কফি বিনস্ ও এর বিচিত্র ইতিহাস
jugantor
কফি বিনস্ ও এর বিচিত্র ইতিহাস

  ড. আসমা অন্বেষা  

১৭ জুন ২০২১, ০১:০৭:২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

হল্যান্ডে গিয়েছিলাম একটি ট্রেনিংয়ের কাজে। তরুণ বয়স তখন এবং সেই প্রথম বিদেশ যাওয়া। এত সাজানো-গোছানো একটি দেশ। ফুলসহ ওদেশের অনেক কিছুই ভালো লাগত। আর ভালো লাগত ওদের কফি। কাজ করতাম একটি রিসার্চ অর্গানাইজেশনে। রোজ ওদের কফিবারের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কফির মনমাতানো ঘ্রাণ টানত খুব। এক কাপ কফি নিয়ে বসতাম ব্রেকের সময়। ফিল্টারে রোস্টেড বিন থেকে কফি তৈরি করার স্বাদ এবং ঘ্রাণ অসাধারণ মনে হয়, যা ঘরে বানানো ইন্সট্যান্ট কফিতে পাওয়া যায় না। আমার বিশ্বাস, আমার মতো আরও অনেককেই কফির মনমাতানো ঘ্রাণ আকৃষ্ট করে। বিশ্বজুড়ে তরুণ থেকে বৃদ্ধ অনেকেরই আকাক্সিক্ষত কোমল পানীয় এ কফি।

বিশ্বে সর্বপ্রথম রোস্টেড কফি বিনস্ আসে আরব স্কলারদের কাছ থেকে। লিখিত ডকুমেন্ট থেকে এমনই জানা যায়। তাদের লেখায় আরও জানা যায়, এটি তাদের কাছে খুব আদরের একটি জিনিস ছিল; কারণ কফির ক্যাফেইন তাদের কাজের সময়কে দীর্ঘায়িত করতে সাহায্য করত। ইয়েমেনে প্রথম রোস্টেড বিন থেকে কফি ড্রিংক তৈরি করা হয়। পরে এটি টার্কিশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারপর ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আবিসিনিয়া থেকে কফিগাছ ইয়েমেনে আনা হয় এবং ইয়েমেনি ট্রাডিশনের ওপর ভিত্তি করে কফিগাছ এবং কাথা এডুলিসগাছ একসঙ্গে লাগানো হয় সেখানে।

কফি পৃথিবীর খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারিত ব্যবসায়িক কমোডিটি যা আমদানি এবং রপ্তানি হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে; যেমন মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকাতে। কফিগাছের আদিবাস ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা এবং ইথিওপিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমের উঁচু ভূমি। কফিয়া এরাবিকা এখন ইথিওপিয়াতে দুর্লভ বস্তু। এদের আদি বাসস্থান থেকে এরা ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং ক্যারিবিয়ান ও প্যাসিফিকের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে যে কফি তার প্রথম বর্ণনা দেন ফ্রেঞ্চ প্রকৃতিবিদ Antoine de Juss। তিনি প্রথম এর নামকরণ করেছিলেন Jasminum arabicum। তারপর এ স্পেসিমেন নিয়ে আমস্টারডামের বোটানিক্যাল গার্ডেনে অনেক গবেষণা করা হয় এবং কার্ল লিন্নিয়াস ১৭৩৭ সালে একে নতুন জেনাস ঈড়ভভবধ তে স্থান দেন এবং নাম দেন কফিয়া এরাবিকা (Coffea arabica)। Rubiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এ কফিগাছ। কফিয়া এরাবিকাকে এরাবিয়ান কফি বা মাউনটেইন কফি বা এরাবিকা কফি বলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এটাই কফির প্রথম প্রজাতি যেটা ব্যাপক হারে চাষ করা হয় সারা বিশ্বে। পৃথিবীর ৬০ শতাংশ কফি তৈরি হয় এ প্রজাতি থেকে। কফিয়া এরাবিকা, Coffea জেনাসে একমাত্র পলিপ্লয়েড প্রজাতি। সাধারণ কফি গাছে ২ সেট অর্থাৎ ২২টি ক্রোমোজোম থাকে। কফিয়া এরাবিকাতে আছে ৪ সেট ক্রোমোসোম অর্থাৎ সর্বমোট ৪৪টি ক্রোমোজোম। কফিয়া এরাবিকা একটি সঙ্কর গাছ। দুটি ডিপ্লয়েড কফি গাছ Coffea canephora এবং Coffea eugenioides-এর সংকরায়ণের মাধ্যমে হাইব্রিড বা সঙ্কর কফিয়া এরাবিকা গাছ পাওয়া যায়। কফিয়া এরাবিকা চিরসবুজ এবং বহুবর্ষজীবী গাছ। কফিগাছ লাগানোর দুই থেকে চার বছরের মধ্যে ছোট্ট সাদা তীব্র ঘ্রাণযুক্ত ফুল হয়। এদের মিষ্টি ঘ্রাণ অনেকটা বেলি ফুলের ঘ্রাণের মতো। সূর্য উজ্জ্বল একটি দিনে যে ফুল ফোটে তাতে অনেক বেশি কফি বিন তৈরি হয়। গাছে বেশি কফি বিনস্ একসঙ্গে হলে বিনের মান খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই কারণেই বেশি ফুল হওয়া এড়ানোর জন্য গাছকে প্র“ন করা হয় নিয়মিত। ফুল ফোটা খুব কম সময়ের জন্য স্থায়ী হয়, এর সময়কাল মাত্র কয়েকদিন। এরপরই বেরি বা ফল হতে শুরু করে। পাতার মতোই গাঢ় সবুজ রঙের ফল হয়ে থাকে। এরা পরিপক্ব হওয়ার সময় হলে প্রথমে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং এরপর হালকা লাল রঙের হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে গাঢ় লাল রং ধারণ করে এবং চকচকে হয়ে যায়। এ সময় এ ফল দেখতে অনেকটা চেরি ফলের মতো হয় বলে এদের চেরি নামেও ডাকা হয়। এ সময় কফি বেরি সংগ্রহ করতে পারলে বেশ উন্নত মানের কফি পাওয়া যায়।

কফিগাছ ৯ থেকে ১২ মিটার উচ্চতার হতে পারে। বেশ ডালপালা হয়। পাতাগুলো হয় ওভেট থেকে ডিম্বাকৃতির। ৬-১২ সেমি লম্বা এবং ৪-৮ সেমি চওড়া। চকচকে গাঢ় সবুজ রঙের পাতা। বেরিগুলো ডিমের মতো আকৃতির হয় এবং ১ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। বেশি আগে বা বেশি পরে বেরি পিকিং বা সংগ্রহ করলে কফির মান নেমে যায়। এগুলো একসঙ্গে পাকে না। মাঝে মাঝে কৃষক গাছ ধরে ঝাঁকি দেয় কাজ সহজ করার জন্য এবং কাঁচা ও পাকা দুই ধরনের বেরিই মাটিতে পড়ে এবং কাঁচা-পাকা দুই ধরনের বেরিই সংগ্রহ করা হয়। ফলে কফির মান ভালো হয় না। প্রতিটি কফি গাছ ০.৫ থেকে ৫.০ কিলো শুকনো কফি বিন তৈরি করতে পারে। এটি নির্ভর করে কফির জাতের ওপর এবং আবহাওয়া ও সিজনের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কফি বিন। প্রতিটি বেরির থাকে দুটি লকিউল বা চেম্বার, যা কফি বিনকে ধারণ করে। সাধারণত একটি বেরির মধ্যে দুটি বিন থাকে। তবে এর পরিবর্তনও হতে দেখা যায়। কোনো কোনো বেরিতে তিনটি বিন থাকে, আবার কোনোটির মধ্যে একটিই বিন হতে দেখা যায়। এ বিন বা বীজগুলো দুটো মেমব্রেন দিয়ে ঢাকা থাকে। বাইরের খোসা বা আবরণকে বলা হয় parchment coat এবং ভেতরের লেয়ারকে বলা হয় silver skin।

