বাইফোকাল লেন্স
মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায়ের বাস্তবায়ন কত দূর
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহুল আলোচিত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় হয়েছে গত বছরের নভেম্বরে। পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণার পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এ চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আর কিছু জানা যায়নি। বিচারপতি মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও বিচারপতি মোহাম্মদ সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতের রায়ই বহাল রেখেছেন। এ বর্বর হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার বিচার শেষে ২০২২ সালে ৩১ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত পুলিশের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও পরিদর্শক মো. লিয়াকত আলীর মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। সে সময় বিচারিক আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, টেকনাফে থানার বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলী মেজর সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে উপর্যুপরি গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে মেজর সিনহাকে দেরিতে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এছাড়াও ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ও হত্যার আলামত ধ্বংস করতে তিনি সিনহা ও তার সঙ্গী সিফাতের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে লিয়াকত শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। প্রদীপের শাস্তির কারণ জানাতে গিয়ে আদালত জানান, মেজর সিনহাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপরাপর আসামিদের সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অপর আসামিদের সহায়তায় সিনহাকে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, বুকে লাথি মেরে সিনহার পাঁজরের হাড় ভেঙে দেয় এবং গলার বাম পাশে নিজের পা দিয়ে সজোরে চেপে মৃত্যু নিশ্চিত করে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজার কারণ হিসাবে আদালত বলেন, সিনহা হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা, হত্যার ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য সিনহার গাড়িতে ইয়াবা, গাঁজা উদ্ধার নাটক এবং সিনহাকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা ও তার সঙ্গীকে মারধর করা ইত্যাদি।
মেজর সিনহার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বর্বরোচিত ঘটনা। বিশেষ করে প্রদীপের আচরণ ছিল অবর্ণনীয়। সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের অসদাচরণের ঘটনা এটাই প্রথম ছিল না। সিনহা হত্যাকাণ্ডের আগেও সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অনেক ঘটনাই ঘটিয়েছে। পুলিশ সদস্যদের এমন অসৌজন্যমূলক আচরণ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। ওই বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর কিছু বাছাইকৃত পুলিশ কর্মকর্তাকে রাজধানী ঢাকায় বদলি করে আনা হয়। এসব কর্মকর্তা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ১৯৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের পরপর মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশনের মতো সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) ওবায়দুর রহমান দুজন ট্রাফিক সার্জেন্টের সহায়তায় সেনাবাহিনীর
একজন ক্যাপ্টেন পদবির কর্মকর্তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে শাহবাগের মোড়ে রাস্তার ধারে লোহার রেলিংয়ের সঙ্গে জনসম্মুখে আটক করে রেখেছিল। প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো এভাবে আটক রাখার পর সেই কর্মকর্তাকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সংবাদ বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা সেনানিবাসের বিভিন্ন অফিসার মেসে তরুণ সেনা কর্মকর্তারা প্রচণ্ড ক্ষোভে খেপে ওঠে। তরুণ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় রমনা থানা ঘেরাও করে ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’র মাধ্যমে ক্যাপ্টেন গিয়াসকে সেনানিবাসে ফিরিয়ে আনবে। সে মোতাবেক প্রস্তুতি নিতে থাকলে; এ সংবাদ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমানের কাছে পৌঁছে যায়। সেনাপ্রধান দ্রুত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের অফিসার মেসগুলোয় পাঠিয়ে তরুণ কর্মকর্তাদের শান্ত করেন। পরবর্তী সময় আর্মি মিলিটারি ইউনিটের সদস্যরা রমনা থানায় গিয়ে ক্যাপ্টেন গিয়াসকে সেনানিবাসে ফিরিয়ে আনে।
মেজর সিনহা হত্যা মামলা প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। এ কথা সত্য, মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ড অতীতের সব ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। মেজর সিনহা ছিলেন একজন তরুণ চৌকশ সেনা কর্মকর্তা। সিনহার এমন নির্মম মৃত্যুতে শুধু অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের ভেতর তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়নি; কর্মরত সেনা কর্মকর্তারাও মর্মাহত হয়েছিলেন। এ ঘটনায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারদের সংগঠন ‘রাওয়া’ (RAOWA) বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ সম্মিলিত প্রচেষ্টা সরকারের ওপর তখন একধরনের চাপ সৃষ্টি করেছিল। মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায় হয়ে গেলেও একটি ঘটনা অনেকের কাছে এখনো কৌতূহল হয়ে রয়ে গেছে। ঘটনাটি হলো, সিনহা হত্যাকাণ্ডের পরপর লিয়াকত কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদকে ফোন করলে মাসুদ এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থেকে বাঁচার জন্য লিয়াকতকে মিথ্যা কথা শিখিয়ে দিলেও তার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় লিয়াকত ও পুলিশ সুপার মাসুদের টেলিফোনের আলাপচারিতার যে রেকর্ড প্রচার করা হয়েছিল, তাতেও স্পষ্ট শোনা গেছে, লিয়াকত মাসুদকে বলছেন, ‘একজন মেজর পরিচয় দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাইতে চাইছিল। পরে অস্ত্র তাক করছিল আমি গুলি করছি স্যার। একজনকে ডাউন করছি; আরেকজন ধরে ফেলছি স্যার। আমি কী করব স্যার? আমাকে পিস্তল তাক করছে, পিস্তল পাইছি তো স্যার!’ এখানে সিনহা গুলি করেছে এমন কথা একবারও বলেনি। অথচ উত্তরে মাসুদ লিয়াকতকে বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তোমারে গুলি করছে, তোমার গায়ে লাগেনি। তুমি যেটা করছ সেটা গায়ে লাগছে।’ এ বলে মাসুদ লিয়াকতকে কী বলতে হবে শিখিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, হত্যাকাণ্ডের পরদিন মাসুদ মেজর সিনহার গাড়িতে ইয়াবা ও মাদকদ্রব্য পাওয়া গেছে বলে গণমাধ্যমকেও জানান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এমন গর্হিত কাজ করার পরও মাসুদকে হত্যা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো না কেন, সে প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। মেজর সিনহার বোন হত্যা মামলায় মাসুদকে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করলেও কক্সবাজারের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আবেদনটি নামঞ্জুর করে দেন। সিনহা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১৫-এর তৎকালীন সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. খাইরুল ইসলাম তদন্ত রিপোর্টে মাসুদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আজও কেউ বলতে পারে না। গত বছরের জুনে উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার পরও মাসুদকে কেন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। একসময় আমার অধীনে চাকরি করেছেন, এমন একজন সেনা কর্মকর্তা সিনহা হত্যা মামলার তদন্তকালে র্যাবের কর্মরত ছিলেন; তার কাছ থেকে জেনেছি, মাসুদের নাম মামলা থেকে বাদ না দিলে চার্জশিট দেওয়া হবে না বলে তখন পুলিশের তরফ থেকে হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকারের উঁচু মহলের নির্দেশে মামলার আসামি থেকে মাসুদের নাম বাদ দিতে হয়েছিল। উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার পর বাদীপক্ষের আইনজীবীও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এ তথ্যটি প্রকাশ করেন।
উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণা হয়েছে দশ মাস হতে চলল। এরই মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায়ও বেরিয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই আলোচিত মামলার রায়ের কার্যক্রম কতটুকু এগিয়েছে, অনেকেরই তা জানার আগ্রহ জন্মাবে। বিশেষ করে মেজর সিনহার আত্মীয়দের মাঝে তো বটেই।। উচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই মেজর সিনহার আত্মীয়রা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বাদবাকি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে রায় কার্যকর করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। চাকরিরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারাও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। মামলার অগ্রগতি জানার জন্য অতিসম্প্রতি রাওয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকালে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর গত নভেম্বরেই মামলাটি আপিল বিভাগের রিভিউয়ের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় রিভিউ কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন। অবকাশকালীন ছুটির কারণে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত আদালত বন্ধ থাকবে বলে এর মধ্যে মামলাটি চেম্বার জজ আদালতে উপস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান। আমরাও আশা করি, বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। সরকার চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় কার্যকরের মাধ্যমে এমন এক উদাহরণ স্থাপন করবে; যেন ভবিষ্যতে প্রদীপের মতো বর্বর চরিত্রের কোনো ব্যক্তি প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে এমন নৃশংস কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার সাহস না করে।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক
