Logo
Logo
×

স্বজন সমাবেশ

স্বজন ভ্রমণ

প্রকৃতির সান্নিধ্যে বিজয়নগরে এক দিন

Icon

সেলিম আল রাজ

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির সান্নিধ্যে বিজয়নগরে এক দিন

একদম আকস্মিক নিমন্ত্রণ। আগপাছ কোনো কিছু চিন্তা না করেই রাজি হয়ে গেলাম। হারুন টি স্টলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে পরিকল্পনা। মুঠোফোনে ময়মনসিংহ টিকেট কাউন্টার থেকে পরদিনের চারটা টিকেট ব্যবস্থা করে দেন আমিনুল ইসলাম। গন্তব্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর। 

মূলত লেখালেখি প্রশিক্ষণ উপলক্ষ্যে কথাসাহিত্যিক ও স্বজন সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক ইমন চৌধুরী ও সাবেক বিভাগীয় সম্পাদক হিমেল চৌধুরীর গৌরীপুরে আসা। এখানে একরাত্রি যাপন শেষে পরদিন আরেকটা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদানের কথা। এমদাদুল হক ভাই ও আমাকে তাদের সফর সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ করেন তারা। আমরাও সানন্দে সম্মতি জানাই। তাড়াহুড়ার মধ্যেই রাতে কাপড়চোপড় গোছগাছ করা। ভোর বেলার যাত্রা।

পূর্ব নির্ধারিত স্থান গৌরীপুর পাট বাজার থেকে অটোরিকশা যোগে কলতাপাড়া এলাম। পৌনে আটটায় কলতাপাড়া থেকে সিলেটগামী সাগরিকা পরিবহনে উঠলাম আমরা। মাঝে একবার নান্দাইল চৌরাস্তায় যাত্রা বিরতি দিয়ে আমাদের গাড়ি আবার ছুটতে শুরু করে। আধো ঘুমে এগারোটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বরোড হয়ে চান্দুরা বাজার। চান্দুরা থেকে অটোরিকশা যোগে দাউদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হই সবাই। পুরাতন একটা বিদ্যাপিঠ। ১৯৩১ সালে প্রায় বার একর জায়গার উপর দাঁড়ানো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যালয়ের পেছনে বিশাল এক পুকুর। আয়তনে বড়সড় হওয়ায় হোসেন সাগর নামে পরিচিত পুকুরটি। মূল বিদ্যালয় ভবন থেকে একটু দূরে আরেকটা পুকুর নিজাম সাগর নামে খ্যাত। ঘুরে ঘুরে ক্যামেরাবন্দী হলাম আমরা। বিদ্যালয়ের পাশেই বিশাল খেলার মাঠ। চারপাশে বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত। দুপুরের রোদে ঝিকঝিক করে সোনালী ফসল।

গুণী শিক্ষক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বের হয়ে গেলাম বিজয়নগরের দর্শনীয় স্থান অবলোকনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলার সীমান্ত ঘেষা বিজয়নগর উপজেলার যাত্রা শুরু ২০১০ সালে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে এখানের বিখ্যাত ফলের সমারোহ ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে টানে। রাস্তার দুপাশে গাছগাছালি, ফসলের ক্ষেত, বিলঝিল, মাটির তৈরি ঘর, লিচু বাগানের মনোহর দৃশ্যাবলি। কোথাও সমতল ভূমি, কোথাওবা বন্ধুর পথ। একা বাঁকা পথ পেরিয়ে আমরা ছুটে চলি চান্দুরা থেকে ছতরপুরের দিকে। ২৫ কিলোমিটার পথ। একটা সিএনজিতে চেপে নজরকাঁড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চলে যাই সীমান্তবর্তী কমলা বাগানে। 

বিজয়নগরে দুটা কমলা বাগান। একটা খোকন মিয়ার, অন্যটা আলমগীরের। চায়না ও দার্জিলিং প্রজাতির কমলা। গাছে ঝুলে আছে টকটকে হলুদ রঙয়ের রসালো কমলা। সচারাচর আমাদের দেশে কমলা চাষ কম জায়গাতেই হয়। তাই যে কারও কাছে কমলা গাছে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা ফল দেখে অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। চমৎকার অনুভূতি বাড়তে থাকে আমাদের। লোভ বাড়ে খেতে। বাগানের মালিক খোকন মিয়া নিজেই বাগানে আসা পর্যটকদের ফল দিয়ে স্বাগত জানান। ইচ্ছামাফিক কমলা পেড়ে খাওয়াতে মানা নেই তার। অনেক পর্যটকই দেখি নিজ হাতে কমলা পেড়ে খাওয়ায় ব্যস্ত। কেউবা ছবিতে তুলে রাখছেন সুন্দর মূহুর্তগুলো। ষাট শতক জায়গার জুড়ে ফল বাগানটি। চার বছর আগে বাগানটিতে কমলা চাষাবাদ শুরু করেন খোকন মিয়া। প্রতিদিন গড়ে দেড়শ কেজি কমলা বিক্রি করেন তিনি। মজার বিষয় তার বাগানের সকল ফলই কিনে নিয়ে যায় ঘুরতে আসা পর্যটকরা। সেকারণেই এই বাগানের ফল বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হয় না।

এখান থেকে দশ মিনিটের পথ পেরিয়ে আখ মাড়াই কারখানা। পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন আখ চাষিরা। মহিষের মাধ্যমে সনাতন পদ্ধতিতে চলে মাড়াইয়ের কাজ। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত আখ মাড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন চাষিরা। যাঁতাকলের মাধ্যমে আখের রস বের করার পর চলে রস জাল দেওয়ার প্রস্তুতি। সুস্বাদু রস ও আখ গুড়ের বেশ কদর এখানে। শীতের পিঠা পুলিতে এখানে ব্যবহার করা হয় নির্ভেজাল গুড়। ছতরপুরে তিনটা যাঁতাকলের মাধ্যমে গুড় উৎপাদন করা হয়। একেকটা যাঁতাকল থেকে গড়ে ষাট-সত্তর কেজি গুড় তৈরি হয় প্রতিদিন। প্রতি কেজি গুড় আড়াইশ থেকে তিনশ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। বিজয়নগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কামরুল হাসান শান্ত ভাই সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখান আমাদের। একদম টাটকা আখ থেকে মাড়ানো ফেনা ওঠা রস দিলেন আমাদের খেতে। মিষ্ট রস। পাশের ছোট ছোট টং দোকানে চলছে আখের গোসা বিক্রি। প্রতি কেজি একশ পঞ্চাশ টাকা দরে। টং দোকানের সঙ্গে চটে বসে মহিলারা মাটির চুলায় তৈরি করে যাচ্ছেন ভাপা আর চিতই পিঠা। খাঁটি গুড় দিয়ে তৈরি গরম গরম পিঠা। এক কথায় দারুণ স্বাদ।

প্রকৃতিতে মুক্তির বাতাস, যেন বিজয়ের সুভাষ বইছে। হয়তো ডিসেম্বর মাস বলেই। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। এই বিজয়ের মাসে আমরাও এসেছি মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা সেই বিজয়নগরে। ১৯৭১ সালের বিজয়নগর ছিলো ৩নং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহ-এর অধীনে। রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়নগরের বীর সন্তানরাও ঝাপিয়ে পড়েছিলো পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করতে দিতে হয়েছে কত তাজা প্রাণ। সেইসব আত্মদানকারী বীরদের মধ্যে অনেককেই সমাহিত বিজয়নগর বিষ্ণুপুরে। তাদের প্রতি সম্মান জানাতে অনেকেই আসেন বিজয়নগর মুক্তিযুদ্ধের রণক্ষেত্র বিষ্ণুপুরে। বীর সেনাদের মনের গভীর থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে আমরা বিদায় নিই বিজয়নগর থেকে।

সাধারণ সম্পাদক, স্বজন সমাবেশ, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম