Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

কেমন হওয়া উচিত আমাদের পররাষ্ট্রনীতি

Icon

আসিফ রশীদ

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর দাবার বোর্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় ‘স্কয়ার’। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর উদীয়মান অর্থনীতির এই ভূখণ্ড ঘিরে এখন চলছে বহুমুখী পরিকল্পনা। একদিকে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে বেইজিং, মাঝখানে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। তাই বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারকে চীনের সামরিক যন্ত্রপাতির বিকল্প হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। তিনি আরও বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভালো সম্পর্ক দেখতে চায়।

সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চাইবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের পররাষ্ট্রনীতি কি অন্য কোনো দেশের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলবে? নাকি তা নির্ধারিত হবে কেবলই জাতীয় স্বার্থের মানদণ্ডে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক ব্যাকরণ হলো-একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, কোন দেশের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি কতটা গভীর হবে, তা সম্পূর্ণ সেই রাষ্ট্রের নিজস্ব এখতিয়ার। এটি সেই দেশের সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন একটি শক্তিশালী দেশ অন্য একটি দেশকে বলে দেয় যে, অমুক দেশের কাছ থেকে তোমরা পণ্য কিনতে পারবে না বা নির্দিষ্ট কারও প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, তখন তাকে আর কূটনৈতিক পরামর্শ বলা যায় না। সোজা বাংলায় একে বলতে হয় ‘খবরদারি’।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশল বাস্তবায়নে চীন এখন প্রধান প্রতিপক্ষ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমানো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। কিন্তু এই দ্বৈরথে ঢাকাকে কেন ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহৃত হতে হবে? চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক লেনদেন-সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি দৃশ্যমান। অন্যদিকে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এ দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোনো এক পক্ষকে বেছে নেওয়া বা কারও চাপে অন্যকে বর্জন করা বা কাছে টেনে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

২.

জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দলটির পররাষ্ট্রনীতির দর্শন কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার অবকাশ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এ রাজনৈতিক দলটি যখন রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব নেবে, তখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন’ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘লুক ইস্ট’ পলিসি বা প্রাচ্যমুখী যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল একমুখী নির্ভরশীলতা কোনো দেশের সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে পারে না। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় নতুন সরকারকে সেই দর্শনেরই একটি আধুনিক ও বাস্তবসম্মত সংস্করণ প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে সম্পূর্ণ ‘বাংলাদেশকেন্দ্রিক’। এখানে কোনো ‘দাদা’ বা ‘প্রভু’র স্থান থাকা উচিত নয়; বরং সবার সঙ্গেই সম্পর্ক হবে ‘বন্ধুত্বের’।

উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের প্রধান স্তম্ভ তিনটি : অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমাদের যেমন বিনিয়োগ প্রয়োজন, তেমনি নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য প্রয়োজন বড় বাজার। চীন যদি সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করা আমাদের অধিকার। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের জিএসপি সুবিধা বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) দেয়, তাহলে তাও আমাদের জন্য জরুরি। এখানে ‘বর্জন’ নয়, বরং ‘সদ্ব্যবহারই’ হওয়া উচিত মূল কৌশল।

বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে যে নিরাপত্তাবলয় তৈরি হচ্ছে, সেখানে কোনো সামরিক জোটে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার পক্ষে থাকাই হবে বাংলাদেশের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের ভূমি কোনো বিদেশি শক্তির অপতৎপরতার জন্য ব্যবহৃত হতে দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ, তা তাদের নিজস্ব মাথাব্যথা হতে পারে, আমাদের নয়। বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণ কীসে, তা নির্ধারণ করবে ঢাকা-ওয়াশিংটন, বেইজিং বা নয়াদিল্লি নয়। বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ বা তাদের ওপর অতিনির্ভরতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতার পালাবদল হবে জনগণের ইচ্ছায়, কোনো পরাশক্তির ইশারায় নয়। বিএনপি যখন ক্ষমতায় আরোহণের অপেক্ষায়, তখন তাদের বৈদেশিক সম্পর্কের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’-বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই চিরায়ত নীতির প্রকৃত বাস্তবায়ন। তবে এই বন্ধুত্বের আড়ালে যেন কোনো ধরনের নতজানু মানসিকতা না থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের প্রভাব ঠেকাতে চায়, তাহলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণে সহায়তা দিয়ে সেই চেষ্টা করতে পারে। ধমক বা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন হয় না। অন্যদিকে চীনকেও বুঝতে হবে, বাংলাদেশের ঋণ গ্রহণ যেন ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের জালে পরিণত না হয়। পররাষ্ট্রনীতি কোনো আবেগ বা অন্ধ আনুগত্যের বিষয় নয়। সবসময় এর প্রধান লক্ষ্য ‘জাতীয় স্বার্থ’। আমাদের নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে বিশ্ব দরবারে এটি প্রমাণ করা যে, বাংলাদেশ আর কারও দাবার ঘুঁটি নয়। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে স্বাধীন। আমরা চীনের সঙ্গে ব্যবসা করব আমাদের প্রয়োজনে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব বজায় রাখব আমাদের স্বার্থে। কেউ যদি আমাদের ওপর খবরদারি করতে চায়, তাহলে সেই দেওয়াল ভেঙে বের হয়ে আসার সাহস ও নৈতিক শক্তি নতুন সরকারকে দেখাতে হবে। দিনশেষে বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশের মানুষ।

৩.

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের ওপর ভিত্তি করে নতুন সরকারের জন্য একটি ‘পররাষ্ট্রনীতি পলিসি ব্রিফ’ বা কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরতে চাই :

দেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে কেবলই জাতীয় স্বার্থ। কোনো বিশেষ শক্তির কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হবে না। সম্পর্কের মাপকাঠি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে চীনের প্রভাব ঠেকানোর মার্কিন কোনো একপাক্ষিক কৌশলে বাংলাদেশ সরাসরি অংশ নেবে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ বজায় রাখা হবে, যাতে কোনো ‘খবরদারির’ সুযোগ না থাকে। অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন ও কারিগরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীনকে বড় অংশীদার হিসাবে রাখা হবে। তবে ‘ঋণের ফাঁদ’ এড়াতে প্রকল্প বাছাই ও অর্থায়নের শর্তাবলীতে কঠোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হবে উন্নয়নকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশ তার নিজস্ব ‘ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক’ বজায় রাখবে। এটি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। বঙ্গোপসাগরে অবাধ ও নিরাপদ নৌ-চলাচলের পক্ষে থাকবে বাংলাদেশ। ‘কোয়াড’ বা ‘বিআরআই’র মতো উদ্যোগগুলোতে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ যাচাই করে অংশগ্রহণ করবে, কোনো সামরিক জোটে অংশগ্রহণ নয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। ট্রানজিট, পানি বণ্টন ও সীমান্ত হত্যার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ আলোচনা হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের সম্পর্ক আরও গভীর করা হবে। পাশাপাশি ‘লুক ইস্ট’ পলিসির মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে শুধু বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে এফডিআই এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দেওয়া হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বকীয়তার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘জাতীয় কৌশলগত থিংক-ট্যাংক’ গঠন করা যেতে পারে। কোনো বড় ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই থিংক-ট্যাংক কেবল বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ করে সরকারকে পরামর্শ দেবে।

সারকথা, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হবে প্রো-অ্যাকটিভ, রি-অ্যাকটিভ নয়। আমরা অন্য কারও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করব না, বরং আমাদের প্রয়োজনে বিশ্বকে ব্যবহার করব।

আসিফ রশীদ : উপসম্পাদক, যুগান্তর

arbangladesh@gamil.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম