Logo
Logo
×
   

সুরঞ্জনা

মুন্সীগঞ্জের রূপকথার রাশিয়া জয়

Icon

রাজীব পাল রনী

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মুন্সীগঞ্জের মেয়ে রূপকথা রায়। রাশিয়ায় বায়োলজি অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জয় করে দেশের জন্য বয়ে এনেছে গৌরব। ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম ও স্বর্ণজয়ের সাফল্য-রূপকথার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তার জীবনের অজানা সব গল্প।

নারীকে প্রতিদিন নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আটকে যাচ্ছে অনেকের স্বপ্ন। তবু থেমে নেই নারীর জীবন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের নারীরা এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের মেধা, সাহস ও দক্ষতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখছেন। বিশ্বজয়ে এদেশের নারীরা এখন শুধু অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ নেই-নানা সামাজিক ও আর্থিক প্রতিবন্ধকাতা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেশের জন্য গৌরবও বয়ে আনছেন একের পর এক। বিশ্বমঞ্চে এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এবার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সরকারি হরগঙ্গা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বর্ণজয়ী রূপকথা রায়।

চলতি বছরের ১৫ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত চলা রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড (OIBO) ২০২৬’-এ project Round প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসাবে মর্যাদাপূর্ণ স্বর্ণপদক ছিনিয়ে এনেছে রূপকথা।

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি নারী শিক্ষার্থী হয়ে তার এগিয়ে যাওয়ার অনন্য এ অর্জন সহজ ছিল না। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রশিয়ার মাটিতে নিজের যোগত্যার প্রমাণ দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা, অনুভূতি কেমন হতে পারে, তা মেধাবী শিক্ষার্থী রূপকথার স্বর্ণ জয়ের গল্পে উঠে আসে।

বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান রূপকথা। তার বাবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক, ব্যবসায়ী নবীন কুমার রায় ও মা কৃষিবিদ এবং প্রভাষক প্রমিতা শিখা রায়। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ীর মফস্বলে।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডগুলোর মধ্য রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিয়াড অন্যতম জনপ্রিয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভিত্তিক সংলাপ এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক গ্রুপভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রকল্প আহ্বান করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বায়োলজি অলিম্পিয়াড (OIBO)-২০২৬-এর রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ করে প্রস্তুতি শুরু করে রূপকথা। তখন থেকেই বিশ্বমঞ্চে নিজের মেধা প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে সে। গবেষণাভিত্তিক প্রশ্ন, ল্যাব পরীক্ষা, বায়োইনফরমেটিক্স সম্পর্কিত ব্যখ্যা ও তাত্ত্বিক বিষয়ে ব্যাপকভাবে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণে দক্ষতা অর্জন করে রূপকথা।

রূপকথা বলেন, ‘শুরুতেই সবকিছু বেশ সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু একজন নারী শিক্ষার্থী হয়ে এ পথচলা খুব সহজ ছিল না। রাশিয়া ভ্রমণের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো যাত্রাটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কঠিন হয়ে ওঠে। তবু অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে। সবচেয়ে কঠিন ছিল রাশিয়ায় পৌঁছানো। এটি ছিল আমার প্রথম একক আন্তর্জাতিক ভ্রমণ। রাশিয়ায় পৌঁছানোর আগেই ফ্লাইট কয়েকবার বাতিল হওয়ার কারণে ভ্রমণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়েছিল। নতুন করে টিকিট কেটে একাধিকবার এয়ারলাইন্স বদলানো। নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করায় গ্রুপের সঙ্গে ভ্রমণ না করতে পারা আমার জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। ফ্লাইট মিস করার পর মানসিক ও অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। ফ্লাইট জটিলতায় আলাদা আলাদা ছয়টি টিকিট কেটে ঢাকা থেকে দুবাই ও সেখান থেকে মস্কো এবং সূচি পর্যন্ত একাই গন্তব্য পৌঁছাতে হয়েছে।’

বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘ জার্নি শেষ করে রূপকথা যখন রাশিয়ায় পৌঁছায় তখন প্রতিযোগিতার কার্যক্রম প্রায় শুরু হয়ে যায়। অলিম্পিয়াডে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও মিস করে সে। তবু হাল ছাড়েনি মেধাবী এ শিক্ষার্থী। চোখে স্বপ্ন আর মনে অদম্য আত্মবিশ্বাস নিয়ে সীমিত সময়ে প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রজেক্টর, ক্যালকুলেশন, ডাটা, অ্যনালাইসিস, রেজাল্ট ইন্টারপ্রিটেশন, অবজারভেশন এবং বৈজ্ঞানিক ডকুমেন্টেশনের কাজে সরাসরি যুক্ত হয়ে ধাপে ধাপে সামনে এগিয়ে গেছে রূপকথা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দল ওপেন ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াড (OIBO) ২০২৬-এ project Round প্রতিযোগিতায় মর্যাদাপূর্ণ স্বর্ণপদক অর্জন করে। প্রজেক্ট সদস্য ছিল দুজন রূপকথা আর তাসিন মোহাম্মদ। এ সম্মান ছিল দুই সদস্যের টিমের যৌথ অর্জন। যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীকে নিয়ে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নারী শিক্ষার্থী হয়ে অল্প বয়সে রূপকথার স্বর্ণপদক অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য গৌরব। রূপকথার সাফল্যের গল্পটা শুধু বিজ্ঞানের ল্যাব কিংবা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। সে এক সত্যিকারের ‘অলরাউন্ডার’। সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত ‘ইয়ুথ সামিট’-এ পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে অংশগ্রহণ করে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ জন প্রতিনিধির মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছে রূপকথা রায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ঝুলিতে ইতোমধ্যেই জমা হয়েছে ৭টিরও বেশি পুরস্কার। গবেষণাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তার এমন কীর্তি বাংলাদেশের প্রান্তিক মেয়েদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .