সাফল্য
অপারেশন ছাড়াই লিলির হাতে ১৫০০ নবজাতকের স্বাভাবিক জন্ম
শেখ আব্দুর রহিম
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে মায়েদের জন্মদানের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অপারেশনের হার অনেক বেশি। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট প্রসবের শতকরা ৫২ শতাংশ এখন সিজারিয়ানের মাধ্যমে হয়। তবে এ হার গ্রামের তুলনায় শহরে দ্বিগুণ। শহরে বর্তমানে শতকরা ৮৪ শতাংশ মায়েদের সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে প্রসব হচ্ছে। দিনদিন বেড়ে চলেছে শতকরা এই হার। বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থা (WHO)-এর মতে, একটি দেশে সিজারিয়ানের আদর্শ হার প্রায় ১০-১৫-শতাংশের মধ্যে হওয়া উচিত। তবে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক জন্মদানের ক্ষেত্রে উদাহরণ তৈরি করেছেন স্বাস্থ্যকর্মী মেহুরুন নেহার লিলি। তিনি বাংলাদেশের সবশেষ জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাজি পাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার। তিনি একই ইউনিয়নের মকছেদ আলীর স্ত্রী। এখন পর্যন্ত তার হাত ধরে স্বাভাবিক জন্মদানের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০০ নবজাতক পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেছে।
২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর এ কমিউনিটি ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন লিলি। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে কমিউনিটি স্কিল বার্থ এটেনেডেন্ট বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে যোগদানের মাত্র একদিন পর তিনি স্বাভাবিক জন্মদানের প্রক্রিয়ায় এক প্রসূতি মাকে জন্মদানে সফল হন। তারপর থেকে তিনি অন্য স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি স্বাভাবিক জন্মদানের কার্যক্রম শুরু করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে কর্মক্ষেত্রে যোগদানের মাত্র একদিন পর তিনি স্বাভাবিক জন্মদানে সফল হন। এরপর কয়েক বছর যেতে না যেতে শত শত মায়ের স্বাভাবিকভাবে প্রসব করিয়ে পুরো এলাকায় আলোচনায় আসেন লিলি। ইতোমধ্যে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে প্রসূতি মায়েদের মধ্যে আস্থা ও ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। প্রসূতি মায়েদের মুখে মুখে এখন তার নাম, সবাই তার ভূয়সী প্রশংসা করছেন। দূরদূরান্ত থেকেও অনেক সন্তানসম্ভবা মা এখন লিলির কাছে ছুটে আসেন। বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে জনসংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৭ হাজার। কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫টির মতো স্বাভাবিক জন্মদান হয় এ স্বাস্থ্যকর্মীর হাত ধরে।
প্রথমে কিছুটা আশঙ্কা ও আতঙ্ক নিয়েই স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম শুরু করেছিলেন বলে জানান মেহেরুন নেহার লিলি। পরে নবজাতকের মুখ ও মায়েদের হাসি লিলির এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। নিজ সাহস ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভরসা রেখে নিয়মিত প্রসব করিয়ে যাচ্ছেন প্রত্যন্ত এলাকার এ স্বাস্থ্যকর্মী।
প্রসূতি মায়েদের উদ্দেশ্য লিলি বলেন, ‘আসলে চারপাশের আধুনিকতা আর রমরমা চিকিৎসা ব্যবসায় অনেকে স্বাভাবিক জন্মদানের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছেন। ভয় না পেয়ে প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক জন্মদানের চেষ্টা করা উচিত। সাহস, আস্থা ও ধৈর্য থাকলে স্বাভাবিক জন্মদান একেবারেই সহজ বিষয়। এতে মা ও শিশু উভয়ের শারীরিক সুস্থতা বজায় থাকে। মায়ের হাসির চেয়ে পৃথিবীতে দামি বস্তু আর কিছু হতে পারে না। পৃথিবীর বুকে নবজাতকের আগমন আর মায়ের খুশিই আমার খুশি। আমার হাতে পৃথিবীতে আসা প্রথমদিকের বাচ্চাগুলো এখন বেশ বড়। ওদের সামনে থেকে সুস্থভাবে চলাচল করতে দেখলে মনটা ভরে ওঠে।’
