Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট

এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উসকানিদাতার ভূমিকা পালন করে। ওমান যখন এ দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যস্থতা করছিল, ঠিক তখনই সব আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর মরণঘাতী হামলা শুরু করে। যখন শান্তি আলোচনা চলছিল, তখন বিনা অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের ওপর হামলা গোটা বিশ্বকে হতচকিত করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির ধার ধারে না। মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীসহ ইরানের উচ্চপদস্থ অনেক সামরিক ও বেসামরিক নেতা নিহত হন। সম্প্রতি ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাপ্রধানও নিহত হয়েছেন। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইলেকট্রোনিক্যালি ও হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে ইরানি নেতাদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের নির্মূল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের হত্যা করা সত্ত্বেও ইরানি নেতৃত্ব কাঠামো অকল্পনীয় টিকে থাকার ক্ষমতা সার্থকভাবে প্রদর্শন করেছে। ইরানে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এ যেন ‘জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং জাতীয় মর্যাদা অমলিন রাখতে গিয়ে ইরান যে সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে, তা একদিকে যেমন অতুলনীয়, অন্যদিকে তেমনি অনুসরণীয়। বস্তুত ইরান একাই লড়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান যদি সমঝোতায় না আসে, তাহলে তাকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রস্তুর যুগ ছিল সভ্যতার উন্মেষের সময়। সেসময় মানুষ ছিল গুহাবাসী এবং পশু শিকারের জন্য পাথর ধারালো করে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করাই ছিল তাদের একমাত্র প্রযুক্তি। ট্রাম্প ইরানকে সে অবস্থায় পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন। তবে ৪০ দিন যুদ্ধ চলার পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। কিন্তু ইরান এখানে নতি স্বীকার করেনি। ট্রাম্প ইরানকে দুর্বল ভেবেছিলেন। সেই হিসাব এখন উলটে গেছে। শেষমেশ নিজেই ইরানের ১০ দফা শর্তে সম্মত হয়ে পিছু হটেছেন।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ইরান যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কমান্ডে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর চিফ অফ স্টাফসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অফিসারকে বরখাস্ত করেছেন। তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুগতদের। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে শতসহস্র মার্কিন নাগরিক বিক্ষোভ দেখিয়েছে। কারও কারও মতে, ট্রাম্প সামরিক বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছেন। নিজের ঘর না সামলে তিনি বিভিন্ন পররাজ্য গ্রাসের উন্মত্ততা প্রদর্শন করে চলেছেন। এ উন্মত্ততার অবসান কীভাবে হবে, একমাত্র ভবিতব্যই বলতে পারে। তবে পৃথিবী এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

ইরান যুদ্ধে বাংলাদেশ ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশে একটি নির্বাচিত সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ সরকারকে অর্থনৈতিক ফ্রন্টে ভয়াবহ দুর্যোগ সামলাতে হচ্ছে। কারণ, জ্বালানি সংকট। জ্বালানির জন্য বাংলাদেশ বিদেশি সূত্রের ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল। দেশে গ্যাস উৎপাদন হয়, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কাপ্তাই ড্যামের পাঁচটি ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে ২৩০ মেগাওয়াট। তবে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। দেশীয় গ্যাস ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়ার কয়লা খনির কয়লা ব্যবহার করে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফার্নেস অয়েল ও গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় অনেক সময় বন্ধ থাকে। বন্ধ থাকা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সরকারের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। এর ফলে প্রচুর রাজস্ব ক্ষরণ হয়। ভারতের আদানির প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, যার জন্য চড়া মূল্যে মাশুল দিতে হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের পক্ষে জ্বালনি আমদানি দুরূহ হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো বাংলাদেশে আসতে পারছে না। যদিও ইরান সরকার বাংলাদেশকে অভয় জানিয়ে বলে দিয়েছে, ইরান বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে দেবে। যতদূর জানা গেছে, পাঁচটি জাহাজের মধ্যে একটি জাহাজ আসতে পারছে। ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, ইরান প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানে ইরান কষ্ট পেয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরান বাংলাদেশের প্রতি বৈরী আচরণ করছে না।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে সাত দিনের জ্বালানি মজুত আছে। সরকার আশা করছে, এপ্রিল ও মে-তে আরও কিছু জ্বালানিবাহী জাহাজ বাংলাদেশে এসে পৌঁছতে পারে। যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহ, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যদিও যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দাম কিছুটা কমেছে। বেশি দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হলে বিদেশি মুদ্রা মজুতের ওপর চাপ পড়বে। মুদ্রার বিনিময় হারেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। জ্বালানির দুষ্প্রাপ্যতা ও দুর্মূল্যের ফলে মূল্যস্ফীতি তরতর করে বৃদ্ধি পাবে। অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল বলে সেক্ষেত্রেও বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার ফলে জাতীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়বে। এ কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর অধিকতর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কৃষির জন্য যে পানি সেচ করতে হয়, তাতে পাম্পগুলো চালানোর জন্য ডিজেল ও বিদ্যুৎ উভয় ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। সামগ্রিকভাবে সেচযন্ত্রগুলো শেষ বিচারে জ্বালানির অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই অকেজো হয়ে পড়বে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হবে। কৃষকদের পক্ষে চড়া দামে জ্বালানি ক্রয় করে চাষাবাদ অব্যাহত রাখা অতি কঠিন হয়ে পড়বে। সেক্ষেত্রে জ্বালানির জন্য ভর্তুকি কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকারের কি এমন পরিমাণ রাজস্ব সম্পদ আছে, যা দিয়ে ভর্তুকির খরচ মেটানো সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে সদ্য নির্বাচিত সরকারকে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিবাদ-বিসংবাদ তীব্র হলে সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর ফলে বিরোধী দলগুলো খুব লাভবান হবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। সংকটের আগুন তাদের আবাসকেও জ্বালিয়ে দেবে।

দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি যে সংকটজনক তা বোঝা যায়; দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কেনা হচ্ছে খোলাবাজার থেকে। বাড়ছে ডলারের চাহিদা। কমছে না লোডশেডিং। গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে দ্বিগুণ দামে আনা হচ্ছে এলএনজি। এরপরও গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। একইসঙ্গে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় বাড়ছে লোডশেডিং। দেশে গ্যাসের চাহিদা দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সরবরাহ হচ্ছে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ ৯৫ কোটি ঘনফুট, দেশীয় উৎপাদন ১৭০ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি বিশাল। বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা ১২০ কোটি ঘনফুট। অথচ সরবরাহ করা হচ্ছে ৯১-৯২ কোটি ঘনফুট। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অলস থাকছে ৭ হাজার মেগাওয়াট। এর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে। গ্যাস খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ ৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাড়তি লাগতে পারে আরও ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্যাস খাতে মোট ভর্তুকি দাঁড়াবে ১৮ হাজার কোটি টাকা (সূত্র : প্রথম আলো)।

বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা সংহত করতে প্রয়োজন নতুন নতুন গ্যাসকূপ খনন এবং গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি। এ ছাড়া অব্যবহৃত মাটির নিচে রাখা উন্নতমানের কয়লা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে এ উদ্যোগগুলো কার্যকর করা সম্ভব নয়। তবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এসব উদ্যোগ থেকে ভালো ফল আশা করা যেতে পারে। তবে এখন ভর্তুকির চাহিদা কীভাবে মেটানো সম্ভব, যখন চলতি অর্থবছরে ইতোমধ্যে রাজস্ব সংগ্রহ ঘাটতি ৭০ হাজার কোটি টাকা? ঋণ নিয়েই বা কতটুকু যাওয়া সম্ভব? বিলাস ব্যসন বন্ধ করে কৃচ্ছ্রসাধন করলে সমস্যার সামান্য উপশম আশা করা যায়। তবে তাও নির্ভর করবে এনফোর্স করার ক্ষমতার ওপর। এর জন্যও প্রয়োজন সুশাসন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম