হালফিল বয়ান
ভোটের জয় থেকে গণতন্ত্রের বিজয়ের পথে
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে ‘সফল’ এবং ‘বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসাবে অভিহিত করেছেন দেশে-বিদেশের সবাই। ভোটের জয়ে গণতন্ত্রের বিজয়ের পথ আরও মসৃণ ও প্রসারিত হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে এখন সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং দেশ ও এর রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক পথে রূপান্তর করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট ম্যান্ডেট রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে অভাবিত ও ঐতিহাসিক ভোটপর্বের পর গণতন্ত্রকে মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদানের লক্ষ্যে একযোগে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। সবাই আশা প্রকাশ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া মসৃণ হবে এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশে রাজনীতির ধারা ওলটপালট করে দেওয়া ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের আঠারো মাস পর বহু প্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচন অবশেষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেকেই একে নতুন এমন এক যুগের সূচনা হিসাবে চিহ্নিত করছেন, যে যুগে প্রভুত্ব করবে জনগণ। সংসদে সবচেয়ে বড় দুটি দল হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী (জেআই)। বিএনপি নেতা তারেক রহমান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তার মা, প্রয়াত খালেদা জিয়া, নব্বইয়ের দশক এবং এরপরেও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী কার্যত ‘মৃত্যুদশা থেকে ফিরে এসেছে’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার দায়ে ২০১০ সালের পর তাদের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দলটি এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ে একমাত্র প্রকৃত ‘নতুন’ শক্তি ছিল ছাত্র নেতৃত্ব, যারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের একটি অংশ সম্প্রতি গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করছে, যা নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটাররা দুটি পৃথক ব্যালটে ভোট দেন। একটি সংসদ-সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি ব্যাপক সাংবিধানিক সংশোধনী আনার গণভোট হিসাবে। এর আগে বাংলাদেশে তিনবার গণভোট হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল বিশৃঙ্খল এবং সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা। বর্তমান গণভোটটি হয়েছে জুলাই বিপ্লবের রক্তাপ্লুত চেতনাকে সামনে রেখে এবং বৃহত্তর জনমতের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত তরুণ দেশ না হলেও পুরোনো গণতন্ত্রের দেশ নয়। গণতন্ত্র এখানে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয়েছে। অতীতে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের শুদ্ধ চর্চা না থাকায় প্রায় ১২ কোটি ভোটারের অন্তত অর্ধেকই আগে কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। ফলে বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন অনেক তরুণের জন্য ছিল প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার মুহূর্ত। ভোটের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ভোটার ‘দুর্নীতি’ বিরোধী স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছেন, যা বহু পুরোনো রাজনৈতিক দাবি।
উপমহাদেশের অন্য প্রান্তে, পাকিস্তানের ক্ষমতা কাঠামো ও মূলধারার বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিকে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দেখেছেন-ভারতঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগের পতন এবং ডানপন্থি শক্তির পুনরুত্থান তাদের কাছে আদর্শগতভাবে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণরা, যারা ২০২৪ সালের আগস্টে দেখিয়েছে যে, বিপ্লবী কল্পনা এখনো জনগণের সম্মিলিত রাজনীতিকে উদ্দীপ্ত করতে পারে, তাদের সামনে এখন কঠিন দায়িত্ব-নবনির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখা, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে কাজ করা। বড় কথা হলো-বাংলাদেশে ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় রয়েছে, যারা ক্ষমতাধরদের এবং তাদের সহযোগীদের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। নির্বাচনের সাফল্যের পথে এমন সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে প্রয়োজন দৃঢ় গণতান্ত্রিক কমিটমেন্ট।
বাংলাদেশের জন্য ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের এ সংগ্রামে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ভোটের অবাধ অধিকার, জনগণের ক্ষমতায়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা, যা শুধু নির্বাচনেই নয়, দৈনন্দিন রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হতে হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ দর্শন আত্মস্থ করতে পারে, তবে নির্বাচনি সাফল্যের পথে সামনের দিনগুলোতে সত্যিই নির্মিত হবে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কুতুব মিনার। গণতন্ত্রায়ণের পথে এ নির্বাচন বিশ্বের সামনেও এক অনন্য মডেল রূপে উপস্থাপিত হবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন একটি ক্রিটিক্যাল জংশনে দাঁড়িয়েছিল এবং সফলতার সঙ্গে উত্তরণ ঘটেছে। অতীতের পুনরাবৃত্তিমূলক সংঘাত, ক্ষমতার লড়াই আর প্রতিষ্ঠানহীনতার দুষ্টচক্র ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সুযোগের জানালা খুলে দিয়েছে, যাতে প্রবেশ করতে পারে গণতন্ত্রের অবারিত আলোকচ্ছটা। রাজনৈতিক দলগুলো ও নেতাদের পক্ষে এ সুযোগ কতটুকু কাজে লাগানো সম্ভব হবে, তার এসিড টেস্ট হবে নির্বাচন-পরবর্তী দিনগুলোতে। একইসঙ্গে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সুদীর্ঘ জনঅপেক্ষারও অবসান ঘটবে বলে আশা করা যায়।
মনে রাখা দরকার, গণ-অভ্যুত্থান কেবল শাসক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি জনমানসের গভীরে জমে থাকা আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণও। যখন মানুষ অনুভব করে, রাষ্ট্র তাদের সবার নয়, বরং কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের দাবি তীব্র হয়ে ওঠে। এ আকাঙ্ক্ষা মূলত অংশগ্রহণ, স্বীকৃতি ও মর্যাদার দাবি-যেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা সামাজিক পরিচয়ের মানুষও সমানভাবে রাষ্ট্রের অংশীদার হবে।
এমনই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ওপর একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় বর্তায়। যেহেতু গণ-অভ্যুত্থানের ফলে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে এসেছে, সেহেতু তাদের আচরণই নির্ধারণ করবে আন্দোলনের চেতনা বাস্তব রূপ পাবে কিনা। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের মানে কেবল সমর্থকদের সন্তুষ্ট করা নয়; বরং বিরোধী মত, সমালোচক, সংখ্যালঘু ও নাগরিক সমাজ-সবার জন্য সমান রাজনৈতিক পরিসর নিশ্চিত করা। প্রতিহিংসার রাজনীতি বা একক আধিপত্যের পথ বেছে নিলে গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তি দ্রুত ক্ষয় হয়ে যেতে পারে।
গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর টিকে থাকে না। এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে নাগরিকদের সচেতন ও ধারাবাহিক সক্রিয়তার ওপর। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই নাগরিকদের ভূমিকা শুরু হওয়া উচিত-নির্বাচন শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তখনই প্রয়োজন জবাবদিহি দাবি করা, নীতিগত সিদ্ধান্ত পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে মতপ্রকাশ করা।
ইতিহাসে দেখা যায়, শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলন গণতন্ত্রকে সঠিক পথে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র এ নাগরিক অধিকার আন্দোলন রাষ্ট্রীয় নীতিতে গভীর পরিবর্তন এনেছিল; ফ্রান্স এ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন সরকারকে সংস্কারমুখী করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের কাঠামো নয়; এটি এক জীবন্ত চর্চা, যা নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শক্তিশালী হয়।
অতএব, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ইচ্ছাপূরণ করতে হলে দুটি শর্ত অপরিহার্য-রাজনৈতিক দলের সহনশীল ও বহুমতগ্রহণকারী মনোভাব এবং নাগরিক সমাজের সচেতন সক্রিয়তা। একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি পূর্ণতা পায় না। গণ-অভ্যুত্থান পথ দেখাতে পারে, কিন্তু সেই পথে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব রাজনীতি ও নাগরিক সমাজের।
অতএব, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেবল একটি নিয়মিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসাবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ধরা পড়ে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু নির্বাচন আছে, যেগুলো শুধু সরকার বদলের ঘটনা নয়-বরং একটি যুগের অবসান ও আরেকটি যুগের সূচনা চিহ্নিত করে। এ নির্বাচন তেমনই এক সন্ধিক্ষণ।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। প্রায় দেড় দশক ধরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর চাপ, নির্বাচনিব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা, একদলীয় আধিপত্য এবং প্রশাসনের দলীয়করণের ধারণা জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছিল।
এ প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল নতুন একটি সরকার গঠনের আয়োজন ছিল না; বরং ছিল জনমতের এক ধরনের নৈতিক গণভোট। জনগণ শুধু নতুন প্রতিনিধিদের বেছে নেয়নি, বরং অতীতের ভীতিনির্ভর, কেন্দ্রীভূত ও দলীয়কৃত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতীকী রায় দিয়েছে। এটি নাগরিক মর্যাদা, অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের প্রত্যাশার প্রকাশ।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখলে, দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার পর যে কোনো নির্বাচন সমাজে নতুন আশার সঞ্চার করে। তবে এ আশার বাস্তবায়ন নির্ভর করে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক আচরণ, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।
অতএব, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসাবে দেখা উচিত। এটি যেমন অতীতের এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি নির্দেশ করে, তেমনি ভবিষ্যতের জন্য দায়বদ্ধ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন, এ সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ পাবে, এবং নতুন পথচলা কতটা সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ এখন তাকিয়ে আছে ভোটের জয় থেকে গণতন্ত্রের বিজয় দেখার জন্য।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
