বিএনপি সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
ড. মাহবুব উল্লাহ
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ বিশেষ করে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, এটা পুরোপুরি সাংবিধানিকভাবে হচ্ছে না, আবার সম্পূর্ণভাবে সংবিধানবহির্ভূতভাবেও পরিচালিত হচ্ছে না। এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। অর্থাৎ আমাদের রাষ্ট্রটা এ মুহূর্তে একটা হাইব্রিড অবস্থার মধ্যে আছে। একদিকে সাংবিধানিকতা এবং অন্যদিকে সংবিধানবহির্ভূত একটা অবস্থা। এবং এটার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ৫ আগস্টের পর চব্বিশের অন্তর্বর্তী সরকার গঠন; সে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে ছিল না এবং এখনো নেই। কাজেই এটা সংবিধানবহির্ভূতভাবেই হয়েছে।
কিন্তু এর পেছনে জনগণের ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়েছে। যেটাকে ইংরেজিতে বললে বলব ‘উইল অব দ্য পিপল’ (Will of the people), এটা হয়েছে। অন্যদিকে সাংবিধানিক এজন্য যে, যে রাষ্ট্রপতি আগের সরকারের আমল থেকেই দায়িত্বে ছিলেন, তার কাছেই এ সরকার শপথ গ্রহণ করেছে এবং তাকে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। সরিয়ে দিলে একটা বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হতো। সেই নৈরাজ্য কাটানোর জন্যই তাকে রেখে দিতে হয়েছে সাংবিধানিক কন্টিনিউয়িটি (Constitutional Continuity) বজায় রাখার জন্য। তারপর আবার কিছু কিছু কাজকর্ম হচ্ছে যেগুলো ঠিক সংবিধানের মধ্যে নেই। এই হলো এখনকার অবস্থা।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত হওয়ার পর যে নতুন সরকার এসেছে, সে সরকারের নিঃসন্দেহে যেহেতু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছে, তার পেছনে একটা বিরাট জনসমর্থন আছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এবং জাতীয় সংসদে তাদের যে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা আইন পাশ করতে পারে আবার বাতিলও করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশগুলো রেখে গেছে, সেগুলোকে অব্যাহত রাখতে হলে সংসদের অনুমোদন লাগে। সেখানে বেশকিছু অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে সংসদের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো অব্যাহত আছে। আর কিছু অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হয়নি, তাতে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে গেছে।
এখানে সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন। জুলাই সনদের ভেতরে বিচার বিভাগ, উচ্চতর আদালতের বিচারপতি কীভাবে নিয়োগ হবে এবং বিচার বিভাগকে কীভাবে আলাদা করা হবে সেই বিষয়টা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থা কীভাবে গঠন করা হবে সেই সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাজেই অনেকে শঙ্কা করছেন, বিএনপি হয়তো এসব ব্যাপারে পুরোনো আমলের কায়দাতেই ফেরত যাবে। তবে এখন পর্যন্ত তারা কখনোই বলেনি যে আমরা এগুলো সংস্কার করব না আর এগুলো সংশোধন করব না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এগুলোর জন্য যেভাবে অধ্যাদেশগুলো আছে, সে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ না; তাতে আরও সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন আছে এবং সেটাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তারা একসময় সংসদে উত্থাপন করে পাশ করবে। এটাই মোটামুটি অবস্থা।
কিন্তু বিরোধী দল মনে করছে, বিএনপি তার ঘোষণা থেকে এবং গণভোটের রায় থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। এটা হলো বিরোধী দলের অবস্থান এবং এটাকে তারা অনেক সময় খুব কঠোর শব্দ প্রয়োগ করে সমালোচনা করছে। তারা বলছে, এটা জাতির সঙ্গে প্রতারণা ইত্যাদি। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে এবং এ দূরত্বটা কাম্য ছিল না। এটা শুধু উপস্থাপনার কারণে এবং কথাবার্তার কারণে তৈরি হচ্ছে।
আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, বিএনপি দল হিসাবে সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা সংস্কারের কথা বহুকাল আগে থেকেই বলে আসছে এবং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিচারে এই সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। সেই সংস্কার যেভাবেই পাশ করা হোক না কেন, অধ্যাদেশকে বজায় রেখেই হোক অথবা সংশোধন করেই হোক।
কাজেই আমি আশা করব, আগামী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে এই জিনিসগুলোর একটা ফয়সালা হয়ে যাবে এবং এজন্য সংসদ থেকে রাজপথে আসার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি যে জটিল হয়ে উঠছে, সেটার একটা বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র রাজু ভাস্কর্যে গত ৫০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় অনশন করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাদের কাছে দেখা করেছেন, কিন্তু তারা অনশন ভাঙছেন না। এর মানে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
এটা একটা জাতীয় রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। এ সমস্যাকে রাজনৈতিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যেসব ভুল বোঝাবুঝি, একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা আছে, সেটা দূর করা দরকার এবং এখানে একটা রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
