে রাজি হননি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .