ভোগান্তি বাড়বে যাত্রীদের
বিদেশি এয়ারের সেলস এজেন্ট থাকছে না
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিদেশি এয়ারলাইন্সের সেলস এজেন্ট (জিএসএ) তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আজ (বুধবার) এ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের বিষয়ে মতামত নিতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে ২০১৭ সালের আইন পর্যালোচনার জন্য বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনাকারী সব বিদেশি এয়ারলাইন্সের জিএসএ প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এদিকে, হঠাৎ বিদেশি এয়ারলাইন্সের সেলস এজেন্ট তুলে দেওয়ার খবরে এভিয়েশন খাতে অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে। বর্তমানে বিদেশি ৭০টির বেশি বিদেশি এয়ারলাইন্স বিক্রয়, বিপণন, যাত্রীসেবা ও কার্গো পরিচালনা করে স্থানীয় জিএসএদের মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কাজ করেন পাঁচ হাজারেরও বেশি কর্মী। পরিবহণ, ট্রাভেল এজেন্সি, আইটি, বিজ্ঞাপন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ আরও অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। জিএসএ বাতিল হলে কর্মহীন হয়ে পড়বেন পাঁচ হাজারেরও বেশি কর্মী। যারা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রি, কার্গো পরিবহণসহ নানা সেবা দিয়ে আসছেন। এ ব্যবস্থা বাতিল হলে রাজস্ব ঘাটতি, চাকরি সংকট ও গ্রাহকসেবায় ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূলে রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতি। অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা, অডিট ও আইনগত সংস্কার প্রয়োজন।
এছাড়াও জিএসএ অফিস প্রবাসী যাত্রীদের জন্যও বড় সহায়তা। স্থানীয় অফিসে গিয়ে টিকিট বুকিং, পরিবর্তন বা অভিযোগ সমাধান করা সহজ। কুয়েত প্রবাসী যাত্রী ইব্রাহিম খলিল যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রবাসীরা সমস্যায় পড়লে সরাসরি অফিসে গিয়ে সমাধান পাই। অনলাইনে বা বিদেশি কলসেন্টারে সেটা সম্ভব নয়। জিএসএ বন্ধ হলে আমাদের ভোগান্তি বাড়বে।
জিএসএ খাতের অনেক কর্মী ১৫-২০ বছর ধরে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তারা বিক্রয়, বিপণন, কার্গো হ্যান্ডলিং ও গ্রাহকসেবায় বিশেষ দক্ষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জিএসএ ম্যানেজার যুগান্তরকে বলেন, এই খাতটা একটি স্কুলের মতো কাজ করছে। এখানে কাজ করে অনেকে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। জিএসএ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে আমরা মূল্যবান মেধা হারাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিএসএ অফিস থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। একাধিক এজেন্সি থাকায় এয়ারলাইন্সগুলো ভাড়ায় জবাবদিহি করে। এ ব্যবস্থা বাতিল হলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি করবে। তখন তারা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াতে পারবে।
জিএসএ ফোরামের সদস্য টাস গ্রুপের পরিচালক কাজী শাহ মুজাক্কের আহাম্মেদুল হক বলেন, বিমান সংস্থাগুলো বাংলাদেশ থেকে ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সরাসরি উড়ান পরিচালনা করছে। এতে কোম্পানিগুলো বছরে কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেয় এবং ন্যূনতম আড়াই লাখ টন কার্গো পরিবহণ করে। বিমান পরিষেবা ব্যবসার সঙ্গে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার উদ্যোক্তা জড়িত। এ খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় সোয়া লাখ মানুষের। তিনি বলেন, জিএসএ শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। এখানে হাজারো পরিবার নির্ভরশীল। হঠাৎ এই ব্যবস্থা বাতিল হলে বিপুল কর্মশক্তি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়। জিএসএ বাতিলের পথে না গিয়ে সরকার চাইলে খাতটিতে অডিট জোরদার করতে পারে, প্রয়োজনীয় রেস্ট্রিকশন আরোপ করতে পারে। তিনি প্রস্তাব করেন, প্রয়োজনে এমন আইন করা যেতে পারে যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান একটির বেশি জিএসএ নিতে পারবে না। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে, প্রতিযোগিতা সুষ্ঠু হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগ টানতেই মূলত এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। তবে কর্মসংস্থান ও বাজার স্থিতিশীলতার বিষয়টি মাথায় রেখে আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ জিএসএ বাতিল করলে অন্তত ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রবাসী যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে, বাজারে টিকিটের দামও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবে। তাদের প্রস্তাব, হাইব্রিড মডেল চালু করা যেতে পারে। অর্থাৎ বিদেশি এয়ারলাইন্স সরাসরি অফিস খুলবে, কিন্তু নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মসংস্থান বজায় রাখতে হবে এবং গ্রাহকসেবার জন্য স্থানীয় অফিস রাখতে হবে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) নিয়োগে বাধ্য ছিল না। সে সময় তারা কেবল বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) থেকে ব্রাঞ্চ অফিসের অনুমতি নিয়ে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করত। এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনও নিজেদের হিসাবে সম্পন্ন করত।
তবে এ প্রক্রিয়ায় একাধিক বিদেশি এয়ারলাইন্স হঠাৎ করে বাংলাদেশ থেকে অপারেশন বন্ধ করে দেয়। এতে সরকারের ট্যাক্স-ভ্যাটসহ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব বকেয়া থেকে যায়। পাশাপাশি যাত্রীদের টিকিট রিফান্ডের অর্থ ফেরত দেওয়াও সম্ভব হয়নি। ফলে সরকার যেমন রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনি সাধারণ যাত্রীদেরও ভোগান্তি বেড়েছে।
এই অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০১৭ সালে ‘দ্য সিভিল এভিয়েশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে। আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে কার্যরত সব বিদেশি এয়ারলাইন্সের জন্য স্থানীয় সোল জিএসএ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারের পাওনা আদায়, যাত্রীদের অব্যবহৃত টিকিটের রিফান্ড এবং সংশ্লিষ্ট দায়-দায়িত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় জিএসএকে। ফলে টিকিট বিক্রি ও সব ধরনের আর্থিক লেনদেন জিএসএ-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হতে থাকে।

