চীনের ‘ছোট শীত’
jugantor
চীনের ‘ছোট শীত’

  আলিমুল হক, বেইজিং থেকে  

১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৮:১৬:৩৮  |  অনলাইন সংস্করণ

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন- ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত‘। অনেকটা তেমন করেই বলতে হচ্ছে- ‘শীতের তীব্রতা যত বেশিই থাকুক, এখন চীনে ছোট শীত।’ কারণ এই সময়কালটাকে চীনারা প্রাচীন কাল থেকেই ‘ছোট শীত’ নামে ডেকে আসছে। রীতিমতো তাদের চান্দ্রপঞ্জিকার অংশ এটি। তাই আমরা যখন বেইজিংয়ে একগাদা গরম কাপড় পরে বাইরে বেরুলেও প্রচণ্ড শীতে কাঁপি, তখনো ‘ছোট শীত’-কে অন্য কোনো নামে ডাকার উপায় নেই।

জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে বিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে সর্বত্র। এইতো সেদিন পাকিস্তানের এমন একটি অঞ্চলে ভয়ানক তুষারঝড় আঘাত হানে, যেখানে এমনটা কল্পনাও করা যায়নি আগে। সৌদি আরবে ব্যাপক তুষারপাতের দৃশ্য তো ইন্টারনেটে রীতিমতো ভাইরাল! খোদ চীনে গত বছর এমনসব এলাকায় মারাত্মক বন্যা দেখা দেয়, যেসব জায়গায় আগে কখনও বন্যা হয়নি! এই পরিবর্তনের কালে কোনোকিছুই যেন আর অস্বাভাবিক নয়! তাই ‘ছোট শীত’-এর সময় তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৭/৮ হয়, তখনও অবাক হওয়া বারণ।

চীনের চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে বছরকে ভাগ করা হয় ২৪টি সৌরপদ (solar terms)-এ। প্রাচীন চীনে হলুদ নদীর অববাহিকায় এই ২৪ সৌরপদের উৎপত্তি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ২৪ সৌরপদ ‘চীনের পঞ্চম মহান আবিষ্কার’ (Fifth Great Invention of China) হিসেবে স্বীকৃত। ইউনেস্কোও একে মানবজাতির অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ২৪টি সৌরপদ বা সোলার টার্ম হচ্ছে- লি ছুন (বসন্তের শুরু), ইয়ুশুই (বৃষ্টির পানি), চিংচ্য (পোকামাকড়ের জাগরণ), ছুনফেন (বসন্ত বিষুব), ছিংমিং (তাজা সবুজ), কুইয়ু (শস্য-বৃষ্টি), লিসিয়া (গ্রীষ্মের শুরু), সিয়াওমান (কম পূর্ণতা), মাংচুং (ফসল বোনার সময়), সিয়াচি (উত্তরায়ন), সিয়াওশু (কম গরম), তাশু (বেশি গরম), লিছিয়ু (শরতের শুরু), ছুশু (গরমের শেষ), পাইলু (শুভ্র শিশির), ছিউফ্যন (শারদীয় বিষুব), হানলু (ঠাণ্ডা শিশির), শুয়াংচিয়াং (প্রথম হিমেল হাওয়া), লিতুং (শীতের শুরু), সিয়াওসুয়ে (ছোট তুষার), তাসুয়ে (বড় তুষার), তুংচি (দক্ষিণায়ন), সিয়াওহান (ছোট শীত), তাহান (বড় শীত)।

প্রতিটি সৌরপদের আছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা সৌরপদ অনুসারে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কৃষিকাজ আঞ্জাম দিয়ে আসছে। বছরের কোন সৌরপদে আবহাওয়া কেমন থাকবে- তা নামগুলো দেখলেই বোঝা যায়। সৌরপদ অনুসারে চীনারা তাদের খাওয়া-দাওয়ায়ও পরিবর্তন আনে, পরিবর্তন আনে পোশাক-আশাকে। এখন চলছে সৌরপদ সিয়াওহান বা ‘ছোট শীত’। চীনা ভাষায় ‘সিয়াও’ মানে ‘ছোট’ এবং ‘হান’ মানে ‘শীত’ বা ‘ঠাণ্ডা’। এটি চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার ২৩তম সৌরপদ। এ সৌরপদ শুরু হয়েছে গত ৫ জানুয়ারি; স্থায়ী হবে সপ্তাহ দুয়েক।

‘ছোট শীত’ বছরের সবচেয়ে ঠাণ্ডা দিনগুলোকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এরপর থেকে দিন যত গড়ায়, ঠাণ্ডার তীব্রতা তত বাড়তে থাকে। অন্যভাবে বললে, চীনের ২৩তম সৌরপদ হচ্ছে বছরের সবচেয়ে ঠাণ্ডা সময়ের বার্তাবাহক। কিন্তু যেমনটি আগেই বলেছি- ‘ছোট শীত’ শুরু হবার আগেই এবার চীনের বিভিন্ন স্থানে ‘বড় শীত’-এর আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। পাঠক ঠিকই ধরেছেন, চীনের চান্দ্রপঞ্জিকার ২৪তম তথা শেষ সৌরপদটির নাম ‘বড় শীত’ বা ‘তাহান’ (‘তা’ মানে বড়)। ‘বড় শীত’ স্থায়ী হবে পয়লা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তখন শুরু হবে প্রথম সৌরপদ ‘লিছুন’; শুরু হবে বসন্ত।

প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা পরিশ্রমী। বিরূপ আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেই আধুনিক চীনাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকতে হয়েছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো শীতের তীব্রতাকেও তারা ভয় পেতেন না। ‘ছোট শীতের’ আগমনে তারা বরং নিজেদের প্রস্তুত করতেন বসন্ত উৎসবের জন্য। বসন্ত উৎসব মানে নতুন বছরের সূচনা। নতুন বছরের জন্য চীনারা সপ্তাহ তিনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বসন্ত উৎসবের জন্য সুস্বাদু খাবার লাগে, বসন্ত উৎসবের শ্লোক ও উৎসবের ছবিসম্বলিত ছবি লাগে, পটকা-বাজি লাগে। আজকাল অবশ্য পরিবেশদূষণ এড়াতে পটকা-বাজির ব্যবহার চীনে অনেক কমেছে। তবে, অন্যান্য জিনিসের ব্যবহার ঠিকই আছে। বেইজিংয়ের সুপারমলগুলোতে এখনই পাওয়া যাচ্ছে উৎসবের ছবি ও সুখ-শান্তি কামনা করে লেখা শ্লোকসমৃদ্ধ রঙিন কাগজ। আমার ছেলে সেদিন বাজার থেকে তেমন রঙিন কাগজ কিনে এনে দরজায় ঝুলিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা এ কাজটি করে আসছেন। এটা উৎসবের অনুষঙ্গ। বসন্ত উৎসবকে সামনে রেখে চীনাদের প্রস্তুতি শুরু হয় এই ‘ছোট শীতে’।

‘ছোট শীতে’ চীনারা ভেড়ার মাংসের হটপট (এক ধরনের বিশেষ খাবার), চেস্টনাট, ও আগুনে শেঁকা মিস্টি আলু খেয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারেই চীনারা প্রাচীনকাল থেকে ‘ছোট শীতে’ এ তিনটি খাবার খেয়ে আসছেন। চীনা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে শীতের কুফল থেকে বাঁচাতে এমন খাবার খেতে হবে, যেগুলো সেদ্ধ করা, ভাজা, ও আগুনে শেঁকা। গরুর মাংস, তিল, আখরোট, কাজুবাদাম, কিশমিশ, ইত্যাদি খাবারও ‘ছোট শীতে’ চীনাদের পছন্দ।

‘ছোট শীতে’ চীনারা আরেকটি খাবার বেশ পছন্দ করে। আর সেটি হচ্ছে ‘লাবা পরিজ’, যা এক ধরনের জাউ। এই জাউ তৈরি করা হয় প্রায় কুড়ি ধরনের বাদাম, শস্যের গুড়া, ও শুকনা ফল-ফলাদি দিয়ে। রাজধানী বেইজিংয়ের স্থানীয় বাসিন্দারা সাধারণত লাবা পরিজ রান্না করে চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার দ্বাদশ মাসের সপ্তম দিনে। তাঁরা লাবা পরিজের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে অল্প আঁচে সারারাত সেদ্ধ করে। পরের দিন সকাল নাগাদ তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু ‘লাবা পরিজ’। তীব্র শীতে এ খাবার তাদের শরীর তাজা করে, গরম রাখে।

নানচিং প্রাচীনকালে বহু রাজবংশ আমলে চীনের রাজধানী ছিল। এটি এখন দেশটির চিয়াংসু প্রদেশের রাজধানী। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে এই নানচিংয়ে আগ্রাসী জাপানি বাহিনী ব্যাপক লুটতরাজ-হত্যা-ধর্ষণ চালিয়েছিল। ইতিহাসে তা ‘নানচিং গণহত্যা’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। তো, এই নানচিংয়ের বাসিন্দারা ‘ছোট শীত’কে খুব গুরুত্ব দেয়। আজও তাঁরা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি রীতি ধরে রেখেছে। সেই রীতি অনুসারে, ‘ছোট শীত’ সৌরপদে সবজি-ভাত খাওয়া হতো। আজও নানচিংবাসী ‘ছোট শীতে’ সবজি-ভাত খায়। এ সবজি-ভাত রান্না করা হয় ‘আইচিয়াওহুয়াং’ নামক এক ধরনের সবুজ সবজির সঙ্গে চাল মিশিয়ে। সঙ্গে দেওয়া হয় সসেজ ও লবণ-মাখানো হাঁসের মাংস। গোটা রান্নাটা করা হয় ভাপে।

‘ছোট শীত’ তথা চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার ২৩তম সৌরপদ চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক ও ফার্মেসিগুলোর জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরা এ সময় নতুন ওষুধ প্রস্তুত করেন। এসব ওষুধ চীনা নববর্ষের আগে ব্যবহারযোগ্য। এ সময় ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও ফার্মেসিগুলো সরগরম হয়ে ওঠে। তাদের এই ব্যস্ততার কেন্দ্রেও রয়েছে বসন্ত উৎসব তথা নববর্ষ।

লেখক: বার্তা-সম্পাদক, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি), বেইজিং
alimulh@yahoo.com

চীনের ‘ছোট শীত’

 আলিমুল হক, বেইজিং থেকে 
১৩ জানুয়ারি ২০২২, ০৬:১৬ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন- ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত‘। অনেকটা তেমন করেই বলতে হচ্ছে- ‘শীতের তীব্রতা যত বেশিই থাকুক, এখন চীনে ছোট শীত।’ কারণ এই সময়কালটাকে চীনারা প্রাচীন কাল থেকেই ‘ছোট শীত’ নামে ডেকে আসছে। রীতিমতো তাদের চান্দ্রপঞ্জিকার অংশ এটি। তাই আমরা যখন বেইজিংয়ে একগাদা গরম কাপড় পরে বাইরে বেরুলেও প্রচণ্ড শীতে কাঁপি, তখনো ‘ছোট শীত’-কে অন্য কোনো নামে ডাকার উপায় নেই।

জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে বিশ্বব্যাপী। এর প্রভাবও দেখা যাচ্ছে সর্বত্র। এইতো সেদিন পাকিস্তানের এমন একটি অঞ্চলে ভয়ানক তুষারঝড় আঘাত হানে, যেখানে এমনটা কল্পনাও করা যায়নি আগে। সৌদি আরবে ব্যাপক তুষারপাতের দৃশ্য তো ইন্টারনেটে রীতিমতো ভাইরাল! খোদ চীনে গত বছর এমনসব এলাকায় মারাত্মক বন্যা দেখা দেয়, যেসব জায়গায় আগে কখনও বন্যা হয়নি! এই পরিবর্তনের কালে কোনোকিছুই যেন আর অস্বাভাবিক নয়! তাই ‘ছোট শীত’-এর সময় তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৭/৮ হয়, তখনও অবাক হওয়া বারণ।

চীনের চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে বছরকে ভাগ করা হয় ২৪টি সৌরপদ (solar terms)-এ। প্রাচীন চীনে হলুদ নদীর অববাহিকায় এই ২৪ সৌরপদের উৎপত্তি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ২৪ সৌরপদ ‘চীনের পঞ্চম মহান আবিষ্কার’ (Fifth Great Invention of China) হিসেবে স্বীকৃত। ইউনেস্কোও একে মানবজাতির অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই ২৪টি সৌরপদ বা সোলার টার্ম হচ্ছে- লি ছুন (বসন্তের শুরু), ইয়ুশুই (বৃষ্টির পানি), চিংচ্য (পোকামাকড়ের জাগরণ), ছুনফেন (বসন্ত বিষুব), ছিংমিং (তাজা সবুজ), কুইয়ু (শস্য-বৃষ্টি), লিসিয়া (গ্রীষ্মের শুরু), সিয়াওমান (কম পূর্ণতা), মাংচুং (ফসল বোনার সময়), সিয়াচি (উত্তরায়ন), সিয়াওশু (কম গরম), তাশু (বেশি গরম), লিছিয়ু (শরতের শুরু), ছুশু (গরমের শেষ), পাইলু (শুভ্র শিশির), ছিউফ্যন (শারদীয় বিষুব), হানলু (ঠাণ্ডা শিশির), শুয়াংচিয়াং (প্রথম হিমেল হাওয়া), লিতুং (শীতের শুরু), সিয়াওসুয়ে (ছোট তুষার), তাসুয়ে (বড় তুষার), তুংচি (দক্ষিণায়ন), সিয়াওহান (ছোট শীত), তাহান (বড় শীত)।

প্রতিটি সৌরপদের আছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা সৌরপদ অনুসারে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে কৃষিকাজ আঞ্জাম দিয়ে আসছে। বছরের কোন সৌরপদে আবহাওয়া কেমন থাকবে- তা নামগুলো দেখলেই বোঝা যায়। সৌরপদ অনুসারে চীনারা তাদের খাওয়া-দাওয়ায়ও পরিবর্তন আনে, পরিবর্তন আনে পোশাক-আশাকে। এখন চলছে সৌরপদ সিয়াওহান বা ‘ছোট শীত’। চীনা ভাষায় ‘সিয়াও’ মানে ‘ছোট’ এবং ‘হান’ মানে ‘শীত’ বা ‘ঠাণ্ডা’। এটি চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার ২৩তম সৌরপদ। এ সৌরপদ শুরু হয়েছে গত ৫ জানুয়ারি; স্থায়ী হবে সপ্তাহ দুয়েক।

‘ছোট শীত’ বছরের সবচেয়ে ঠাণ্ডা দিনগুলোকে যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে। এরপর থেকে দিন যত গড়ায়, ঠাণ্ডার তীব্রতা তত বাড়তে থাকে। অন্যভাবে বললে, চীনের ২৩তম সৌরপদ হচ্ছে বছরের সবচেয়ে ঠাণ্ডা সময়ের বার্তাবাহক। কিন্তু যেমনটি আগেই বলেছি- ‘ছোট শীত’ শুরু হবার আগেই এবার চীনের বিভিন্ন স্থানে ‘বড় শীত’-এর আমেজ পাওয়া যাচ্ছে। পাঠক ঠিকই ধরেছেন, চীনের চান্দ্রপঞ্জিকার ২৪তম তথা শেষ সৌরপদটির নাম ‘বড় শীত’ বা ‘তাহান’ (‘তা’ মানে বড়)। ‘বড় শীত’ স্থায়ী হবে পয়লা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তখন শুরু হবে প্রথম সৌরপদ ‘লিছুন’; শুরু হবে বসন্ত।

প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা পরিশ্রমী। বিরূপ আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করেই আধুনিক চীনাদের পূর্বপুরুষদের টিকে থাকতে হয়েছে। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো শীতের তীব্রতাকেও তারা ভয় পেতেন না। ‘ছোট শীতের’ আগমনে তারা বরং নিজেদের প্রস্তুত করতেন বসন্ত উৎসবের জন্য। বসন্ত উৎসব মানে নতুন বছরের সূচনা। নতুন বছরের জন্য চীনারা সপ্তাহ তিনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। বসন্ত উৎসবের জন্য সুস্বাদু খাবার লাগে, বসন্ত উৎসবের শ্লোক ও উৎসবের ছবিসম্বলিত ছবি লাগে, পটকা-বাজি লাগে। আজকাল অবশ্য পরিবেশদূষণ এড়াতে পটকা-বাজির ব্যবহার চীনে অনেক কমেছে। তবে, অন্যান্য জিনিসের ব্যবহার ঠিকই আছে। বেইজিংয়ের সুপারমলগুলোতে এখনই পাওয়া যাচ্ছে উৎসবের ছবি ও সুখ-শান্তি কামনা করে লেখা শ্লোকসমৃদ্ধ রঙিন কাগজ। আমার ছেলে সেদিন বাজার থেকে তেমন রঙিন কাগজ কিনে এনে দরজায় ঝুলিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই চীনারা এ কাজটি করে আসছেন। এটা উৎসবের অনুষঙ্গ। বসন্ত উৎসবকে সামনে রেখে চীনাদের প্রস্তুতি শুরু হয় এই ‘ছোট শীতে’।

‘ছোট শীতে’ চীনারা ভেড়ার মাংসের হটপট (এক ধরনের বিশেষ খাবার), চেস্টনাট, ও আগুনে শেঁকা মিস্টি আলু খেয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী চীনা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারেই চীনারা প্রাচীনকাল থেকে ‘ছোট শীতে’ এ তিনটি খাবার খেয়ে আসছেন। চীনা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে শীতের কুফল থেকে বাঁচাতে এমন খাবার খেতে হবে, যেগুলো সেদ্ধ করা, ভাজা, ও আগুনে শেঁকা। গরুর মাংস, তিল, আখরোট, কাজুবাদাম, কিশমিশ, ইত্যাদি খাবারও ‘ছোট শীতে’ চীনাদের পছন্দ।

‘ছোট শীতে’ চীনারা আরেকটি খাবার বেশ পছন্দ করে। আর সেটি হচ্ছে ‘লাবা পরিজ’, যা এক ধরনের জাউ। এই জাউ তৈরি করা হয় প্রায় কুড়ি ধরনের বাদাম, শস্যের গুড়া, ও শুকনা ফল-ফলাদি দিয়ে। রাজধানী বেইজিংয়ের স্থানীয় বাসিন্দারা সাধারণত লাবা পরিজ রান্না করে চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার দ্বাদশ মাসের সপ্তম দিনে। তাঁরা লাবা পরিজের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে অল্প আঁচে সারারাত সেদ্ধ করে। পরের দিন সকাল নাগাদ তৈরি হয়ে যায় সুস্বাদু ‘লাবা পরিজ’। তীব্র শীতে এ খাবার তাদের শরীর তাজা করে, গরম রাখে।

নানচিং প্রাচীনকালে বহু রাজবংশ আমলে চীনের রাজধানী ছিল। এটি এখন দেশটির চিয়াংসু প্রদেশের রাজধানী। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে এই নানচিংয়ে আগ্রাসী জাপানি বাহিনী ব্যাপক লুটতরাজ-হত্যা-ধর্ষণ চালিয়েছিল। ইতিহাসে তা ‘নানচিং গণহত্যা’ নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। তো, এই নানচিংয়ের বাসিন্দারা ‘ছোট শীত’কে খুব গুরুত্ব দেয়। আজও তাঁরা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা একটি রীতি ধরে রেখেছে। সেই রীতি অনুসারে, ‘ছোট শীত’ সৌরপদে সবজি-ভাত খাওয়া হতো। আজও নানচিংবাসী ‘ছোট শীতে’ সবজি-ভাত খায়। এ সবজি-ভাত রান্না করা হয় ‘আইচিয়াওহুয়াং’ নামক এক ধরনের সবুজ সবজির সঙ্গে চাল মিশিয়ে। সঙ্গে দেওয়া হয় সসেজ ও লবণ-মাখানো হাঁসের মাংস। গোটা রান্নাটা করা হয় ভাপে।

‘ছোট শীত’ তথা চীনা চান্দ্রপঞ্জিকার ২৩তম সৌরপদ চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সক ও ফার্মেসিগুলোর জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরা এ সময় নতুন ওষুধ প্রস্তুত করেন। এসব ওষুধ চীনা নববর্ষের আগে ব্যবহারযোগ্য। এ সময় ঐতিহ্যবাহী চীনা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও ফার্মেসিগুলো সরগরম হয়ে ওঠে। তাদের এই ব্যস্ততার কেন্দ্রেও রয়েছে বসন্ত উৎসব তথা নববর্ষ।

লেখক: বার্তা-সম্পাদক, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি), বেইজিং
alimulh@yahoo.com
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন