রাজধানীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা : প্রান্তিক জীবনের অসম লড়াই
ডা. মো. রফিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। ফলে উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এখানে বেশি থাকবে-এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন প্রায় সব উচ্চমানের চিকিৎসা-সুবিধা এক শহরে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সেটি আর উন্নয়ন নয়; সেটি ভারসাম্যহীনতা।
ঢাকায় রয়েছে একাধিক সরকারি মেডিকেল কলেজ, শীর্ষ বিশেষায়িত হাসপাতাল, দেশের প্রধান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিপুলসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দেশের হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি, বক্ষব্যাধি-প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সুপার-স্পেশালিটি প্রতিষ্ঠান এখানে। ফলে চিকিৎসাসংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে ঢাকাকে ঘিরে। চিকিৎসক এখানে থাকতে চান; রোগী এখানে আসতে চান। এই স্বাভাবিক প্রবণতা ধীরে ধীরে একটি স্ব-প্রবর্ধনশীল চক্রে রূপ নিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই চক্রের বাইরে থাকা মানুষের কী অবস্থা?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিন রোগীর উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে। শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি, করিডরে বেড, চিকিৎসকের ওপর অমানবিক চাপ-এগুলো এখন স্বাভাবিক দৃশ্য।
বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প না থাকায় রোগীর চাপ কিছুটা অনুমেয়। কিন্তু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও যখন একই অবস্থা, তখন বোঝা যায় সমস্যার শিকড় ঢাকার বাইরে।
এটি শুধু জনসংখ্যার চাপ নয়-এটি আস্থার সংকট। মানুষ বিশ্বাস করে, ‘ভালো চিকিৎসা’ ঢাকাতেই পাওয়া যাবে। এ ধারণা যতটা বাস্তব, ততটাই কাঠামোগত বৈষম্যের ফল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে শতাধিক জেলা ও শতাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। কাগজে-কলমে অবকাঠামো আছে, বেড আছে, পদও আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় :
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য, আইসিইউ সীমিত বা অনুপস্থিত, ভেন্টিলেটর থাকলেও প্রশিক্ষিত অপারেটর নেই, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা সীমাবদ্ধ, জরুরি সার্জারি ও আধুনিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে জেলা হাসপাতালগুলো অনেক সময় ‘রেফারেল স্টেশন হয়ে দাঁড়ায়, চূড়ান্ত চিকিৎসার কেন্দ্র নয়।
উপজেলা পর্যায়ে অবস্থা আরও নাজুক। বেশির ভাগ ৫০ বেডের হাসপাতালগুলোয় প্রাথমিক সেবা দেওয়া সম্ভব হলেও জটিল রোগের ক্ষেত্রে রোগীকে দ্রুত জেলা বা ঢাকায় পাঠাতে হয়। এ রেফারেল চক্রে সময় নষ্ট হয়, ব্যয় বাড়ে, ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুলপ্রচলিত কথা- ‘Time is Muscle I’ অর্থাৎ, প্রতি মিনিট দেরিতে হৃৎপিণ্ডের কোষ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও একই কথা- ‘Time is Brain।’
বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা স্ট্রোক ব্যবস্থাপনায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর গুরুত্বের কথা বারবার উল্লেখ করেছে। দ্রুত থ্রম্বোলাইসিস বা ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা শুরু করতে না পারলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো-অধিকাংশ বিভাগীয় শহরে ২৪/৭ প্রাইমারি পিসিআই সুবিধা নেই, পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোক ইউনিট নেই, নিউরো-আইসিইউ সীমিত। ফলে রোগী উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, বিভাগ থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে মূল্যবান সময় হারিয়ে যায়।
এই সময়ের ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা বলে-সময়ের অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে।
ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রিকতা আরও প্রকট। দেশের একমাত্র ক্যানসার ইনস্টিটিউট মহাখালীতে রোগীর চাপ বিপুল। রেডিওথেরাপি মেশিন ও অনকোলজিস্টের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যানসারের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু চিকিৎসা অবকাঠামো সেই হারে বিকশিত হয়নি। কিডনি ডায়ালাইসিস ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অনেক জেলায় সরকারি ডায়ালাইসিস ইউনিট নেই বা সীমিত। ফলে রোগীকে সপ্তাহে দুই-তিনবার দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। এ যাতায়াতই রোগীর শারীরিক ও আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশই Out-of-Pocket। অর্থাৎ মানুষ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করে। ঢাকায় চিকিৎসা নিতে গেলে যাতায়াত, আবাসন, খাবার, কর্মঘণ্টা হারানো-সব মিলিয়ে প্রকৃত ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। ফলে অসুস্থতা অনেক সময় দারিদ্র্যের ফাঁদে ঠেলে দেয়।
স্বাস্থ্যসেবা যদি রাজধানীকেন্দ্রিক থাকে, তাহলে এটি শুধু চিকিৎসাগত নয়-সামাজিক বৈষম্যেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ কেন জেলা হাসপাতালে যেতে চায় না?
কারণ : ১. বিশেষজ্ঞের অনিশ্চয়তা ২. জরুরি ব্যবস্থার দুর্বলতা ৩. পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাব ৪. প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঘাটতি ৫. সফল চিকিৎসার অভিজ্ঞতা কম স্বাস্থ্যব্যবস্থা কাগজে নয়-অভিজ্ঞতায় মূল্যায়িত হয়। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বাস্তব মানোন্নয়ন প্রয়োজন।
করণীয় : বিকেন্দ্রীকরণই একমাত্র পথ
১. বিভাগীয় সুপার-স্পেশালিটি সেন্টার
প্রতিটি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ কার্ডিয়াক, স্ট্রোক, ক্যানসার ও কিডনি সেন্টার স্থাপন জরুরি। ঢাকায় আধুনিকায়নের পাশাপাশি বিভাগে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ২. জেলা হাসপাতাল আধুনিকীকরণ : * ১০-১৫ বেড * আইসিইউ * ডেডিকেটেড সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিট ২৪/৭ জরুরি সার্জারি * পূর্ণাঙ্গ ব্লাড ব্যাংক * ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম।
৩. মানবসম্পদ নীতি সংস্কার: * গ্রামীণ ভাতা, * দ্রুত পদোন্নতি, * উচ্চশিক্ষায় অগ্রাধিকার, * বাধ্যতামূলক জেলা সার্ভিস।
৪. ডিজিটাল স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক
টেলিমেডিসিন, ই-রেফারেল ও জাতীয় স্বাস্থ্য ডেটাবেইস চালু হলে অপ্রয়োজনীয় ঢাকামুখিতা কমবে।
৫. স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধি
জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ না দিলে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়।
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ইশতেহারও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যে বারবার স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে আন্তর্জাতিক মানের করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিগত বছরগুলো ফ্যাসিস্ট আমলে স্বাস্থ্য খাত একই সঙ্গে ছিল অবহেলিত ও দুর্নীতিতে জর্জরিত। আগামীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সুস্থ একটা জাতি গঠনের পরিকল্পনাগুলো বারবার তুলে ধরেছেন। ঢাকানির্ভরতা কমিয়ে জেলা-উপজেলা শহরগুলোয় আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা তার মধ্যে অন্যতম।
ঢাকা দেশের রাজধানী-স্বাভাবিকভাবেই এখানে বড় প্রতিষ্ঠান থাকবে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা রাজধানীর বিশেষ সুবিধা হতে পারে না।
যে দেশে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় মানুষ পঙ্গু হয় বা মারা যায়, সেখানে বিকেন্দ্রীকরণ বিলাসিতা নয়-এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
স্বাস্থ্যসেবা নাগরিক অধিকার। এটি ভৌগোলিক সৌভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
ঢাকাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি এখনই পুনর্বিবেচনা না করা হয়, তবে রাজধানীর হাসপাতালগুলো ভেঙে পড়বে এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
সময় এসেছে-রাজধানী নয়, নাগরিককে কেন্দ্র করেই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার।
ডা. মো. রফিকুল ইসলাম : স্বাস্থ্য সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, সহযোগী অধ্যাপক, ইউরোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