পুরোপুরি ম্যাচিউর হতে কফিগাছের সাত বছর সময় লাগে। এই গাছ ভালো বৃদ্ধি পেতে পারে ৪০ থেকে ৫৯ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হলে, যা সারা বছর ধরে একইভাবে হয়। কফিগাছ সাধারণত চাষ করা হয় ১,৩০০ এবং ১,৫০০ মিটার উচ্চতায়। সর্বোচ্চ উচ্চতা ২,৮০০ মিটারেও এ গাছ বেড়ে উঠতে পারে; কিন্তু সাগরের উচ্চতায় অর্থাৎ sea level-এ কফিগাছ জন্মানোর উদাহরণও আছে। কফিগাছ নিচু তাপমাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু বরফে কখনো নয়। এরা গড় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সবচেয়ে ভালো বৃদ্ধি পেতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে যেসব কফির চাষ করা হয়, সেগুলো ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এগুলো নিয়মিতভাবে ছেঁটে বা ট্রিম করে ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা করে রাখা হয় কফির ফল সংগ্রহের সুবিধার জন্য। হালকা ছায়াতে এ গাছ ভালো জš§াতে পারে। এ গাছগুলো এসিডিক মাটিতে এবং কম তাপমাত্রায় লাগালে অনেক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পোকামাকড়ের আক্রমণেও এ প্রজাতি অনেকটা দুর্বল হয়, Coffee robusta গাছের চেয়ে। জাভা দ্বীপে সারা বছর ধরেই কফিগাছ লাগানো হয় এবং সারা বছর ধরেই কফি বিন সংগ্রহ করা হয়। ব্রাজিলের একটি অংশে কফিগাছ লাগানোর একটি সুনির্দিষ্ট সময় থাকে এবং বেরি সংগ্রহ করা হয় কেবল শীতকালে।

ইন্দোনেশিয়াতে কফিয়া এরাবিকাকে নিয়ে বেশ মজার একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। এ কফি ইন্দোনেশিয়াতে কফি লুওয়াক বা Luwak Coffee বা Cat Poop Coffee নামে পরিচিত ছিল এক সময়। এটি কোনো ভ্যারাইটির নাম নয়, যে প্রসেসে কফি বিনস্ প্রস্তুত হয়, তার ওপর নির্ভর করে এ নাম হয়েছে। এটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দামি এবং দুষ্প্রাপ্য কফি। রিটেইল প্রাইসে এক কিলো কফির দাম ৫৫০ ইউরো বা ৭০০ মার্কিন ডলার। প্রতি কাপের মূল্য ৩৫ থেকে ৮০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৫০০ টাকা। এ কফি এক সময় চাষ হতো ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা, জাভা, বালি এবং সুলাওয়েশি দ্বীপে। ফিলিপাইনের কিছু দ্বীপের কিছু ফার্মে ও জঙ্গলে এ কফির চাষ হতো এক সময়, যেখানে এ প্রোডাক্টকে বলা হতো kape motit।
এক সময় ইন্দোনেশিয়া ডাচদের কলোনি ছিল। ১৭০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইন্দোনেশীয় কৃষক ডাচদের কফি বাগানে কাজ করতেন। তাদের উৎপাদিত সব কফি ওই সময় সরাসরি ইউরোপে চলে যেত। ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় বাজারে পাওয়া যেত না কোনোভাবেই। কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল এ কফি বিনস্ ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বিক্রি করার ব্যাপারে। ইচ্ছা থাকলেও তাদের নিজেদের উৎপাদন করা কফি খেতে পারতেন না কৃষক। বিড়াল জাতীয় এক ধরনের প্রাণী, যার নাম Civet Cat, এ কফি বিনস্ খেতে খুব পছন্দ করত। খাওয়ার পর তাদের মলের সঙ্গে আস্ত কফি বিনস্ বের হয়ে আসত। ইন্দোনেশীয় কৃষক কফি বিনস্ পরিষ্কার করে এবং গুঁড়া করে খেতে শুরু করলেন। এ কফি তাদের কাছে খুব ভালো লাগতে শুরু করল। তারা মরিয়া হয়ে এসব Civet Catকে বেশি করে কফি বিন খাওয়াতে শুরু করলেন এবং পরবর্তী সময়ে এদের মলত্যাগের পর তারা এ কফি বিনস্ সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। Civet Cat-এর পাকস্থলীতে শুধু কফি বিনের ওপরের খোসা বা Pericarp হজম হয়ে যেত এবং বাকিটা বিষ্ঠা বা মলের সঙ্গে শক্ত বিন হয়ে বের হয়ে আসত।
কফি বিনস্ বিড়ালের পেটে যাওয়ার পর ফারমেন্টেশন হয় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। বিড়ালের পাকস্থলীর মধ্যেকার এনজাইম কফি বিনের সঙ্গে মিশে যায় এবং এমাইনো এসিডের প্রাচুর্য দেখা যায়। ফলে অসাধারণ সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু কফি পাওয়া যায় তা থেকে। ব্যাপারটা ডাচ কর্মকর্তাদের কানে এলো। তারা সিদ্ধান্ত নিল এ Civet Catকে মেরে ফেলার।

কিন্তু এদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তারা সুবিধে করতে পারলেন না। কৌতূহলী হয়ে ডাচরা কৃষকের মতো করে কফি বানিয়ে খেতে শুরু করলেন। তারা বেশ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন, এ কফি সাধারণ কফি থেকে অনেক বেশি সুস্বাদু এবং তাদের ঘ্রাণও অনেক বেশি উন্নত মানের। ফলে ডাচদের কাছে Civet Cat-এর খাওয়া কফির কদর বাড়তে লাগল। এ অদ্ভুত উপায়ে কফি তৈরির উদ্ভাবক হয়েও ইন্দোনেশীয় কৃষক বঞ্চিতই থেকে গেলেন কফি খাওয়া থেকে। মাঝখান থেকে এটি হয়ে গেল বিশ্বের সেরা কফি। ধারণা করা হয়, শুধু স্বাদ ও গন্ধের জন্য নয়, এর অনন্য এ গল্পটির কারণেও বিখ্যাত হয়েছে এ কফি সমগ্র পৃথিবীতে।

ড. আসমা অন্বেষা : কানাডার টরন্টো প্রবাসী

কফি বিনস্ ও এর বিচিত্র ইতিহাস

 ড. আসমা অন্বেষা 
১৭ জুন ২০২১, ০১:০৭ এএম  |  অনলাইন সংস্করণ

হল্যান্ডে গিয়েছিলাম একটি ট্রেনিংয়ের কাজে। তরুণ বয়স তখন এবং সেই প্রথম বিদেশ যাওয়া। এত সাজানো-গোছানো একটি দেশ। ফুলসহ ওদেশের অনেক কিছুই ভালো লাগত। আর ভালো লাগত ওদের কফি। কাজ করতাম একটি রিসার্চ অর্গানাইজেশনে। রোজ ওদের কফিবারের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কফির মনমাতানো ঘ্রাণ টানত খুব। এক কাপ কফি নিয়ে বসতাম ব্রেকের সময়। ফিল্টারে রোস্টেড বিন থেকে কফি তৈরি করার স্বাদ এবং ঘ্রাণ অসাধারণ মনে হয়, যা ঘরে বানানো ইন্সট্যান্ট কফিতে পাওয়া যায় না। আমার বিশ্বাস, আমার মতো আরও অনেককেই কফির মনমাতানো ঘ্রাণ আকৃষ্ট করে। বিশ্বজুড়ে তরুণ থেকে বৃদ্ধ অনেকেরই আকাক্সিক্ষত কোমল পানীয় এ কফি। 

বিশ্বে সর্বপ্রথম রোস্টেড কফি বিনস্ আসে আরব স্কলারদের কাছ থেকে। লিখিত ডকুমেন্ট থেকে এমনই জানা যায়। তাদের লেখায় আরও জানা যায়, এটি তাদের কাছে খুব আদরের একটি জিনিস ছিল; কারণ কফির ক্যাফেইন তাদের কাজের সময়কে দীর্ঘায়িত করতে সাহায্য করত। ইয়েমেনে প্রথম রোস্টেড বিন থেকে কফি ড্রিংক তৈরি করা হয়। পরে এটি টার্কিশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারপর ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আবিসিনিয়া থেকে কফিগাছ ইয়েমেনে আনা হয় এবং ইয়েমেনি ট্রাডিশনের ওপর ভিত্তি করে কফিগাছ এবং কাথা এডুলিসগাছ একসঙ্গে লাগানো হয় সেখানে।

কফি পৃথিবীর খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারিত ব্যবসায়িক কমোডিটি যা আমদানি এবং রপ্তানি হয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে; যেমন মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং আফ্রিকাতে। কফিগাছের আদিবাস ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা এবং ইথিওপিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমের উঁচু ভূমি। কফিয়া এরাবিকা এখন ইথিওপিয়াতে দুর্লভ বস্তু। এদের আদি বাসস্থান থেকে এরা ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং ক্যারিবিয়ান ও প্যাসিফিকের বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে যে কফি তার প্রথম বর্ণনা দেন ফ্রেঞ্চ প্রকৃতিবিদ Antoine de Juss। তিনি প্রথম এর নামকরণ করেছিলেন Jasminum arabicum। তারপর এ স্পেসিমেন নিয়ে আমস্টারডামের বোটানিক্যাল গার্ডেনে অনেক গবেষণা করা হয় এবং কার্ল লিন্নিয়াস ১৭৩৭ সালে একে নতুন জেনাস ঈড়ভভবধ তে স্থান দেন এবং নাম দেন কফিয়া এরাবিকা (Coffea arabica)। Rubiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এ কফিগাছ। কফিয়া এরাবিকাকে এরাবিয়ান কফি বা মাউনটেইন কফি বা এরাবিকা কফি বলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এটাই কফির প্রথম প্রজাতি যেটা ব্যাপক হারে চাষ করা হয় সারা বিশ্বে। পৃথিবীর ৬০ শতাংশ কফি তৈরি হয় এ প্রজাতি থেকে। কফিয়া এরাবিকা, Coffea জেনাসে একমাত্র পলিপ্লয়েড প্রজাতি। সাধারণ কফি গাছে ২ সেট অর্থাৎ ২২টি ক্রোমোজোম থাকে। কফিয়া এরাবিকাতে আছে ৪ সেট ক্রোমোসোম অর্থাৎ সর্বমোট ৪৪টি ক্রোমোজোম। কফিয়া এরাবিকা একটি সঙ্কর গাছ। দুটি ডিপ্লয়েড কফি গাছ Coffea canephora এবং Coffea eugenioides-এর সংকরায়ণের মাধ্যমে হাইব্রিড বা সঙ্কর কফিয়া এরাবিকা গাছ পাওয়া যায়। কফিয়া এরাবিকা চিরসবুজ এবং বহুবর্ষজীবী গাছ। কফিগাছ লাগানোর দুই থেকে চার বছরের মধ্যে ছোট্ট সাদা তীব্র ঘ্রাণযুক্ত ফুল হয়। এদের মিষ্টি ঘ্রাণ অনেকটা বেলি ফুলের ঘ্রাণের মতো। সূর্য উজ্জ্বল একটি দিনে যে ফুল ফোটে তাতে অনেক বেশি কফি বিন তৈরি হয়। গাছে বেশি কফি বিনস্ একসঙ্গে হলে বিনের মান খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই কারণেই বেশি ফুল হওয়া এড়ানোর জন্য গাছকে প্র“ন করা হয় নিয়মিত। ফুল ফোটা খুব কম সময়ের জন্য স্থায়ী হয়, এর সময়কাল মাত্র কয়েকদিন। এরপরই বেরি বা ফল হতে শুরু করে। পাতার মতোই গাঢ় সবুজ রঙের ফল হয়ে থাকে। এরা পরিপক্ব হওয়ার সময় হলে প্রথমে হলুদ বর্ণ ধারণ করে এবং এরপর হালকা লাল রঙের হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে গাঢ় লাল রং ধারণ করে এবং চকচকে হয়ে যায়। এ সময় এ ফল দেখতে অনেকটা চেরি ফলের মতো হয় বলে এদের চেরি নামেও ডাকা হয়। এ সময় কফি বেরি সংগ্রহ করতে পারলে বেশ উন্নত মানের কফি পাওয়া যায়। 

কফিগাছ ৯ থেকে ১২ মিটার উচ্চতার হতে পারে। বেশ ডালপালা হয়। পাতাগুলো হয় ওভেট থেকে ডিম্বাকৃতির। ৬-১২ সেমি লম্বা এবং ৪-৮ সেমি চওড়া। চকচকে গাঢ় সবুজ রঙের পাতা। বেরিগুলো ডিমের মতো আকৃতির হয় এবং ১ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়। বেশি আগে বা বেশি পরে বেরি পিকিং বা সংগ্রহ করলে কফির মান নেমে যায়। এগুলো একসঙ্গে পাকে না। মাঝে মাঝে কৃষক গাছ ধরে ঝাঁকি দেয় কাজ সহজ করার জন্য এবং কাঁচা ও পাকা দুই ধরনের বেরিই মাটিতে পড়ে এবং কাঁচা-পাকা দুই ধরনের বেরিই সংগ্রহ করা হয়। ফলে কফির মান ভালো হয় না। প্রতিটি কফি গাছ ০.৫ থেকে ৫.০ কিলো শুকনো কফি বিন তৈরি করতে পারে। এটি নির্ভর করে কফির জাতের ওপর এবং আবহাওয়া ও সিজনের ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কফি বিন। প্রতিটি বেরির থাকে দুটি লকিউল বা চেম্বার, যা কফি বিনকে ধারণ করে। সাধারণত একটি বেরির মধ্যে দুটি বিন থাকে। তবে এর পরিবর্তনও হতে দেখা যায়। কোনো কোনো বেরিতে তিনটি বিন থাকে, আবার কোনোটির মধ্যে একটিই বিন হতে দেখা যায়। এ বিন বা বীজগুলো দুটো মেমব্রেন দিয়ে ঢাকা থাকে। বাইরের খোসা বা আবরণকে বলা হয় parchment coat এবং ভেতরের লেয়ারকে বলা হয় silver skin। 

পুরোপুরি ম্যাচিউর হতে কফিগাছের সাত বছর সময় লাগে। এই গাছ ভালো বৃদ্ধি পেতে পারে ৪০ থেকে ৫৯ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হলে, যা সারা বছর ধরে একইভাবে হয়। কফিগাছ সাধারণত চাষ করা হয় ১,৩০০ এবং ১,৫০০ মিটার উচ্চতায়। সর্বোচ্চ উচ্চতা ২,৮০০ মিটারেও এ গাছ বেড়ে উঠতে পারে; কিন্তু সাগরের উচ্চতায় অর্থাৎ sea level-এ কফিগাছ জন্মানোর উদাহরণও আছে। কফিগাছ নিচু তাপমাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু বরফে কখনো নয়। এরা গড় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে সবচেয়ে ভালো বৃদ্ধি পেতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে যেসব কফির চাষ করা হয়, সেগুলো ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এগুলো নিয়মিতভাবে ছেঁটে বা ট্রিম করে ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা করে রাখা হয় কফির ফল সংগ্রহের সুবিধার জন্য। হালকা ছায়াতে এ গাছ ভালো জš§াতে পারে। এ গাছগুলো এসিডিক মাটিতে এবং কম তাপমাত্রায় লাগালে অনেক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পোকামাকড়ের আক্রমণেও এ প্রজাতি অনেকটা দুর্বল হয়, Coffee robusta গাছের চেয়ে। জাভা দ্বীপে সারা বছর ধরেই কফিগাছ লাগানো হয় এবং সারা বছর ধরেই কফি বিন সংগ্রহ করা হয়। ব্রাজিলের একটি অংশে কফিগাছ লাগানোর একটি সুনির্দিষ্ট সময় থাকে এবং বেরি সংগ্রহ করা হয় কেবল শীতকালে।

ইন্দোনেশিয়াতে কফিয়া এরাবিকাকে নিয়ে বেশ মজার একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। এ কফি ইন্দোনেশিয়াতে কফি লুওয়াক বা Luwak Coffee বা Cat Poop Coffee নামে পরিচিত ছিল এক সময়। এটি কোনো ভ্যারাইটির নাম নয়, যে প্রসেসে কফি বিনস্ প্রস্তুত হয়, তার ওপর নির্ভর করে এ নাম হয়েছে। এটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দামি এবং দুষ্প্রাপ্য কফি। রিটেইল প্রাইসে এক কিলো কফির দাম ৫৫০ ইউরো বা ৭০০ মার্কিন ডলার। প্রতি কাপের মূল্য ৩৫ থেকে ৮০ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৫০০ টাকা। এ কফি এক সময় চাষ হতো ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা, জাভা, বালি এবং সুলাওয়েশি দ্বীপে। ফিলিপাইনের কিছু দ্বীপের কিছু ফার্মে ও জঙ্গলে এ কফির চাষ হতো এক সময়, যেখানে এ প্রোডাক্টকে বলা হতো kape motit।
এক সময় ইন্দোনেশিয়া ডাচদের কলোনি ছিল। ১৭০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইন্দোনেশীয় কৃষক ডাচদের কফি বাগানে কাজ করতেন। তাদের উৎপাদিত সব কফি ওই সময় সরাসরি ইউরোপে চলে যেত। ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় বাজারে পাওয়া যেত না কোনোভাবেই। কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল এ কফি বিনস্ ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বিক্রি করার ব্যাপারে। ইচ্ছা থাকলেও তাদের নিজেদের উৎপাদন করা কফি খেতে পারতেন না কৃষক। বিড়াল জাতীয় এক ধরনের প্রাণী, যার নাম Civet Cat, এ কফি বিনস্ খেতে খুব পছন্দ করত। খাওয়ার পর তাদের মলের সঙ্গে আস্ত কফি বিনস্ বের হয়ে আসত। ইন্দোনেশীয় কৃষক কফি বিনস্ পরিষ্কার করে এবং গুঁড়া করে খেতে শুরু করলেন। এ কফি তাদের কাছে খুব ভালো লাগতে শুরু করল। তারা মরিয়া হয়ে এসব Civet Catকে বেশি করে কফি বিন খাওয়াতে শুরু করলেন এবং পরবর্তী সময়ে এদের মলত্যাগের পর তারা এ কফি বিনস্ সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। Civet Cat-এর পাকস্থলীতে শুধু কফি বিনের ওপরের খোসা বা Pericarp হজম হয়ে যেত এবং বাকিটা বিষ্ঠা বা মলের সঙ্গে শক্ত বিন হয়ে বের হয়ে আসত।
কফি বিনস্ বিড়ালের পেটে যাওয়ার পর ফারমেন্টেশন হয় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। বিড়ালের পাকস্থলীর মধ্যেকার এনজাইম কফি বিনের সঙ্গে মিশে যায় এবং এমাইনো এসিডের প্রাচুর্য দেখা যায়। ফলে অসাধারণ সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু কফি পাওয়া যায় তা থেকে। ব্যাপারটা ডাচ কর্মকর্তাদের কানে এলো। তারা সিদ্ধান্ত নিল এ Civet Catকে মেরে ফেলার।

কিন্তু এদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তারা সুবিধে করতে পারলেন না। কৌতূহলী হয়ে ডাচরা কৃষকের মতো করে কফি বানিয়ে খেতে শুরু করলেন। তারা বেশ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন, এ কফি সাধারণ কফি থেকে অনেক বেশি সুস্বাদু এবং তাদের ঘ্রাণও অনেক বেশি উন্নত মানের। ফলে ডাচদের কাছে Civet Cat-এর খাওয়া কফির কদর বাড়তে লাগল। এ অদ্ভুত উপায়ে কফি তৈরির উদ্ভাবক হয়েও ইন্দোনেশীয় কৃষক বঞ্চিতই থেকে গেলেন কফি খাওয়া থেকে। মাঝখান থেকে এটি হয়ে গেল বিশ্বের সেরা কফি। ধারণা করা হয়, শুধু স্বাদ ও গন্ধের জন্য নয়, এর অনন্য এ গল্পটির কারণেও বিখ্যাত হয়েছে এ কফি সমগ্র পৃথিবীতে।

ড. আসমা অন্বেষা : কানাডার টরন্টো প্রবাসী
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন