Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

ঈদ জামাতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ জামাতে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ

আজ বৃহস্পতিবার। সপ্তাহের এই দিনটিতে যুগান্তরে আমার যে লেখাটি প্রকাশিত হলো, তার পরদিন অথবা দ্বিতীয় দিন পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে। ঈদুল ফিতর এক মাস রমজানের সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের জন্য আনন্দের দিন হিসাবে আসে। কিন্তু এবারের ঈদ মুসলিম বিশ্বের জন্য সত্যিকার অর্থে আনন্দ বয়ে আনবে না। ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ আগ্রাসন চলছে। আমেরিকা ও ইসরাইলের বোমা হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে, ইরানের প্রথমসারির কয়েক ডজন নেতা নিহত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের নারী-পুরুষ ও শিশুসহ কয়েক হাজার নাগরিক নিহত হয়েছেন।

ইরান এ যুদ্ধ শুরু করেনি। ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যেসব প্রশ্নে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল, সেগুলো নিয়ে যখন কূটনৈতিক পর্যায়ে ওমানে আলোচনা চলছিল, ঠিক তার মাঝখানে ইরান আমেরিকা ও ইসরাইলের বর্বর হামলার শিকার হয়। ইরান এখন সাম্রাজ্যবাদী ও জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। ইরান জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে, তবু মাথা নোয়াবে না। ইরানের এই উন্নত শির অবস্থান নিপীড়িত বিশ্ব মানবতাকে পরম সাহস জুগিয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থার যেসব নিয়মনীতি সব দেশ মেনে নিয়েছিল, আমেরিকা ও ইসরাইল সেসব নিয়মনীতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং একটি তৃতীয় মহাযুদ্ধের দাবানল সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি করেছে। এবারের ঈদুল ফিতরের জামাতের পর বাংলাদেশের মুসলমানরা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাবে আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে। আমেরিকা ও ইসরাইলকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে যারা শাহাদতবরণ করেছেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত ও বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠানের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে বাংলাদেশের সব মুসলিম জনগণ।

ইরানের বিরুদ্ধে যখন আমেরিকা ও ইসরাইলের আগ্রাসন চলছে, তখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বে খনিজ তেলের ভীষণ সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ খনিজ তেল উৎপাদন করে না। বাংলাদেশকে খনিজ তেল আমদানি করতে হয়। একদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ পড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশের মুদ্রার বিনিময় হারেও প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি মারাত্মকভাবে চাঙা হয়ে উঠতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, তেল কোথায় পাওয়া যাবে? আমেরিকান সরকার রুশ তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। ভারত রুশ তেলের অন্যতম আমদানিকারক। ট্রাম্প সরকার ভারতের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে। ভারত সাময়িকভাবে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করতে পারবে। বাংলাদেশ চাইলে হয়তো ভারত থেকে যৎসামান্য পরিমাণ তেল আমদানি করতে পারবে। তবে তেলের পরিমাণ এতই অকিঞ্চিৎকর যে, বাংলাদেশের চাহিদার খুব সামান্য অংশই এভাবে মেটানো সম্ভব। আমেরিকার কাছে ভারত যেরূপ সুবিধা পেয়েছে, সেরূপ সুবিধার জন্য আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ। এখন দেখার বিষয় আমেরিকা বাংলাদেশের আবেদনে কতটুকু সাড়া দেয়।

ট্রাম্পের শুল্কনীতির ওপর মার্কিন সুপ্রিমকোর্টের ‘না’ সূচক রায়ের পর ট্রাম্প সরকার আমেরিকার অন্যান্য আইন ব্যবহার করে আরও কড়াভাবে পালটা শুল্ক আরোপের চিন্তা করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের বৈদেশিক রপ্তানির ওপর তদন্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই তদন্তের লক্ষ হলো রপ্তানিতে কী পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়, পরিবেশগতমান বজায় রাখা হচ্ছে কিনা এবং শ্রম মানরক্ষা করা হচ্ছে কিনা, এসব খতিয়ে দেখা। এগুলো নিয়ে তথ্যানুসন্ধান করলে বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ঝামেলায় পড়ে যাবে। এদিক দিয়ে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। শোনা যাচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের বাজারে আমেরিকা আরোপিত পালটা শুল্ক চালু করতে চাচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশের জন্য এক মহাসর্বনাশ অপেক্ষা করছে। আমাদের সামনের দিনগুলো যে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে, তা সত্যই আশঙ্কা করা যায়।

২.

বাংলাদেশে তারেক রহমানের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহদী আমিন। সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো-ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, ইমাম মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় সেবকদের সম্মানি, ঈদে ত্রাণ ও উপহার বিতরণ, প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে কৃষক কার্ড ও কৃষি ঋণ মওকুফ, দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি, প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর শনিবারেও অফিস করা এবং কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিত বাধ্যতামূলক করা, ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস, বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিতকরণ, এমপিদের বিশেষ সুবিধা বাতিল, অর্থনীতি ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা, বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ (১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া), শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিতকরণ, রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার চালু করা, স্থানীয় উদ্যোগ ও কর্মস্থান বৃদ্ধি (স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, বিসিক এলাকা, হাইটেক পার্ক ও ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস্টারের তালিকা প্রস্তুত করে সেখানে সম্ভাবনাময় ব্যবসা ও স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইকোসিস্টেম তৈরি শুরু), শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে পুনঃভর্তি ফি ও লটারি বাতিল, বিদেশে উচ্চশিক্ষায় সহায়তা, ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ, ক্রীড়া উন্নয়ন ও ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণের ক্ষেত্রে ই-হেলথ কার্ড ও চিকিৎসাকেন্দ্র, ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান; আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, নারীর নিরাপত্তা ও পিংক বাস চালু, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ইফতার সীমিতকরণ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়, অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ ঘোষণা, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ, বিমানবন্দর ও চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ইন্টারনেট চালুর ব্যবস্থা।

এসব কর্মোদ্যোগ উল্লেখ করে ফেসবুক পোস্টে মাহদী আমিন বলেছেন, ‘সরকার গঠনের প্রথম ২৮ দিনে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তারেক রহমানের দৃঢ় নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তার নেতৃত্ব এভাবেই সাধারণ মানুষের আশা ও অনুভূতিকে ধারণ করছে, স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন করছে।’

দেশে যখন একটি নতুন সরকার আসে, তখন তার মেয়াদের প্রথম ১০০ দিনে তার কর্মকাণ্ড গভীর নিরীক্ষণের মধ্যে পড়ে। কথায় বলে, ‘Morning shows the day’. শুরুটা যদি সুষ্ঠু ও ভালোভাবে করা যায়, তাহলে তার ত্বরণক্রিয়ায় পরবর্তী সময়গুলোয় ভালো সাফল্য অর্জন সম্ভবপর হয়। সেজন্য নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কর্মকাণ্ডের ওপর মিডিয়াসহ সবার কড়া নজর থাকে। সরকারের প্রথম ২৮ দিনে যে ২৮টি কর্মসূচির সূচনা করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে নির্বাচনি ওয়াদাগুলো প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আন্তরিক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হবে। প্রশ্ন হলো, এসব কাজের মধ্যে বেশকিছু কাজ রয়েছে যেগুলো সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। এমনিতেই বিগত দিনগুলোতে রাজস্ব আদায়ে বেশকিছুটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি নয়। এই হার তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। ঘাটতি মেটাতে গিয়ে সরকারকে দেশীয় ও বিদেশি সূত্র থেকে ঋণ নিতে হয়। জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সরকার সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা, সুশাসন গড়ে তোলা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তহবিল ঘাটতিতে ভোগে।

একথাও সত্য, এই ২৮টি পদক্ষেপের মধ্যে কিছু পদক্ষেপ রয়েছে, যেগুলো ব্যয় সংকোচনে সহায়তা করবে। ২৮টি কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করতে অবৈধ দোকাপাট উচ্ছেদ সেখানকার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বর্ধিত হারে এলে তাদের ব্যয় করা অর্থ এলাকার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করবে। তবে সারা দেশে ঢালাওভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গেলে দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত বিপর্যয়ের কবলে পড়বে। ফলে অনেকের জীবন-জীবিকা ব্যাহত হবে। সুতরাং এ কাজটি করতে হবে সাবধানতার সঙ্গে এবং বেছে বেছে। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার ঢালাওভাবে এ কাজ করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতির অনেক ক্ষতি করেছিল। ফলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতে সেই সরকারকে এ কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হয়।

কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত ব্যক্তি ও পরিবার এ কর্মসূচির আওতায় আসে। বিত্তশালীরা এ সুযোগ যেন ব্যবহার করতে না পারে। হাসিনা সরকারের আমলে বিত্তশালীরা বহুলভাবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো থেকে ফায়দা অর্জন করেছে। এমনটি কাম্য নয়। সর্বোপরি রাষ্ট্রকে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে অবশ্যই কর-জিডিপি হার আগামী ৫ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ করার চেষ্টা চালাতে হবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম