Logo
Logo
×

শেষ পাতা

ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নীলকুঠি ও সাহেববাড়ি

নীলকরদের নিপীড়নের নিঃশব্দ সাক্ষী

Icon

এটিএম নিজাম, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নীলকরদের নিপীড়নের নিঃশব্দ সাক্ষী

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের চৌদার ও টান সিদলা গ্রামে অবস্থিত দুটি প্রাচীন স্থাপনা এখনো ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ১৭৩০ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে গড়ে তোলে একটি রেস্টহাউজ (সাহেবদের আবাসিক ভবন) এবং একটি নীলকুঠি, যা একসময়ের নীলচাষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

এদেশের সাধারণ নিরীহ কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করতে নীলকর সাহেবদের প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের পাশাপাশি নানা ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের কাহিনি এখনো বংশপরম্পরায় এদেশের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়ে থাকে। আর তাই কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের নীলকর সাহেবদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ‘রেস্টহাউস’ এবং তাদের আবাসিক ভবন দেখতে এখনো দূর-দূরান্ত থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্যপ্রেমিক বিভিন্ন বয়সের কৌতূহলী নারী-পুরুষ ছুটে আসেন। অবশ্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সুদৃষ্টির অভাবসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অযত্ন-অবহেলা এবং তদারকি-সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা এখন জবরদখলের শিকার হচ্ছে।

ব্রিটিশ বেনিয়াদের নীলচাষ একপর্যায়ে সাধারণ কৃষকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। তখনই ওঠে নীলচাষে বাধ্য করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কর্মসূচি। এ কর্মসূচি ও আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। এ সময় হরিশ চন্দ্র মিত্রের কবিতার ‘নীল বাঁদরে সোনার বাঙলা, করলো এবার ছারখার, অসময়ে হরিশ ম’ল লং এ-র হলো কারাগার’ উক্তিটি যেন দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠে (প্রায় ১৮৬০-৭০-এর দশক)। ‘লং’ বলতে উইলিয়াম লং (William Long) ছিলেন একজন নীলকর ও ব্রিটিশ কর্মকর্তা, যিনি জনরোষ ও গণপ্রতিবাদের মুখে পড়েন। বাংলার সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা সমাজ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নীলকুঠিটি স্থাপিত হয় হোসেনপুর পরগনার অন্তর্গত ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে। এটি আজকের টান সিদলা গ্রামে অবস্থিত। পাশেই অবস্থিত একটি প্রাচীন পুকুর, যা নীলকরদের ব্যবহৃত ছিল বলে জানা যায়। নীলকুঠি ছিল মূলত অফিস এবং প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র, যেখানে নীলচাষ, উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ হতো। এখান থেকেই বিপুল পরিমাণ নীল ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো।

অন্যদিকে নীলকর সাহেবদের আবাসস্থল বা রেস্টহাউজ অবস্থিত চৌদার গ্রামে, যা স্থানীয়ভাবে ‘সাহেবের গাঁও’ নামে পরিচিত। এই আবাসিক ভবনটিতে সাহেবরা অবস্থান করতেন এবং এখান থেকেই নীলচাষ ও ব্যবসা পরিচালনা করতেন।

১৭৩০ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশজুড়ে নীলচাষকে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেয়। হোসেনপুর ছিল তখনকার নীলচাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই অঞ্চল ছিল উর্বর মাটি ও নদীসংলগ্ন পরিবেশে ভরপুর, যা নীলচাষের জন্য উপযোগী। নীলকর সাহেবদের দমনমূলক নীতির কারণে স্থানীয় কৃষকরা একসময় এ অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও তার আগে বহু বছর ধরে এই চাষ চলতে থাকে।

নীলকর সাহেবদের রেস্টহাউজ এবং নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ আজও চৌদার ও টান সিদলা গ্রামে দৃশ্যমান, যদিও অনেকটাই জরাজীর্ণ। ‘সাহেবের গাঁও’ নামটি আজও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে, যা ওই সময়কার ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। এছাড়া টান সিদলার প্রাচীন পুকুরটি নীলকুঠির স্মৃতি বহন করছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাও বিলীন হতে বসেছে।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে এখনো সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। তবে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ইতিহাস অনুরাগী গবেষকরা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

হোসেনপুরের চৌদার ও টান সিদলার এই নীলকুঠি ও সাহেববাড়ি শুধু স্থাপনা নয়, এগুলো বাংলার কৃষক-শ্রমজীবী মানুষের শোষণ, প্রতিরোধ ও ইতিহাসের অনুপম দলিল। সময়ের পরতে পরতে হারিয়ে যাওয়া এই ইতিহাসকে রক্ষা করতে প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা। স্থানীয় প্রশাসন, ইতিহাসবেত্তা ও পর্যটন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এই স্থানগুলোকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে স্বীকৃতি দিলে তা হবে কিশোরগঞ্জ তথা দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য দলিল।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের গবেষক ড. হালিম দাদ খান বলেন, এসব হচ্ছে ব্রিটিশ বেনিয়া ও নীলকর সাহেবদের নিপীড়ন-নির্যাতন এবং তাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রতিবাদী সত্তার অমলিন স্মারক। তাদের স্থাপনা ও স্মৃতি রক্ষার মাধ্যমে তাদের নিপীড়ন-নির্যাতন এবং এদেশের মানুষের প্রতিবাদী ভূমিকাকে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে সে ইতিহাস জানানো খুবই জরুরি।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম