Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কী বার্তা দিতে পারে

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কী বার্তা দিতে পারে

এ লেখাটি দৈনিক যুগান্তরে যেদিন প্রকাশিত হবে, সে দিনটি হলো ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। এ দিনটিতেই বাংলাদেশে বহুপ্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে-নির্বাচনটি কেমন হবে? শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে কিনা। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর এ নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী, বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষ খুব ভয়ংকর ও ভীতিপ্রদ ছিল-এমনটি বলা যাবে না। তবে দুঃখজনকভাবে স্মরণ করতে হয়, নির্বাচনি প্রচারণার সংঘর্ষে শেরপুরে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা পর্যায়ের নেতা মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতরভাবে আহত হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। শেরপুরের সংঘর্ষে বিএনপির নেতাকর্মীরাও আহত হন। দেশের অন্যত্র যেসব সংঘর্ষ হয়েছে, সেসব সংঘর্ষে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা আহত হয়েছেন। তবে সংখ্যার দিক থেকে খুব বেশি নয়। আমাদের দেশে নির্বাচনি প্রচারণায় উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনি প্রচারণায় মেতে ওঠে, তখন সহনশীলতার অভাবে সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। সে তুলনায় এবারের নির্বাচনি প্রচারণায় সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা খুব ব্যাপক নয়। নির্বাচনের আগের দু-তিন দিনে সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটেনি বললেই চলে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আশা করি, ১২ ফেব্রুয়ারি দিনটি নির্ঝঞ্ঝাটভাবে পার হয়ে যাবে। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পাব বলে আশা করতে পারি।

গত ক’মাস ধরে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন-নির্বাচনটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কিনা। যারা এরূপ সন্দেহ পোষণ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে বলার চেষ্টা করেছেন, কেন নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। একটি গোষ্ঠী সোশ্যাল মিডিয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে বলার চেষ্টা করেছেন, কেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের ৫-৬ বছর ক্ষমতায় থাকা উচিত। এদের যুক্তি ছিল-ইউনূস সরকার কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে দেশকে একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে নেওয়ার পরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রথমদিকে ইউনূস সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দিতে ইতস্তত করায় নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

তবে লন্ডনে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক হওয়ার পর উভয়পক্ষ সম্মত হয় যে, নির্বাচনটি ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে। এ দুপক্ষের মধ্যে সহমত হওয়ার পর দেশ সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে গেছে। এখন আমরা আশা করতে পারি, ১২ ফেব্রুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের নির্বাচনি ভাষণের পর নির্বাচন নিয়ে আর কোনো সংশয় ও সন্দেহের অবকাশ থাকছে না। শেষ পর্যন্ত এ নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। বাংলাদেশের জনগণ সন্দেহ করছিল, ভারত বা তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ নির্বাচন ভণ্ডুল করার জন্য নাশকতা চালাতে পারে। এ উদ্বেগ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছিল, যখন বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী নেতারা ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিচ্ছিল। অন্যদিকে ভারত সরকার বাংলাদেশে একটি ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা বলা অব্যাহত রেখেছে। আবার এ কথাও বলেছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে বাংলদেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক মহল থেকেও ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছিল। কিন্তু যতই দিন গেছে, ততই ইনক্লুসিভ নির্বাচনের দাবি নীরব হতে শুরু করেছে। পাশ্চাত্য ও চীনের রাষ্ট্রদূতরা যেভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে কথাবার্তা চালু রেখেছেন এবং দলগুলোর নির্বাচনি ম্যানুফেস্টো ঘোষণার অনুষ্ঠানে ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, তা থেকে অনুমান করা যায়, এ মুহূর্তে যেভাবে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেভাবেই তারা এটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে। এমনকি ভারত সরকারও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে মনে করছে যে, এখন যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাতে তাদের কোনো সরব আপত্তি নেই। সব মিলিয়ে প্রতীয়মান হয়, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনটি নির্বিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে হয়ে যাবে।

নির্বাচন নিয়ে একটি বড় জিজ্ঞাসা হলো, ভোটারদের কত শতাংশ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। যত বেশি ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তার নিরিখেই বলা যায়, নির্বাচনটি সার্থক হয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে শতভাগ সন্দেহমুক্ত নয়। বলা যায়, অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোতে ভোটার টার্নআউটের পরিসখ্যান অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্য। ২০০৮-এর যে নির্বাচন ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সে নির্বাচনে ভোটার টার্নআউট ছিল স্মরণকালের মধ্যে বেশি। সংখ্যার হিসাবে এটা ছিল ৮৭ শতাংশ। এত ভোটার সে নির্বাচনে ভোট দিয়েছে-তা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয় দেখাতে ভোটের বাক্সে নির্বাচন পরিচালনাকারীরা অনৈতিকভাবে ব্যালট পেপার পুরে দিয়েছিল। বেশকিছু কেন্দ্রে দেখা গেছে, ভোটারের সংখ্যার চেয়ে ব্যালট পেপারের সংখ্যা বেশি। এই নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছিল মঈন-উ-আহমদ ও তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের ইঙ্গিতে।

প্রশ্ন হলো-এবারের নির্বাচনে ভোটার টার্নআউট কেমন হবে? আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে নেই। তাদের সমর্থকরা কি ভোটে অংশগ্রহণ করবে? ২০২৪-এর বিশাল গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের সমর্থনের ভিত্তি অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি এড়াতে বিএনপি অথবা জামায়াতের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়েছে। ভোটের রাজনীতির বাস্তবতায় বলা যায়, দল দুটি হয়তো এ ব্যাপারটিকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ছোট একটি অংশ হয়তো আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগাররা তাদের নিজ নিজ হিসাব অনুযায়ী ভোটে অংশগ্রহণ করবে কিনা, নাকি নীরবে বাড়িতে বসে থাকবে? অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনি র‌্যালিগুলোয় বিপুল লোকসমাগম হয়েছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের কমতি নেই। নির্বাচনটি উৎসবমুখর হবে বলেই আশা করা যায়। এ ছাড়া পরপর তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তরুণ ভোটাররা জানেই না ভোটের স্বাদ কেমন। এসব কারণে অনেকেই ভোটকেন্দ্রমুখী হবে। একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে বলে আশা করা যায়। সর্বোচ্চ প্রশাসনের তরফ থেকে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে দলমন্য রিটার্নিং অফিসাররা পক্ষপাতিত্বের দিকে ঝুঁকতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনা করে বলা যায়, একতরফা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে কিছু বেশি হতে পারে।

নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর থেকে জামায়াত নির্বাচনকে প্রধান করণীয় মনে করে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রস্তুতি শুরু করে। গত দেড় বছরে তারা সংগঠন গুছিয়েছে এবং ভোটারদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। এ দলের মহিলাকর্মীরা অত্যন্ত তৎপর হয়ে বাসাবাড়ির ভেতরে মহিলা ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, অতীতের নির্বাচনগুলোয় জামায়াত যে হারে ভোট পেয়েছে, এবার তার হার অনেকটাই বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভোট পাওয়ার হার জামায়াতকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পথে নিয়ে যাবে কিনা, তা বলা যায় না। জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, জামায়াতের নিজস্ব ক্যালকুলেশনে তাদের নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হতে পারলে জামায়াত সে সুযোগে নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি সংহত ও প্রশস্ত করার সুযোগ পাবে। অতীতে তারা তাই করেছে।

এবারের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে তরুণ ভোটার, নারী ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটার নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে। যে দল ভোটারদের এ অংশগুলোকে সফলভাবে প্রভাবিত করতে পারবে, সে দলই হাসবে শেষ হাসিটি।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম