অন্যমত
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। আমাদের রপ্তানিও আশানুরূপ হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ আমাদের প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিট অবজারভেশন কম হচ্ছে। সরকার ইচ্ছা করলেই শিল্পোদ্যোগ নিতে পারবে না। কারণ, সরকার পলিসি সাপোর্টার। বড় বড় অবকাঠামো গড়ার কারিগর। সুতরাং আমাদের রপ্তানি কমে যাওয়ার দায় শুধু সরকারের নয়। তাই রপ্তানি কেন কমছে, এর পেছনে কী কী সমস্যা রয়েছে-প্রথমে এগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং এসব সমস্যা উত্তরণের জন্য আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতার পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, সেটা হলো ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। সুদের হার বেশি থাকার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা নতুন করে শিল্পে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছে না। এর প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়ছে। শেয়ারবাজার বর্তমানে ডাউন হয়ে আছে। বলতে গেছে ডিপপ্রেসড অবস্থায় রয়েছে। যার ফলে শেয়ারবাজারে লিকুইডিটি কমে গেছে। লোকজন এখন আর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা এখন এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি ট্রেজারি বন্ড গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেটেই অবস্থান করেছে। তাহলে মানুষ কেন এখানে বিনিয়োগ করবে। মানুষ শেয়ারবাজার, সরকারি ট্রেজারি বন্ড ছেড়ে তখনই অন্যত্র বিনিয়োগের দিকে যায়, যখন বাজারে সবকিছুতে হতাশা থাকে। দেশে তা-ই হয়েছে।
আমি মনে করি, নতুন সরকারকে মনিটারি পলিসিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। ব্যবসায়ী মহল ও শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে সহনীয় মাত্রার সুদের মাধ্যমে টাকা প্রাপ্তির বিষয়টিকে আরও সহজ করে দিতে হবে। সাপ্লাই সাইটকে উৎসাহিত করতে হবে। সাপ্লাই সাইটকে উৎসাহিত করার জন্য যে নীতি দরকার, সে নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। সাপ্লাই সাইটকে উৎসাহিত করতে হলে ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণ দিতে হবে। এসবকিছু করতে পারলে মূল্যস্ফীতি আমাদের আয়ত্তের মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করি। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানা সম্ভব নয়। বিশ্বের অন্য দেশেও প্রমাণিত হয়েছে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে কোনো দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এ বিষয়টি যদি কোনো দেশ না মানে, তাহলে ওই দেশের অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যায়, অর্থনীতি মন্দায় আক্রান্ত হয়, যেটা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে বাংলাদেশে ঘটছিল। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এর থেকে অনেকটাই মুক্তি পেয়েছে দেশ। এর পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। নির্বাচিত সরকারের পক্ষে কিছু সাহসী পুনর্গঠন নীতি অবলম্বন করতে হবে। পুরোনো অনগ্রসরমান নীতিগুলোয় পরিবর্তন আনতে হবে।
আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, সেটা হলো বিদ্যুৎ খাতে এলপিজি নিয়ে যে ধরনের আপ্স অ্যান্ড ডাউন হয়েছে, সেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। এটা নিয়ে যে গ্রাহক ভোগান্তি হচ্ছে, সেটা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আওতায় আনা উচিত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানির দাম বাড়ায়নি। এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক দিক। কারণ জ্বালানির দাম বাড়ালে জনগণের মধ্যে একটা অসন্তোষ দেখা দিত। অন্য সরকার থাকলে এর মধ্যে হয়তো কয়েক দফায় জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিত। আসলে জনগণের চাহিদাকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষ ফায়দা নেয়। সেটা ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও হয়, সেবা খাতেও হয়। চাহিদাকে পুঁজি করে ফায়দা নেওয়ার কারণে কিছু মানুষ ফুলেফেঁপে ওঠে। কিন্তু এতে করে জনগণের ভোগান্তি অন্তত থাকে না। জনগণকে কষ্ট দিয়ে যারা নিজেদের আখের গোছায়, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত, যাতে করে এ কাজে কেউ কোনো সাহস ও সুযোগ না পায়।
সবাই চেয়ে আছে নতুন সরকারের দিকে। সরকার যদি সঠিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি রপ্তানি ও অর্থনীতিতে একটা গতি আসবে। আমাদের শেয়ারবাজারে অনেক রিফর্ম হয়েছে। এ রিফর্মগুলো দীর্ঘমেয়াদে অনেক উপকারে আসবে। যেমন শেয়ারবাজার থেকে অনেক কোম্পানিকে জেড গ্রুপে পাঠানো হয়েছে। এটা ঠিক আছে। আবার খাদের কিনারে থাকা পাঁচটি ব্যাংককে মার্জ করে ভালো একটা পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এসব ব্যাংকে যারা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী রয়েছে, তাদেরকে সরকার চাইলে কমপেন্সিভ করতে পারে। এতে বেশি টাকা লাগবে না। তবে যারা স্পন্সর এবং লুটেরা, তাদের কোনোভাবেই কমপেন্সিভ করা যাবে না। বরং ওদের শেয়ারগুলোকে বাজেয়াপ্তই করতে হবে। যারা বাজার থেকে শেয়ার কিনেছে, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা ছোট-খাটো ইনস্টিটিউশন, তাদের বিষয়টি নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। তবে এতে ভেলুয়ার লাগবে। এটা সরকারকে করতে হবে, যদি সরকার কমপেন্সিভ করতে চায়। পাঁচটি ব্যাংককে মার্জ করে যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হয়েছে, সেখান থেকেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারবে। তবে সেটারও ভ্যালুয়েশন লাগবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রিফর্ম হয়েছে মার্জিন লোনের ক্ষেত্রে। শেয়ারবাজারে গত ১৫-২০ বছরে যত অনাচার, অত্যাচার, স্ক্যান্ডাল হয়েছে, সব মার্জিন লোনের কারণে হয়েছে। বাজার ম্যানুপুলেশন করা, ফেক একটা নিউজ ছড়ানোর মাধ্যমে বাজারকে উপরে তোলা, কোনো নির্দিষ্ট স্টকের ফান্ডামেন্টাল, যেটা খুবই দুর্বল, সেটাকে টেনে উপরে তুলে ডিমান্ড ক্রিয়েট করা ইত্যাদি সবকিছুই মার্জিন লোনের মাধ্যমে হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে মার্জিন লোনের লাগাম টেনে ধরা হয়েছে। আশা করি, এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে একটা ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হবে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কিছু কিছু রিফর্ম করেছে, যেটা অনেকের পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা দীর্ঘ মেয়াদে ভালো হবে দেশের অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারের জন্য। কারণ ৩১০টি বা ৩৫০টি স্টক নিশ্চিত থাকলে তো কোনো লাভ নেই। ওইসব স্টক থেকে কী পরিমাণ ইনকাম জেনারেট হয়, মানুষ কী পরিমাণ ডিভিডেন্ড পায়, সেটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কেউ কেউ বলে, জেড গ্রুপের পাল্লা ভারী। আসলে জেড গ্রুপের পাল্লা ভারী হওয়াই তো উচিত ছিল। কারণ, এ ধরনের শেয়ার তো অন্য দেশে লিকুইডিশনে চলে যায়। আমাদের দেশে ব্যাংককে ফেল করতে দেয় না, অন্য দেশে ফেল করতে দেয়। আমাদের এখানকার বিষয় হচ্ছে, আমাকে সব ধরে রাখতে হবে, কোনোটাই ছাড়া যাবে না। তাই ধরে রাখতে গিয়ে রেগুলেটররা জেড গ্রুপে পাঠিয়েছে।
এ বিষয়গুলো আমাদের বিনিয়োগকারীদেরও বুঝতে হবে। আমাদের সামনে বিকল্প কম। তাই সে অনুযায়ীই আমাদের এগোতে হবে। আমাদের শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ার দরকার। শেয়ারবাজারে ভালো শেয়ার কীভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ মিটিং করা হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন আমাদের প্রত্যাশা, নতুন নির্বাচিত সরকার আরও সিরিয়াসলি এটা হ্যান্ডল করবে। শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানি আনার জন্য যা যা করা দরকার, তারা সেটা করবে। বহুজাতিক কোম্পানি, যেমন: ইউনিলিভার, নেসলে, আলিকো; ব্যাংকের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি-এগুলো বিশ্বের অন্য দেশে লিস্টেড কোম্পানি। তাহলে আমাদের দেশে কেন নয়? এগুলোকে যদি বাজারে না আনা যায়, তাহলে শেয়ারবাজারের অবস্থা অনেকটাই ম্লানমুখো হবে। ভালো কোম্পানির শেয়ার না এনে শেয়ারবাজারকে টেনে যদি ৬০০০ ইনডেক্সে নেওয়া হয়, সেটা শেয়ারবাজারের জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত হবে, আমার জানা নেই। কিন্তু ভালো কোম্পানির শেয়ার সাপ্লাই দিলে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকরা দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারগুলো হোল্ড করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশ যদি শেয়ারবাজারকে শুধু জুয়াখেলার আবর্তেই আটকে রাখতে চায়, তবে সেটা হবে ভয়ংকর এবং এটা শেয়ারবাজারকে ধ্বংস করবেই। ১৯৯৬ সালে তা-ই হয়েছে, ২০১০ সালেও। ১৯৯৬ সালে জুয়ারিরা জুয়ার মাধ্যমে অপকৌশল খাটিয়ে শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়েছে। অনেকে বাড়িঘর বিক্রি করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে পথের ফকির হয়েছে। সরকারেরও ভালো ভালো কোম্পানি আছে, সেগুলো নিয়েও বৈঠক হয়েছে অনেকবার। কিন্তু এ ব্যাপারে তেমন কিছুর আলোর মুখ আমরা দেখতে পাইনি। নতুন সরকার এ কাজগুলো যদি না করে, তাহলে মানুষ সরকারের অযোগ্যতার দিকে আঙুল তুলবেই। এমনটা হোক, সেটা আমরা কখনই চাই না। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। আমরা চাই নতুন সরকার সাহসিকতার সঙ্গে অনগ্রসরমান নীতিগুলোকে ভেঙে পুনর্গঠন করে নতুন আঙ্গিকে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
অধ্যাপক আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)
