ইসিতে জামায়াত ৩২ আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি
‘আদালতের রায় পেলে সিদ্ধান্ত’
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ফল ঘোষণায় অনিয়মের অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে ৩২টি আসনের ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছে। এসব আসনের অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে জোট নেতারা বলেছেন, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায় ইসিকেও নিতে হবে।
ফল প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে রোববার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশনে আসেন ১১ দলীয় জোটের নেতারা। তারা দীর্ঘসময় ইসির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ১১ দলীয় জোটের নেতাদের ইসি জানিয়েছে, সংসদ সদস্যদের নামের গেজেট প্রকাশের পর ভোট পুনর্গণনার সুযোগ নেই। বিষয়টি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার।
পরে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘তাদের যেই দাবি সেই দাবিটির বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। আইন তাদের এই সুযোগ দিয়েছে যে, যদি নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে তারা সেটি হাইকোর্টকে জানাতে পারবেন। হাইকোর্ট সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত পেলে ইসি পদক্ষেপ নেবে।’ এদিকে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধের প্রতিবাদে আজ ১১ দলীয় জোট বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ সমাবেশ করবে।
রোববারের বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন এ বৈঠকে ছিলেন না।
বৈঠকের পর বিফ্রিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ত্রুটিগুলোসহ নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা কথা বলেছি। বিশেষ করে ৩২টি আসন চিহ্নিত করেছি, যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে আমাদের হারানো হয়েছে। এসব আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গেজেট প্রকাশ হলেও আইনের তিন ধাপ আছে-ইসি, ট্রাইব্যুনাল এবং এরপর হাইকোর্ট। আমরা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করব। এ আসনগুলোর বাইরেও কিছু আসনের বিষয়ে আমাদের কাছে প্রমাণ আসছে, সেগুলোর বিষয়েও আইনের আশ্রয় নেব।
আযাদ বলেন, শপথের বিষয়ে আমরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শপথ নেব, পার্লামেন্টে যাব, গঠনমূলক ভূমিকা রাখব। একই সঙ্গে রাজপথও আমাদের জন্য খোলা থাকবে। ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ফলাফল ঘোষণা যদি স্বচ্ছ না হয়, সেখানে দায় এড়ানো যায় না। ইঞ্জিনিয়ারিং হলে তার দায় নির্বাচন কমিশনকেও নিতে হবে।
আযাদ বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রথম ধাপ-নির্বাচনের কয়েকটি ধাপ আছে। প্রথমত ভোটগ্রহণ, দ্বিতীয়ত ভোট গণনা এবং তৃতীয়ত ফলাফল প্রকাশ। এই তিন ধাপের মধ্যে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে অতীতের তুলনায় কিছু গুণগত পরিবর্তন আমরা দেখেছি। বড় ধরনের খুনাখুনি বা সহিংসতা তেমন দৃশ্যমান ছিল না। তবে এখানে প্রচুর জাল ভোট পড়েছে, কালোটাকার ছড়াছড়ি ছিল। কোথাও কোথাও হুমকিধমকি, সন্ত্রাস, মারামারি বা হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বড় দুর্ঘটনা না ঘটলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো উপাদান তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ভোট গ্রহণকালীন বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে আমরা অসুস্থ পরিবেশের নানা দিক প্রত্যক্ষ করেছি। ভোট গ্রহণের সূচনা ভালো হলেও সমাপ্তি সুন্দর হয়নি।
নির্বাচনের গেজেট তড়িঘড়ি প্রকাশ করা হয়েছে দাবি করে জামায়াত নেতা বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন, ১৩ তারিখ রাত ১১টায় গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। দূরবর্তী এলাকা থেকে কেউ অভিযোগ দাখিলের সুযোগই পেলেন না। আমরা কমিশনকে বলেছি, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখুন। আইনের দরজা খোলা আছে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাব। আমাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেই প্রশ্ন রয়ে গেল।
কিছু কিছু কেন্দ্রে শেষ সময়ে ভোট দেওয়ার হার বেশি দেখানো হয়েছে দাবি করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কিছু কিছু কেন্দ্রে ৪টা ২০ মিনিটের দিকে যে রেকর্ড পেয়েছি, পূর্ণাঙ্গ ফলাফলের পর একই কেন্দ্রে অস্বাভাবিক ভোট প্রদানের হার দেখানো হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত ব্যালট দেখানো হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। ভোটগণনার সময় কিছু কেন্দ্রে ১১ দলীয় জোটের এজেন্টদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং গণনার সময় নিষ্ক্রিয় করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু গণনার পরিবেশ কোথাও কোথাও ব্যাহত হয়েছে। ভোটগণনায় ত্রুটি থাকলে ফলাফলে প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।
ফলাফলের শিটে ঘষামাজা, পুনর্লিখন এবং অনেক জায়গায় প্রার্থীর মূল এজেন্টের স্বাক্ষর নেওয়া হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসনের একটি কেন্দ্রের ফলাফল লেখা হয়েছিল পেনসিলে। সেখানে আমাদের এজেন্ট ছিল মুসলিম। কিন্তু এজেন্টের নাম লিখা ছিল একজন হিন্দু ভদ্রলোকের। নাম পরিবর্তন হওয়ায় ফলাফল শিটের বৈধতা কী? এরকম ত্রুটিপূর্ণ রেজাল্ট শিট আমাদের কাছে আছে। সব ত্রুটি নিয়ে ইসির সঙ্গে কথা হয়েছে।
ছায়া মন্ত্রিসভার বিষয়ে জানতে চাইলে আযাদ বলেন, এ বিষয়ে আমরা আনুষ্ঠানিক আলোচনা করিনি। সবাই মত দিচ্ছে। আলোচনার পর জানাব। নির্বাচনি সহিংসতার বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। কিন্তু তা তো হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার জন্যই তো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রক্তদান। তাহলে কি এটাই হচ্ছে? বাংলাদেশে আবারও ফ্যাসিবাদের স্বৈরতন্ত্র উত্থান হতে যাচ্ছে। আমাদের বোনেরা নিরাপদ নন। হাতিয়ার ঘটনার মতো উদাহরণ সামনে এসেছে, ২০১৮ সালের সুবর্ণচরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, সেদিন ভোট দেওয়ার কারণে চার সন্তানের মা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন; কিন্তু প্রশাসন অস্বীকার করেছিল। এখন হাতিয়ার ঘটনায়ও একই সুর বাজছে। স্বৈরাচারী আমলের সুর যদি এ সময়ে বাজে, তাহলে গুণগত পার্থক্য কোথায়? আমার নিজের আসনেও তিনজন নারী আহত হয়েছেন।
প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন প্রসঙ্গে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা (ইসি) প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল মনে করি। ওভার অল নির্বাচনটা নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবাণীতে একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ এই নির্বাচনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য সহযোগিতা করেছেন।’
সংসদ সদস্যদের শপথ আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, শপথের বিষয়টি সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে তিন দিনের ভেতরে যদি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার শপথ না পড়ান তাহলে চতুর্থ দিন থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন। আরও যে আইনগত বিষয় রয়েছে সেগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সংশ্লিষ্ট যারা রয়েছেন তারা হয়া করবেন। তবে এর বাইরে বেশি কিছু বলা আমার পক্ষে এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ, কবে কখন এই শপথ অনুষ্ঠিত হবে সেটি এখনো আমরা অফিশিয়ালি অবগত নই। সেটি অফিশিয়ালি অবগত হলে পরে আপনাদের জানাতে পারব।’
ইসির সঙ্গে সরকার আলোচনা করেছে কী না-জানতে চাইলে এ কমিশনার বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে অফিশিয়াল কোনো চিঠিপত্র বা যোগাযোগ হয়নি।
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে তারা আসছেন। আমরা দীর্ঘক্ষণ তাদের বক্তব্য শুনেছি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী কিছু সমস্যার কথা তারা উল্লেখ করেছেন। আর তড়িঘড়ির তো প্রশ্নই আসে না। আমরা এবার চেষ্টা করেছি এই প্রযুক্তির যুগে আরও স্মার্টলি কিভাবে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যায়। সেই ব্যবস্থাগুলো আমরা নিয়ে রেখেছিলাম। সেই ক্ষেত্রে গ্যাজেট প্রকাশের যে সময়কাল, এটি তো আমরা আরও আশাবাদী ছিলাম যে, আরও আগে যদি দেয়া যেত ভালো হতো। আমাদের টিম, আমাদের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই ফলাফল তৈরির কাজটি করেছেন। আমাদের এখানে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে যারা সংযুক্ত ছিলেন তারা রাতদিন পরিশ্রম করে এই গ্যাজেটটি প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছেন। এটি যথাসময়ে প্রকাশ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সেটি বিশ্বাস করে।’
নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক প্রিসাইডিং অফিসারের দেহরক্ষী হিসাবে আমরা অস্ত্রসহ একজন আনসারকে দিয়েছি। আনসারের কাছে সুরক্ষা অ্যাপ ছিল। যখন যেখানে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সেলে এসেছে। বহু সংখ্যক ড্রোন এঙ্গেজ রেখেছি, হেলিকপ্টার এঙ্গেজ রেখেছি, বডি ওর্ন ক্যামেরা রেখেছি। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিক্যামেরার ব্যবস্থা ছিল। এমন একটি পরিস্থিতিতে সবকিছু আয়নার মতো পরিষ্কার। আমরা এখান থেকে কোনটা সত্য তথ্য, কোনটা মিথ্যা তথ্য সবগুলোই মনিটর করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। নির্বাচন কমিশন মনে করে যখন যেই ঘটনাটি আমাদের দৃষ্টিতে এসেছে আমরা শতভাগ সেটিকে এড্রেস করার চেষ্টা করেছি এবং সমাধান করেছি।’
শেরপুর-৩ আসনের তফসিল কবে হবে জানতে চাইলে ইসি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এগুলো আপনারা স্টেপ বাই স্টেপ পেয়ে যাবেন। শেরপুরের নির্বাচন প্লাস আপনারা জানেন একজন প্রার্থী দুটি আসনে নির্বাচন করেছেন। তিনি কোনটি রাখবেন কোনটি রাখবেন না এ তথ্য এখনো নির্বাচন কমিশনে আসেনি। শেরপুরের নির্বাচনটাও আমাদের করতে হবে। কমিশন এখনো সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি। কমিশন সিদ্ধান্ত নিলে জানতে পারবেন।’
