অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অফ বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষ্যে গোলটেবিল আলোচনা
কর্মক্ষেত্রে সুস্থ থাকুন ডায়াবেটিসকে দূরে রাখুন
আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ উপলক্ষে অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অফ বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে দেশের খ্যাতনামা ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞগণ দৈনিক যুগান্তরের সেমিনার কক্ষে এক গোলটেবিল আয়োজনে উপস্থিত হন। আয়োজনে ডায়াবেটিস রোগের দেশীয় ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ বিস্তারিত আলোচনা করেন। আয়োজনটির সহযোগিতায় ছিল এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি।
প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডায়াবেটিস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে
যাদের আর্থিক সামর্থ্য কম বা সীমিত সম্পদসম্পন্ন এলাকায় বসবাস করছেন তাদের ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন-কমিউনিটিভিত্তিক ডায়াবেটিস শিক্ষা ও সচেতনতা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য ওষুধ সরবরাহ, জীবনযাত্রার স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন, কমিউনিটি সম্পৃক্ততা ও সহায়তা নেটওয়ার্ক তৈরি। নিয়মিত এ কার্যক্রম নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হবে। ডায়াবেটিসবিষয়ক গবেষণা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। ডায়াবেটিসের ঝুঁকি শনাক্তকরণে একযোগে কাজ করতে হবে।
ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা
কর্মস্থলে নিষ্ক্রিয়তা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দিনের সময়ের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে কাটায়। যাদের বয়স ২০ বা তার বেশি, তাদের অনেকেরই হয় ডায়াবেটিস আছে অথবা তারা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন। শ্রমনির্ভর কিছু কাজ বাদ দিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর্মস্থলে তারা নিশ্চল সময় কাটান। অতিমাত্রায় যন্ত্রনির্ভরতা আমাদের পরিশ্রমবিমুখ করে দিয়েছে। কম্পিউটারের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা কিংবা সর্বাবস্থায় লিফটের ব্যবহার কর্মস্থলের সময়কে অস্বাস্থ্যকর ও ডায়াবেটিস রোগ সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। কর্মস্থলে নিষ্ক্রিয় অবস্থা ওজন বাড়ায় ও দেহে ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা কমায়। তাই কর্মস্থলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধী বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণবান্ধব কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিটের বিরতি দিয়ে এ সময় হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। প্রশস্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা করে সবাইকে এ সিঁড়ি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ও স্বল্প তলায় লিফট ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অতি ভোজন পরিহার করে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মস্থলে যাওয়া-আসাকে কায়িক পরিশ্রমের সুযোগ হিসাবে নিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল ইসলাম
বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
আসুন উদ্যোগ নিই, উদ্যমী হই
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, আমরা ডায়াবেটিস হতে দেব না। কারণ এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং ডায়াবেটিস হলেও সর্বক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অনেক উন্নত দেশের চেয়ে দেশে ডায়াবেটিসের সার্ভিস ভালো। শুধু সরকার বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। ডায়াবেটিস কেন হলো এটি ডাক্তার রোগীকে জানাবেন। যে ওষুধ দেওয়া হয় তার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে কিনা তাও ডাক্তার রোগীকে জানাবেন। বর্তমান চিকিৎসায় পার্সোনালাইজড বা প্রিসিশন মেডিসিন গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদের কাছে যখন রোগী আসেন, তখন বেশির ভাগ রোগী ডায়াবেটিসজনিত চোখ, কিডনি ও নার্ভের সমস্যার জটিলতা নিয়ে আসেন। দেশে প্রিডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ১.৫-২ কোটি, অর্থাৎ ঘরে ঘরে এ রোগী। তাদের চিকিৎসাব্যবস্থার নজরদারিতে রাখতে হবে। বয়স ৩০ হলে কোনো উপসর্গ বা রোগ থাকুক বা না থাকুক, ডায়াবেটিস নির্ণয়ের স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। সর্বোপরি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম হাসপাতাল চালু করা সময়ের দাবি।
অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রেসিডেন্ট, অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অফ বাংলাদেশ
একই ওষুধ সবার জন্য নয়
একসময় সব রোগীর জন্য একই ধরনের ডায়াবেটিস চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পার্সোনালাইজড ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ রোগীর বয়স, শারীরিক গঠন, জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস এমনকি জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। প্রত্যেক ডায়াবেটিস রোগীর কারণ, প্রতিক্রিয়া ও জটিলতা আলাদা। কেউ অতিরিক্ত ওজনের কারণে ইনসুলিন প্রতিরোধে ভোগেন, কেউ আবার জিনগত কারণে ইনসুলিন কম উৎপাদন করেন। তাই রোগী নয়, রোগের ধরনই চিকিৎসার ভিত্তি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসায় স্থূল রোগীর জন্য ওজন কমাতে সহায়ক ওষুধ প্রাধান্য পায়। হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যা থাকলে SGLT-2 ইনহিবিটর বা GLP-1 রিসেপ্টর এজেন্ট বেছে নেওয়া হয়। হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কমাতে শর্করা কমানোর ওষুধ সতর্কভাবে ব্যবহার করা হয়। রোগীর খাদ্যাভ্যাস, কাজের ধরন, ওষুধের দাম ও প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হয়। ইনসুলিন বা মুখে খাওয়ার ওষুধ যেটিতে রোগী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেটিই গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ
বিভাগীয় প্রধান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেক্রেটারি জেনারেল, অ্যাসোসিয়েশন অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অফ বাংলাদেশ
ডায়াবেটিক ডায়েট বলে বিশেষ খাদ্যসামগ্রী নেই
সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করে জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তন করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ডায়াবেটিস রোগী তার উচ্চতা, ওজন, কাঙ্ক্ষিত ওজন, বয়স, লিঙ্গ, পেশার ধরন এবং নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা ও স্তন্য পানের বিষয়টি লক্ষ রেখে ক্যালোরি নির্ধারণ করে খাবারের তালিকা প্রদান করা হয়। এ ক্যালোরির ৩০ শতাংশের কম চর্বিজাতীয় খাবার, ১৫-২০ শতাংশ আমিষ এবং ৫০-৬০ শতাংশ শর্করাজাতীয় খাবার থেকে নির্ধারণ করা হয়। চিনি, গুড়, মধু বা এসবের তৈরি খাবার যেগুলো রক্তের গ্লুকোজ দ্রুত বৃদ্ধি করে সেগুলো সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। বিভিন্ন শাকসবজির ব্যবস্থা থাকতে হবে। খাবারের নির্দিষ্ট মাত্রা ও নির্দিষ্ট সময় মেনে খেতে হবে। প্রতিদিন একই ধরনের খাবারের পরিবর্তে অন্য কী কী খাবার যোগ করা যায় তা রোগীকে বুঝিয়ে দেওয়া আবশ্যক। কিটো ডায়েট মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। ব্যক্তিগত অবস্থা, রোগের জটিলতা বিবেচনায় শারীরিক পরিশ্রমের সময় নির্ধারণ করা উচিত। দ্রুত হাঁটা, সাঁতার, সাইকেল চালানো, জগিং-এ ধরনের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও ওজনাধিক্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অধ্যাপক ডা. মীর মোশাররফ হোসেন
বিভাগীয় প্রধান, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ
নীতিমালার দৃঢ় বাস্তবায়ন জরুরি
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসকে এখন মহামারি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ও অপ্রতুল স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় এ ঝুঁকি মোকাবিলা করা অনেকটাই দুরূহ হয়ে পড়ছে। তাই আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ। প্রান্তিক পর্যায়ে ডায়াবেটিসের স্ক্রিনিং চালু করা জরুরি। যাতে সাধারণ মানুষ নিজের ঝুঁকি জানবে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা শুরু করবে। তা ছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত ঝুঁকি নিরূপণ ও পরামর্শ প্রদান করতে হবে। স্কুল, কর্মস্থল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি উপযোগী স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডায়াবেটিস সম্পর্কে জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রচার কতে হবে। পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় মসজিদভিত্তিক ডায়াবেটিস সচেতনতা কার্যক্রম ইতোমধ্যে সফলতার প্রমাণ দিয়েছে। আমাদের সুযোগও অনেক রয়েছে। নীতিমালা আছে, অবকাঠামো আছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মোবাইলের মতো শক্তিশালী যোগাযোগমাধ্যমও আছে। এখন দরকার সবার সহযোগিতা। জাতীয় গাইডলাইনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের নির্দেশনা দিয়েছে।
ডা. মইনূল ইসলাম
সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
সুস্থ জীবন ডায়াবেটিস প্রতিরোধে প্রতিষেধক
পৃথিবীতে ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। শহর বা গ্রাম, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ এ রোগে ভুগছেন। অনেকেই জানেন না, তাদের শরীরে এ রোগ ধীরে ধীরে বাসা বেঁধেছে। ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা এর নীরবতাতেই। শুরুতে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও এটি ধীরে ধীরে চোখ, কিডনি, স্নায়ু ও হৃদযন্ত্রে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। সুখবর হলো-ডায়াবেটিস অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য, যদি আমরা সচেতন হই এবং জীবনযাত্রায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনি। সবচেয়ে ভালো ডাক্তার তিনিই, যিনি ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কাজ করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুলে পুষ্টিকর খাবারের প্রচলন, পার্ক ও হাঁটার পথ তৈরি, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রচার-সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ওষুধ নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি-এ ছোট অভ্যাস ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বড় পরিবর্তন আনে।
ডা. এম এ হালিম খান
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
স্থূলতা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। যাদের রক্তে অতিরিক্ত চর্বি রয়েছে তাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, ফলে তাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনা দুরূহ হয়। শিশুদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিশেষ উদ্যোগের বিষয়। নারীরা শৈশব থেকেই ওজনাধিক্যে ভুগলে বয়ঃসন্ধিক্ষণে তাদের পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম এবং গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা অনেকগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ এ সমস্যা চক্রাকারে ঘুরছে। যাদের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে আনুমানিক ৮০ শতাংশের স্থূলতা বা ওবেসিটির ইতিহাস ছিল। দেখা যায় টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ১৫ কেজি ওজন কমানোর মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেও যারা স্থূলতা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন তারা চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতি সপ্তাহে চামড়ার নিচে একটি ইনজেকশন দিতে পারেন। এ ওষুধ হার্ট ও কিডনিকেও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। স্থূলতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা দূর করা সম্ভব।
ডা. ইয়াসমিন আক্তার
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
এসিআই স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে কাজ করছে
দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান এডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ যা এসিআই পিএলসি নামে অধিক পরিচিত। আজ এই বিশেষ দিবসে দেশের ৭৭টি স্থানে ফ্রি ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। এর লক্ষ্য দশ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত করা ও তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা। ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় বছরব্যাপী ব্যানার, পোস্টার, লিফলেট ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন করা হয়। দেশের অনেক জায়গায় চিকিৎসকদের সহায়তায় ওবেসিটি ক্লিনিক আমরা স্থাপন করেছি। ইনসুলিন, গ্লিক্লাজাইডের মতো আধুনিক ফর্মুলেশন লোজাইড এমআর দেশব্যাপী সহজলভ্য করা হয়েছে। ডায়াবেটিস ও ওবেসিটির জন্য ইনোভেটিভ মলিকিউল টিরজেপাটাইড ব্র্যান্ড টিরজেপ-দেশে এসিআই প্রথমবারের মতো এনেছে। মেডট্রনিকের সঙ্গে পার্টনারিংয়ের মাধ্যমে এসিআই দেশে লেটেস্ট ইনসুলিন পাম্প ও সিজিএম মেশিন বাজারজাত করেছে। ভেরিওফ্লেক্স ব্র্যান্ডের গ্লুকোজ মাপার মেশিনও আমাদের রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক সংকট ও জনস্বাস্থ্যে এসিআই কাজ করে যাচ্ছে। বন্যার সময় আমরাই প্রথম পানিবন্দি মানুষের জন্য ইনসুলিন সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছি। আজকের ডায়াবেটিস-ডে উপলক্ষ্যে গোলটেবিল বৈঠক এই সামাজিক দায়বদ্ধতারই একটি অংশ। এসিআই ভবিষ্যতেও দেশের ডায়াবেটিস রোগীদের কল্যাণে অবদান রাখবে।
মো. মুহসীন মিয়া
পরিচালক, মার্কেটিং, অপারেশনস, এসিআই
সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োগ করা প্রয়োজন
শুধু ডায়াবেটিসের চিকিৎসাই নয়, এ রোগীর সামগ্রিক অন্য রোগ এবং অন্যান্য চিকিৎসা বিবেচনা করে ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য সঠিক এবং সবচেয়ে উপযোগী চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে চিকিৎসা পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়, যেমন-স্থূলতা, স্ট্রোক, হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর, স্লিপ এপনিয়া, ফ্যাটি লিভার-এসব সহ-রোগ থাকলে টিরজেপাটাইড, সেমাগ্লুটাইড ও এম্পাগ্লিফ্লোজিনজাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। আবার কিছু সহ-রোগ থাকলে কিছু ওষুধ ব্যবহার অতি সাবধানতার সঙ্গে বা বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া আছে। যেমন-বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ হলে এম্পাগ্লিফ্লোজিন, অগ্নাশয়ে প্রদাহ বা রক্তে অস্বাভাবিক ট্রাইগ্লিসারাইড থাকলে সেমাগ্লুটাইড, টিরজেপাটাইড এবং শেষ পর্যায়ের কিডনি বা লিভার রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসরোগ থাকলে মেটফরমিন, উচ্চমাত্রার হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি থাকলে সালফোনাইল ইউরিয়াজাতীয় ওষুধ পরিহার করা হয়। গর্ভকালীন বা গুরুতর অসুস্থতা যেমন এমআই, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম থাকলে ইনসুলিন ব্যবহার করা শ্রেয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডায়াবেটিস রোগীকে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি ও সুপরামর্শ প্রদান করে থাকেন।
ডা. মাজহারুল ইসলাম (সোহেল)
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, ডিএনসিসি হাসপাতাল, ঢাকা
ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক হতে হবে অংশীদারত্বমূলক
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা ১০০ মিটার দৌড় নয়, বরং এটি একটি ম্যারাথন। এ দীর্ঘ যাত্রায় চিকিৎসককে রোগীর জন্য হতে হবে একজন পরমার্শদাতা, শিক্ষক ও বিশ্বস্ত বন্ধু। ওষুধের মাধ্যমে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং রোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন মানসিক সমর্থন। এ দীর্ঘমেয়াদি রোগটির সঠিক ব্যবস্থাপনায় ওষুধের পাশাপাশি বেশি প্রয়োজন হলো রোগীর স্বযত্ন এবং চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারত্ব। এ রোগ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে চিকিৎসক-রোগীর গতানুগতিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে উন্নত ও সহযোগিতামূলক মডেল তৈরি করা অপরিহার্য। ডায়াবেটিস এমন একটি জীবনধারা সম্পর্কিত রোগ যার চিকিৎসায় জীবনযাত্রার অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনতে হয়। শুধু প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেই হয় না। উন্নত সম্পর্কের গুরুত্বগুলো লক্ষণীয়, যেমন- আস্থার সৃষ্টি ও ভীতি দূরীকরণ, সম্মতি ও জীবনধারা পরিবর্তন, অংশীদারত্বমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমর্থন। কীভাবে সম্পর্ক উন্নত করা যেতে পারে? সক্রিয় শ্রবণ ও সহমর্মিতা, যেমন-‘আমি বুঝতে পারছি এই পরিবর্তনগুলো কঠিন’। সহজ ভাষায় শিক্ষা, লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতা (যেমন রক্তের শর্করা বা ওজনের লক্ষ্য) ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভব।
ডা. তাহমিনা ফেরদৌসী
এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, সরকারি কর্মচারী হাসাতাল, ঢাকা
প্রযুক্তি চিকিৎসাকে আরও কার্যকরী করে তুলছে
রোগ নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু ওষুধ বা ইনসুলিন নয়, দরকার আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা। আগে রোগীকে দিনে কয়েকবার আঙুলে সুচ ফুটিয়ে রক্তে শর্করা মাপতে হতো। এখন সিজিএমের (কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং) মাধ্যমে ত্বকের নিচে ছোট সেন্সর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত জানায়। এতে রোগী ও চিকিৎসক দুজনই শর্করার উঠানামা ও ইনসুলিন ডোজ নির্ধারণ নির্ভুলভাবে করতে পারেন। ইনসুলিন পাম্প একটি ছোট, আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্র যা সারাক্ষণ শরীরে অল্প অল্প করে ইনসুলিন সরবরাহ করে। ফলে বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। অনেক ইনসুলিন পাম্পে সিজিএম সংযুক্ত থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন ডোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। মোবাইল অ্যাপ ও টেলিমেডিসিন ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করেছে। রোগী নিজের গ্লুকোজ, খাবার ও ব্যায়ামের তথ্য অ্যাপে রাখতে পারেন এবং চিকিৎসক এ ডেটা দেখে পরামর্শ দিতে পারবেন। তবে শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, সঠিকভাবে ব্যবহার করা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নিয়মিত ফলোআপ করলে তবেই এ প্রযুক্তির সুফল পাওয়া যাবে।
ডা. মো. আশিকুর রহমান
আবাসিক চিকিৎসক, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সুপারিশ
* জনসাধারণের মধ্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়ের ব্যাপক স্ক্রিনিং
(Mass Sereening) কর্মসূচি চালু করা।
* সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিতভাবে বিনামূল্যে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা।
* কর্মস্থলে প্রতি ৩০-৬০ মিনিট পরপর সংক্ষিপ্ত হাঁটা বা স্ট্রেচিং করুন। লিফটের পরিবর্তে সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
* নারীদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পরীক্ষা করা জরুরি।
* ডায়াবেটিসের ওষুধ, ইনসুলিন ও পরীক্ষার উপকরণ সাধারণ মানুষের জন্য যেন সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া।
* অবৈজ্ঞানিক ডায়াবেটিসের বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত না হওয়া।
* ডাক্তার ও রোগীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করা।
* স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্রে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ডায়াবেটিসসংক্রান্ত সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা।
* আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার করা।
* ডায়াবেটিস রোগীরা যাতে মানসিক ও সামাজিক সহায়তা পান, সেদিকে নজর দেওয়া।
* ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড মেটালবলিজম গঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
* সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোয় এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের স্থায়ী পদ সৃষ্টি করা।
* কর্মস্থলে ৩০ ঊর্ধ্ব সবাইকে বছরে অন্তত একবার বাধ্যতামূলকভাবে ডায়াবেটিস নির্ণয় পরীক্ষার আওতায় আনা।
* কর্মস্থলে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।
