Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

বিএনপির পথচলায় অভিন্ন বার্তা

Icon

এম এ হামিদ

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপির পথচলায় অভিন্ন বার্তা

জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান-এ তিন প্রজন্মের নেতৃত্বের আহ্বানে যে অভিন্ন সূত্রটি পাওয়া যায় তা হলো : ঐক্য মানেই টিকে থাকা, বিভাজন মানেই পতন। জিয়া যেমন ইসলাম ও জাতীয়তাবাদকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন, তেমনি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানও ঐক্যকে রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি হিসাবে স্থাপন করেছেন। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান যখন ‘জাতীয়তাবাদী ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনের’ কথা বলেন, তখন তিনি বুঝেছিলেন রাজনীতি যদি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক হয়, তবে স্বাধীনতার চেতনাও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তাই তার দৃষ্টিতে ‘জাতিই’ ছিল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। যখন ‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান জানালেন, তখন সেটি ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে পুনর্গঠনের আহ্বান। ১৯৮০-এর দশকে ছাত্রদল, শ্রমিকদল, কৃষকদলসহ অঙ্গসংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিল শক্তিশালী গণভিত্তি। ১৯৯০ সালে বিএনপি সেই ঐক্যের শক্তিতেই জনগণকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বৈরাচার পতন ঘটায়।

ঐক্য ভাবনার উত্তরাধিকার বহন করেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৯১ সালের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘মতভেদ থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে এক’। অর্থাৎ গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটের অধিকার নয়; এটি একটি সহিষ্ণু ঐক্যের সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমতও একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের সেতুবন্ধন ঘটায়। সেই ঐক্যের রাজনীতি আজ আবার নতুন আঙ্গিকে ফিরে এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপির বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক বাধা সত্ত্বেও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিল। এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও বিএনপি এককভাবে নয়, বরং জাতীয় ঐক্য মঞ্চের অংশ হিসাবে আন্দোলন পরিচালনা করে। এ ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে- ঐক্য বিএনপির মূল রাজনৈতিক দর্শন, যার উৎস জিয়াউর রহমানের ‘জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি’ ধারণা। যিনি ২০২৪ সালে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন-

‘বিএনপি এক হলে, জনগণও এক হবে।’ এ বক্তব্যে কেবল দলের পুনর্গঠনের বার্তা নেই, আছে এক রাজনৈতিক গণজাগরণের ইঙ্গিতও। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের ঐক্য সবসময়ই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধশক্তি। অতীতের আন্দোলনে যেমন ঐক্য জুগিয়েছে শক্তি ও সাফল্য, তেমনি বর্তমানেও সেটিই হতে পারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।

রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, ঐক্য রক্ষার এ আহ্বান এখন শুধু দলের ভেতরের নয়, জাতীয় পরিসরেও জরুরি হয়ে উঠেছে। বর্তমান বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক কাঠামো সবকিছুই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে বিরোধী শক্তি যদি বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে গণতন্ত্রের পুনরুত্থান আরও বিলম্বিত হবে। নির্বাচন কেবল প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এটি আসলে একটি সমষ্টিগত সামাজিক চুক্তি-যেখানে মানুষ নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেয় ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের প্রত্যাশায়।

আল্লাহর রজ্জু অর্থাৎ কুরআন ও রাসূলের দ্বীন যেমন মানুষকে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছে, তেমনি আমাদের রাজনৈতিক জীবনেও এ ঐক্যের চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে। ঐক্য বিনষ্টের প্রধান কারণ হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থরাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় নীতির চেয়ে নেতা, সংগঠনের চেয়ে ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলে। এভাবেই তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়, যা গণ-আন্দোলনের শক্তিকে দুর্বল করে।

এ একতার রাজনৈতিক তাৎপর্য কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে বিভক্ত বিরোধী শক্তি কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায় না, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির সুবিধা নেয়। তাই কৌশলগতভাবে ‘এক আসনে এক প্রার্থী’ নীতি শুধু দলীয় ঐক্য নয়, তা গণতন্ত্রের পুনর্গঠনেরও ভিত্তি। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সংগঠনকে দৃঢ় রাখা, নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করাও একতার অপরিহার্য শর্ত। কারণ, রাজনৈতিক ঐক্য কেবল বক্তৃতার বিষয় নয় এটি বাস্তব সংগঠন ও নেতৃত্বের সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হতে হয়।

তবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সহজ নয়। এর পথে থাকে নানা চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণ বিভাজন, মতপার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, এমনকি বাহ্যিক ষড়যন্ত্রও। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে দল নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে জয় করতে পারে, সেই দলই রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষমতা দেখায়। তাই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রশ্নে নেতাদের দায়িত্ব শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, নিজেদের মধ্যে আস্থা ও সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। মতভেদ থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য যেন এক থাকে এটাই গণতন্ত্রের প্রাণ।

বিএনপির ঐতিহ্য সবসময়ই ঐক্যের রাজনীতি। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেমন বলেছিলেন “ঐক্যই আমাদের শক্তি, বিভক্তি আমাদের পরাজয়।” এই দর্শনের প্রতিফলনই আমরা দেখতে পাই প্রতিটি সংকটময় সময়ে। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও বিএনপি তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মাধ্যমে। এ দল শুধু রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং গণআকাঙ্ক্ষার এক প্রতীক। সাম্প্রতিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন পাওয়া বা না-পাওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যেও যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বজায় থাকে, তবে সেই ঐক্যই হবে দলের পুনরুত্থানের শক্তি। বিএনপির ইতিহাসে দেখা যায়-যখনই দলের ভেতরে বিভক্তি এসেছে, তখন আন্দোলন দুর্বল হয়েছে; আর যখনই ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তখনই জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। এ ঐক্যের দর্শনই বিএনপির টিকে থাকার, পুনর্জাগরণের এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূলমন্ত্র। এটা শুধু বিএনপির ক্ষেত্রে শুধু নয় অর্থাৎ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা দলীয় সুবিধার চিন্তায় যদি বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়-দল, জনগণ, রাষ্ট্রও। কিন্তু যদি বিপদের মুখে সবাই একত্র হয়, পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখে, তাহলে কোনো শক্তিই সেই ঐক্যকে পরাজিত করতে পারে না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যত বড় রাজনৈতিক সাফল্য, সবই এসেছে সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে। স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, এমনকি ২০০৬-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটকালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানেও জনগণের ঐক্যই ছিল পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। তাই আজও যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তীব্র, তখন ঐক্যই হতে পারে সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র।

আমাদের মনে রাখতে হবে-বিভাজনের সৃষ্টি হলে বিজয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়; বিজয় আসে তখনই, যখন সবাই একই লক্ষ্যে, একই বিশ্বাসে, একই পতাকাতলে দাঁড়াতে পারে। তাই আপনারা কেউ ঐক্য বিনষ্ট করবেন না। কারণ, ঐক্যই এখন বাংলাদেশের পুনর্জন্মের শেষ আশ্রয়।

এম এ হামিদ : সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী

theatrecbt@gmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম