অচলায়তন
গণপরিবহণে নারী হেনস্তা বন্ধ হোক
মাইফুল জামান ঝুমু
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েক মাস আগে ইদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশে ময়মনসিংহ টু নান্দাইলগামী বিআরটিসি বাসে উঠেছিলাম। কিন্তু স্বপ্নকে বাড়িতে নিতে যতটা প্রফুল্ল মন নিয়ে বাসে উঠেছিলাম, বাসে ওঠার পর এ প্রফুল্ল ভাব এক নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। বিআরটিসির নারীদের সিটে বসে আছে পুরুষ, আর প্রায় ১০-১৫ জন নারী দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ বাসের সামনের সিটের ওপরের দিকে সুন্দর হাতে লিখা ‘মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের আসন ১৫টি’। মহিলা আসনে পুরুষদের বসা নিয়ে কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে না, এমনকি বাসের হেল্পার বা ড্রাইভারও না।
গত বছর পূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা টু ময়মনসিংহের মুক্তাগাছাগামী একটি বাসে উঠলাম। বাসে ওঠার পর ভাড়া দেওয়ার সময় আমার পাশের যাত্রী মহাখালী থেকে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা যাওয়ার ভাড়া দিয়েছেন ১৮০ টাকা। আর আমি ঢাকার উত্তরার হাউজবিল্ডিং থেকে বাসে উঠেছি, আর নেমেছি ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায়। যা মুক্তাগাছা উপজেলার আরও ৩৭.৬ কিলোমিটার আগে। অথচ আমার থেকে জোর করে ২০০ টাকা ভাড়া নিল। এ অবস্থায় নারী হয়ে হেল্পারকে কিছু বলতে গেলে সে উলটাপালটা অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়।
যানবাহনে নারী হেনস্তার ইতিহাস শুধু ওপরের দুটো ঘটনায়ই সীমাবদ্ধ নয়। বরং যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, ছিনতাই-এমন অনেক ঘটনাই গণপরিবহণে ঘটে। বাসে ওঠার সময় হেল্পার কর্তৃক নারীর গায়ে হাত দেওয়া, ভাড়া নেওয়ার নামে নারীর হাতে হাত লাগানো, পুরুষ যাত্রীদের লোভাতুর দৃষ্টি, বাসের ইঞ্জিনের ওপর নারীদের সিট স্থাপন-এসব সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহনে এ ধরনের নারী হেনস্তার ঘটনা আজকে নতুন নয়, এর আগে এসব ঘটনার কথা বহুবার পত্রিকায় উঠে এসেছে। বহুবার এর প্রতিরোধের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমরা নারীরা যানবাহনে এখনো অনিরাপদ। সর্বশেষ সরকার পরিচালিত জনগণনা অনুসারে, নারী মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ, ভোটের হিসাবে নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা চাইলে নিজেরাই সরকার গঠন করতে পারবে। অথচ দেশের এ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একটা অংশ যখন প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছে, তখন দেশের নিরাপত্তার ওপর আমাদের আস্থা কী?
বর্তমানে নারীরা বহির্মুখী। তাদের প্রতিদিনই রুজির প্রয়োজনে কিংবা শিক্ষাগ্রহণের প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়। সরকার যেখানে শিক্ষাক্ষেত্রে ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতির সম্ভাবনা রাখছে, সেখানে গণপরিবহণে নারীরা অগ্রগতিতে এক ধাপ পিছিয়ে আছে। কিন্তু এসবের শেষ কোথায়? যানবাহনে নারী হেনস্তার ঘটনা আর কত তুলে ধরলে এ সমস্যার সমাধান ঘটবে? একটি দেশ সভ্য কিনা, তা নির্ধারিত হয় সে দেশের নারীরা কতটা নিরাপদ সেটা দেখে। এ হিসাবে আমাদের দেশ কি আদৌ সভ্য দেশের তালিকায় পড়ে? জরিপ অনুযায়ী দেশের গণপরিবহণে নারীদের ৯৪ শতাংশ মৌখিক বা শারীরিক নিপীড়নের শিকার হন। নিপীড়িতদের অধিকাংশই কোনো প্রতিবাদ করেন না আবার হয়রানি কিংবা মানসম্মানের ভয়ে। নারীদের এ নীরব কান্নার অবসান ঘটাতে দ্রুতই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি নারীর প্রতি সংবেদনশীল হওয়া উচিত। বাসে নারীদের আসনে নারীদের স্থান হোক। প্রতিটি যানবাহনের ভাড়া আগে থেকে নির্ধারিত করে তালিকা আকারে যানবাহনে টানিয়ে রাখতে হবে। যেন ভাড়া নিয়ে কাউকে তর্কে জড়াতে না হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি সড়কে এমন লোকাল বাস চালু হোক, যেখানে নারীদের নির্ধারিত আসন ইঞ্জিনের ওপর না বসিয়ে বাসের মাঝামাঝি বা তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে রাখতে হবে। এ ছাড়া নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে তৈরি আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সমাজে সচেতনতামূলক বার্তা এবং নারীর প্রতি সবার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরি। রাস্তাঘাট, লঞ্চ, বাসে নারী থাকুক পূর্ণ নিরাপদ-এই আমাদের প্রত্যাশা।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
