শতফুল ফুটতে দাও
ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ-সদস্যদের এবং মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা শুরু করল। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, অতীতে গণতন্ত্রের পথে বিভিন্ন সময় অভিযাত্রার সূচনা হয়নি। প্রশ্ন জাগে, এদেশের মানুষ বারবার গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখে আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু কেন জানি তাদের আশার বুকটি ভেঙে যায়। কেন এমন হয়, তা অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন।
১৯৭৬-এ একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু তার সে যাত্রা ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ১৯৮১-এর ৩০ মে বিপথগামী সামরিক অফিসারদের অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। তার নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি যেভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি শুরু করেছিলেন, তার পূর্ণ অবয়ব দান তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুর পর একটি নির্বাচন হলো বটে; কিন্তু সে নির্বাচনের সাফল্য ধরে রাখা যায়নি। এ নির্বাচনে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। তাকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিতে প্রধান সেনাপতি এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান।
এরশাদ ৯ বছর স্বৈরশাসক হিসাবে ক্ষমতায় থাকেন। ১৯৯০-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হন। ১৯৯১ সালে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মানসম্পন্ন নির্বাচনটি অনুষ্ঠান করলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। এ সরকার দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য প্রয়াস চালায়। কিন্তু তাদের সেই প্রয়াস চরমভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের ফলে। সেসময় দেশে ১৭৩ দিন হরতাল হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরসহ অর্থনীতির ধমনিগুলো রুদ্ধ হয়ে যায়। ভয়াবহ সংঘাত-সংঘর্ষের পরিণামে শেষ পর্যন্ত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এ সরকার গঠিত হয়েছিল সংবিধানের একটি সংশোধনী বলে। এ সংশোধনীর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেবার অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বিএনপি পরিণত হয় দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বিরোধী দলে। এ সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সন্ত্রাসের ঘাঁটি গড়ে ওঠে। এ ঘাঁটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ফেনীর জয়নাল হাজারির ক্লাস কমিটির সন্ত্রাস। জনগণ বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করতে পারেনি। এ সময় দেশে দুটি অচিন্তনীয় ঘটনা ঘটে। এগুলো হলো-২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের প্রয়াস। এ ঘটনাগুলো কারা ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে, তা রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। সে রহস্য উন্মোচনের সঠিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এটার সুযোগ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগসহ অন্য বিরোধীরা। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে একটি মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সে অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের অসাংবিধানিক ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’। এ সরকার বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াসহ সামগ্রিকভাবে বিএনপির ওপর চরম নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। খালেদা জিয়ার ২ পুত্রসন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে গ্রেফতার করে চরম দৈহিক নির্যাতন চালানো হয়। তারেক রহমানের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি পঙ্গু হয়ে পড়েন। দুবছরের জরুরি শাসনের পর ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনরা ভারতের সহায়তায় একটি প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। নির্বাচনি প্রহসন এমন সূক্ষ্মভাবে করা হয় যে, জনগণের মধ্যে অনেকেই বুঝতে পারেননি নির্বাচনে কী ভয়াবহ কারচুপি করা হয়েছে। সেবার নির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয়, যা অবিশ্বাস্য। আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য আলাদা ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপার ঠেসে রাখা হয়েছিল। বিএনপি মাত্র ৩০টি আসন পেয়ে সবচেয়ে ক্ষুদ্র বিরোধী দলে পরিণত হয়। সেবার বিএনপির বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী ভয়াবহ চক্রান্ত হয়েছিল।
এরপর আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এ যাত্রায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় জেঁকে বসল। পরপর ৩টি ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় চিরকালের মতো কুক্ষিগত করে রাখার নেশায় মেতে উঠেছিল। সারা দেশে তারা ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। গুম, গুপ্তহত্যা, আয়নাঘরে মানুষকে অঘোষিতভাবে মানবেতর নির্যাতন করে বন্দি রাখা, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লখ লাখ মামলা দায়ের করে চরম হয়রানি করা, বিরোধী দলের মিটিং-মিছিল ভেঙে দেওয়া এবং টেলিফোনে আড়ি পেতে এক ভয়াবহ ভীতির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাধারণ মানুষের মনে এমনভাবে ভয়ের উদ্রেক করা হয়, যাতে মানুষ প্রায় বোবা হয়ে যায়। অন্যদিকে চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে অন্তহীন মিথ্যার বয়ান। সারা দেশে হাজার হাজার মুজিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে জনগণের কোটি কোটি টাকার ট্যাক্সের অর্থ অপব্যয় করা হয়। পাঠ্যপুস্তকে সাজানো কাহিনি পরিবেশন করা হয়। একদিকে সাংস্কৃতিকভাবে মগজ ধোলাই এবং অন্যদিকে ভয়ের শাসন একযোগে ফ্যাসিবাদী শাসন হয়ে ওঠে।
সব রাত্রির অবসান হয় উষার অরুণোদয়ে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান হলো তরুণের বিদ্রোহ ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। শেখ হাসিনা তার প্রভুর দেশ ভারতে পলায়ন করে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও কর্মী ভারতে পালিয়ে যায়। দেশের ভেতরে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক এবং পুলিশবাহিনী পালিয়ে যায়, এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিবও পালিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ কর্মকর্তারা কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যায় ও পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এমন ঘটনা অতীতের কোনো অভ্যুত্থানে ঘটেনি। অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এ সরকারের বেশকিছু সাফল্য যেমন আছে, তেমনই ব্যর্থতাও আছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো, গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এ নির্বাচনকে সফল করার জন্য প্রফেসর ইউনূসের সরকার সামরিক বাহিনীসহ সরকারের সমুদয় শাসনযন্ত্রকে সার্থক ও সাফল্যজনকভাবে ব্যবহার করে। এ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি ১১ দলীয় জোট, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর প্রবল উত্থান ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামী অতীতের নির্বাচনগুলোয় সর্বাধিক ১৮টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু এবার তাদের বহুগুণ উল্লম্ফন ঘটেছে। বহু আসনে তারা বিএনপির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছে। দেশের এ বাস্তবতা বিএনপিকে বুঝতে হবে। বিএনপি যদি এ যাত্রায় বড় ধরনের ভুল করে, তাহলে পরবর্তী সময়ে এর দ্বারা লাভবান হবে জামায়াত। সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার আগে তারেক রহমান জামায়াত নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের বাসভবনে গিয়ে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সৌজন্য প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন শুভ দৃষ্টান্ত। দেশ সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতিতে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে-প্রায় ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। এ রকম অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। তারেক রহমানের এই শুভ উদ্যোগে সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। তাতে ছন্দপতন ঘটল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কর্তৃক মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন। কেন জানি মনে হয়, অজানা আশঙ্কা হাতছানি দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এর আগের দিন ১১ দলীয় জোট নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করেছে। নানাভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে ‘ডিপ স্টেটের’ অদৃশ্য হস্তক্ষেপের নির্বাচনি ফল বিএনপির পক্ষে বদলে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ‘০’ কে ‘৪’ করে দেওয়ার মতো কাণ্ড ঘটিয়ে ভোটের ফল পালটে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য যুক্তি দিয়ে দেখলে এসব অভিযোগ যে অন্তঃসারশূন্য, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক জায়গায় বা একাধিক জায়গায় সংখ্যার পরিবর্তন করতে হলে গ্র্যান্ড টোটালেও পরিবর্তন করতে হয়। এবারের নির্বাচন হয়েছে নির্বাচনি এজেন্টদের শ্যেনদৃষ্টিতে। গণনাও করা হয়েছে একই ধরনের কড়া নজরদারিতে। সতরাং এ কায়দায় কারচুপি অসম্ভব। তবুও কারচুপির অভিযোগ করা হচ্ছে। বলা যায়, নির্বাচনি ফলাফলকে গ্রহণ না করার সংস্কৃতি এবারও বদলায়নি।
জামায়াতে ইসলামীর আরেকটি অভিযোগ, বিএনপি সংসদ-সদস্যদের দ্বিতীয় শপথটি গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। এ শপথটি ছিল সংবিধান সংশোধনীসংক্রান্ত সংসদ গঠনবিষয়ক। আমি যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার কাছে পরিষ্কার নয়, বিএনপি কী কারণে দ্বিতীয় শপথ থেকে দূরে থেকেছে। হতে পারে কোনো সাংবিধানিক যুক্তিতে। কিন্তু জলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক কাজ হয়েছে, যা আওয়ামী লীগ কর্তৃক বরবাদকৃত সংবিধানের সঙ্গে মেলানো কঠিন। হয়তো পরিবর্তনের স্বার্থে মেলানোটাও সংগত নয়। এক্ষেত্রে সব দলের সহমতই সর্বোচ্চ আইন। আমরা দেশে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি হোক দাবি করেছিলাম। এখন দেখছি সামাজিক চুক্তির পথটিও বাধাহীন নয়।
যা হোক, শুরু করেছিলাম এই কথা বলে যে, আমাদের দেশে গণতন্ত্রের পথে বিভিন্ন সময়ের অভিযাত্রা বারবার ব্যাহত হয়েছে। এবার ১৪০০ মানুষের আত্মদান ও হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়া ও পঙ্গুত্ববরণের পর যদি আশাহত হওয়ার মতো ক্ষুদ্রতম কোনো ঘটনা ঘটে, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হবে না। কথায় বলে, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর কিছু ঘটনা সিঁদুরে মেঘ দেখার মতো ভয়জাগানিয়া বলে মনে হয়। হয়তো কেউ এটাকে বলবেন বিভ্রম। তা-ই যেন সত্য হয়।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

