Logo
Logo
×
   

দৃষ্টিপাত

সময় এখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের কৌশল ঢেলে সাজানোর

Icon

টমাস কিয়ান

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম

সময় এখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের কৌশল ঢেলে সাজানোর

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে মিয়ানমারের সঙ্গে তার দক্ষিণ সীমান্ত সংলগ্ন কক্সবাজারের জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির। ঢাকা বরাবরই জোর দিয়ে আসছে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসনই এই শরণার্থী সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাচ্ছে এবং আরও দূরে সরে যাচ্ছে। 

২০২১ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান দেশটিকে একটি বিস্তৃত গৃহযুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এবং রাখাইন রাজ্য এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে একটি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তার তহবিল হ্রাস এবং শিবিরগুলোর পরিস্থিতির অবনতি শরণার্থীদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। শরণার্থী সংকটের প্রতি মনোযোগ স্তিমিত হতে না দিয়ে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের উচিত বাস্তবসম্মত লক্ষ্য এবং বাস্তবমুখী কূটনীতির আলোকে তাদের রোহিঙ্গা নীতি ঢেলে সাজানো।

২০১৬–১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমনপীড়ন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ যখন আশ্রয় দিয়েছিল, তখন এটিকে একটি সাময়িক জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সাড়া হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর এটি এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। 

একটি ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নতুন সরকারের সামনে এটি এক দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি সরকার বর্তমানে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সুসংহত করা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, অর্থনীতি সচল করা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলাসহ নানা মুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। 

দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটি একটি উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনা, বিশেষ করে একটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিএনপির শীর্ষ অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে না। তবে দেশের দক্ষিণ সীমান্তে থাকা এই শরণার্থীদের অবহেলা করা হবে একটি গুরুতর ভুল। শরণার্থী শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি সেখানে বসবাসকারীদের কষ্ট কেবল বাড়াবেই না, বরং ওই অঞ্চলের বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপরও চাপ বাড়াবে এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে।

গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকলেও, দল হিসেবে বিএনপির রোহিঙ্গাদের ওপর চলা সহিংসতার চক্র এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানাশোনা আছে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে যখন উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছিল, তখন আগের সেই শরণার্থী আগমন পরিস্থিতি বিএনপি সরকারগুলোই সামাল দিয়েছিল। 

ফাইল ছবি

তবে এবারকার পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার অনেক এলাকায় তার বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে; আরাকান আর্মির বিজয়ের ফলে রাখাইনের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে; সাহায্যদাতাদের তহবিল জোগানোর আগ্রহ কমছে এবং বাংলাদেশের মানুষও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে অগ্রগতির জন্য অধীর হয়ে উঠেছে। রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য মিয়ানমারের শাসকদের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার অপেক্ষায় থাকার যে নীতি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া গেছে, তা বর্তমানের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তোলার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিএনপির ২০২৩ সালের রোহিঙ্গা সংকট ও প্রত্যাবাসন কৌশলের ওপর ভিত্তি করে নতুন সরকারের উচিত হবে প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ধরে রাখা। একই সঙ্গে শরণার্থীশিবিরগুলোতে নিরাপত্তা ও সুশাসন জোরদার করা, শরণার্থীদের স্বনির্ভরতা বাড়ানো এবং বর্তমানে রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি—অর্থাৎ আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আরও বাস্তবসম্মত অন্তর্বর্তীকালীন একটি কৌশল গ্রহণ করা।

অতীত থেকে শিক্ষা

২০১৬-২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কূটনৈতিক পন্থায় এই সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তার সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সই করেছিল, পৃথক একটি চুক্তির মাধ্যমে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারকে (ইউএনএইচসিআর) এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেছিল এবং পরবর্তীতে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মধ্যস্থতা করতে চীনের সহায়তা চেয়েছিল। 

ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও নেপিদোর সঙ্গে সম্মত হওয়া এবং জাতিসংঘের অনুমোদন পাওয়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন শরণার্থীও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারে ফিরে যাননি। মিয়ানমারের তৈরি করা আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াও এর মূল কারণটি ছিল অত্যন্ত সহজ। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা—যাদের মধ্যে কেউ কেউ অতীতেও বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন—তাদের মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আর এই নিশ্চয়তা দিতে নেপিদো তখনো রাজি ছিল না (এবং সম্ভবত এখনো নেই)।

রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশি সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার তাদের চলাচল, কাজের সুযোগ এবং শিক্ষার অধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিক সমাজের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করে। তবে এসব পদক্ষেপ প্রত্যাবাসনের পথ সুগম করার পরিবর্তে উলটো বৈদেশিক সাহায্যের ওপর পরনির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সহিংস রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দেয়। 

আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) শরণার্থীশিবিরগুলোতে প্রধান প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালিয়েছে এমন অজুহাতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ২০১৭ সালে সেই নৃশংস অভিযান চালিয়েছিল, যার ফলে এই ব্যাপক গণ-উদ্বাস্তু পরিস্থিতি তৈরি হয়। আরসার সদস্যরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হত্যা করার মতো চরম পদক্ষেপও নেয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। আরসার প্রভাব ঠেকাতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অংশ রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনকে (আরএসও) পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে। এর ফলে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এক আধিপত্যের লড়াই শুরু হয়, যা অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

এদিকে রাখাইন রাজ্যের প্রধানত বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির উত্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার নেপিদোর সঙ্গেই শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নীতিতে অবিচল ছিল। রোহিঙ্গাদের দলে দলে পালিয়ে আসার প্রথম কয়েক বছর এই পদ্ধতিটি যৌক্তিক বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানের পর আরাকান আর্মি যখন রাখাইন রাজ্যে তাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে নেয়, তখনও ঢাকা নেপিদোকেই একমাত্র চূড়ান্ত আলোচক বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে এক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা যখন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান, তত দিনে রাখাইনের ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ অচেনা এক রূপে বদলে গিয়েছিল।

শেখ হাসিনার বিদায়ের পর ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার দেশের শরণার্থী পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়টিকে নতুন করে গতি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। রোহিঙ্গা কূটনীতি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আরাকান আর্মির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার চেষ্টা করেছিলেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই ইস্যুতে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতিসংঘ সম্মেলনের জন্য জোর দিয়েছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সাধারণ রোহিঙ্গাকে যুক্ত করতে সরকার শরণার্থীশিবিরগুলোতে সীমিত পরিসরে নেতৃত্ব ’নির্বাচন’ তদারকি করেছিল। 

একই সঙ্গে শরণার্থীদের ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ অনানুষ্ঠানিকভাবে শিথিল করা হয়েছিল, যার মধ্যে রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিচালিত স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষা কেন্দ্রের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টিও ছিল। এদিকে, প্রধান প্রধান রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কার্যত একটি অস্ত্রবিরতি বা ’মিশন হারমোনি’র মাধ্যমে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো শরণার্থীশিবিরগুলোতে আধিপত্যের লড়াই নিয়ন্ত্রণে এনেছিল।

এসব পদক্ষেপ প্রত্যাবাসনের ওপর আওয়ামী লীগের একক মনোযোগের নীতি থেকে সরে আসার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও, তা কোনো স্থায়ী সমাধানের ক্ষেত্রে তেমন বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিএনপির বর্তমান কাজ হলো এমন একটি পদ্ধতি বা কৌশল তৈরি করা, যা বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা—উভয় পক্ষের সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো সীমিত করার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করবে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় কিছু রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হতে পারে। তবে তা কমিয়ে আনা সম্ভব এবং যেকোনো পরিস্থিতিতেই এই সংকটকে দীর্ঘকাল ধরে এভাবে চলতে দেওয়ার চড়া মূল্যের তুলনায় সেই রাজনৈতিক মূল্য হবে অনেক কম।

শরণার্থীশিবিরে কঠিন জীবনযাপন

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিগত মাসগুলোতে শরণার্থীশিবিরগুলোর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন কার্যক্রমে প্রতিবছর ৬০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ আসত, যার ফলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সব শরণার্থীকে মাসে ১২ ডলার সমমূল্যের খাদ্য রেশন দিতে পারত। বৈধ কাজের সুযোগ তেমন না থাকায় এটি ছিল রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী এক মাধ্যম। জাতিসংঘ এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোও (এনজিও) শিবিরগুলোতে রান্নার জ্বালানি, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবাসহ অনেক জরুরি পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে আসছিল।

ফাইল ছবি

তবে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া অন্যান্য মানবিক সংকট, সাহায্যদাতাদের অগ্রাধিকারের পরিবর্তন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা খাতে বরাদ্দ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে তহবিল সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে মানবিক সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করতে এবং সেবা প্রদানে নিয়োজিত হাজারো বেতনভুক্ত শরণার্থী ’স্বেচ্ছাসেবক’ ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। গত এপ্রিলে ডব্লিউএফপি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শরণার্থীর জন্য খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে বর্তমানে কেউ কেউ মাসে মাত্র ৭ ডলার সমমূল্যের রেশন পাচ্ছেন।

তহবিলের পরিমাণ আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব কম বললেই চলে। বাস্তবতা হলো, বর্তমানের এই সহায়তার ধারা বজায় রাখাই কঠিন হবে। এই চ্যালেঞ্জটি আরও ঘনীভূত হয়েছে শরণার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে। এর পেছনে রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি নতুন রোহিঙ্গার আগমন এবং প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্ম। কোনো বহুতল ভবন না থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা শিবিরগুলো এখন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার চেয়েও বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। 

শরণার্থীশিবিরে অধিকাংশ বাসিন্দার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। রাষ্ট্রীয় নিয়মানুযায়ী রোহিঙ্গারা কেবল মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর অধীনে বেতনভুক্ত ’স্বেচ্ছাসেবক’ হিসেবে কাজ করার অনুমতি পেয়ে থাকেন। কারণ ঢাকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তাদের সমাজে মিশে যাওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে এবং স্থানীয়দের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক শরণার্থী ইতিমধ্যেই শিবিরের ভেতরে ও বাইরে কাজ করছেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এর অনুমতি না থাকায় স্থানীয় নিয়োগকর্তারা তাদের কম মজুরি দিয়ে থাকেন।

এর ফলে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা মনে করেন, শরণার্থীরা তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে, পাশাপাশি খাবারের দাম বাড়িয়েছে, স্থানীয় সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে এবং অপরাধ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভূমিকা রাখছে। কিছু ক্ষোভ বা অভিযোগ অবশ্য বাস্তব—বাংলাদেশি দিনমজুরেরা, বিশেষ করে নির্মাণ, কৃষি এবং মৎস্য চাষের মতো খাতগুলোতে শরণার্থী শ্রমিকদের কারণে তাদের মজুরি কমে যেতে দেখেছেন। তবে অন্যান্য কিছু অভিযোগ বাড়িয়ে বলা হয়েছে। বিদেশি সহায়তার একটি বড় অংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে গেছে এবং বাংলাদেশিরা মানবিক সেবা সংক্রান্ত চাকরি এবং সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী—উভয় পক্ষের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ থেকে উপকৃত হয়েছেন। 

শরণার্থীশিবিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হওয়া ’মিশন হারমোনি’ বা অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। মূলত আন্তসীমান্ত মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণেই এমনটা ঘটছে। মে মাসের শুরুর দিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িত দুই রোহিঙ্গা পৃথক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে সেখানে প্রাণঘাতী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো একটি যৌথ অভিযান শুরু করেছে এবং গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষস্থানীয় সদস্যদের আটক করতে শুরু করেছে। 

শরণার্থীশিবিরের অধিকাংশ রোহিঙ্গাই এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অবজ্ঞার চোখে দেখেন এবং মূলত অবৈধ কর্মকাণ্ড আড়াল করতে রোহিঙ্গা জন্মভূমির জন্য লড়াই করার তাদের যে দাবি, সেটাকে নাকচ করে দেন। এই অভিযান নির্দিষ্টভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে এবং শরণার্থী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যাপক অভিযানে রূপ নেয়নি দেখেও তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। 

শরণার্থীশিবিরে অনেক শরণার্থীই আরও মৌলিক কিছু পরিবর্তন দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন। তাদের আশা, সশস্ত্র দলগুলোর জায়গা যদি প্রকৃত বেসামরিক নেতারা নিতে পারেন, তবে তারা বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকারের পক্ষে কথা বলতে পারবেন। তবে ২০১৯ সাল থেকে ক্যাম্পগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি এবং নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সরকারের বিধিনিষেধের কারণে এ ধরনের নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। 

শুরুতে অনেকে আশাবাদী ছিলেন যে, শরণার্থীশিবিরে ২০২৫ সালের কঠোর নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন হয়তো শরণার্থী নেতৃত্বের জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করবে। তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করেছে—’ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ সেটি বাংলাদেশি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করা হয় এবং এর কোনো বৈধতা নেই। এই কাউন্সিলকে আবার ’রোহিঙ্গা কমিটি ফর পিস অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন’ (আরসিপিআর)-এর সঙ্গে এক অস্বস্তিকর সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আরসিপিআর হলো মিয়ানমার সামরিক বাহিনী, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের কিছু নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা কুখ্যাত রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী দিল মোহাম্মদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী।

এক তরুণ রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীর মৃত্যু শরণার্থীশিবিরের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নিয়ে চলা দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। গত এপ্রিলের শুরুর দিকে আন্দামান সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় ২৮০ জন যাত্রীসহ (যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা) একটি নৌকা ডুবে যাওয়ার পর মোহাম্মদ উল্লাহ নিখোঁজ হন। ওই ঘটনায় মাত্র ৯ জন বেঁচে ফিরেছেন। এর পরপরই ক্যাম্পে থাকা তার বন্ধুরা জানান, ফেসবুকে দিল মোহাম্মদের সমালোচনা করে একটি পোস্ট দেওয়ার কারণে আরসিপিআর এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছিলেন মোহাম্মদ উল্লাহ। আর এই হুমকির কারণেই তিনি মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য মানব পাচারকারীদের টাকা দিয়েছিলেন। এরপর থেকে নিজেদের ’রোহিঙ্গা জেন জি’ নামে পরিচয় দেওয়া তরুণ অধিকারকর্মীদের একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ফেসবুক পেজ খুলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে একটি প্রচার অভিযান শুরু করেছে এবং নতুন নেতৃত্বের দাবি জানাচ্ছে। তাদের এই প্রচারণা মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ কারা পাচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ শরণার্থীদের মধ্যে বিরাজমান ব্যাপক হতাশারই প্রতিফলন। 

কক্সবাজারে সামনের পথনকশা

জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন শরণার্থী কার্যক্রম এবং বাংলাদেশ সরকার—উভয় পক্ষের সামনেই এখন অনেক কম তহবিল নিয়ে এই দীর্ঘায়িত সংকটের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া ছাড়া বিকল্প খুব কম। কাজের পুনরাবৃত্তি এবং বাড়তি খরচ এড়াতে মানবিক সংস্থাগুলো শরণার্থীশিবিরের ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও সুবিন্যস্ত করতে পারে। তারা স্থানীয় মানবিক সংস্থাগুলোর কাছে নেতৃত্ব ও তহবিল হস্তান্তরের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। 

সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় সংস্থাগুলোর পক্ষে প্রদান করা কঠিন হতে পারে—এমন বিশেষ ক্ষেত্রগুলোর; যেমন সুরক্ষামূলক সেবার দায়িত্ব নিজেদের কাছে রেখে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর উচিত হবে যথাসম্ভব কম খরচে কাজ করতে সক্ষম এনজিওগুলোর কাছে তাদের কার্যক্রম হস্তান্তর করা।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া অথবা নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত। এটি একদিকে যেমন মানবিক সহায়তার ঘাটতি পুষিয়ে দেবে, অন্যদিকে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করবে। 

বাস্তবতা হলো, অনেক শরণার্থী ইতিমধ্যেই শিবিরের ভেতরে ও বাইরে অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন কিংবা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শ্রমিকসংকট রয়েছে এমন খাতগুলোতে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা—যা বিএনপি নিজেই তার ২০২৩ সালের নীতিমালায় প্রস্তাব করেছিল—তা কেবল শরণার্থীদের কাজের পরিবেশেরই উন্নতি ঘটাবে না এবং অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমাবে না, বরং কম বেতনের বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাবও সীমিত করবে। 

সরকারের উচিত শরণার্থীশিবিরগুলোর ভেতরে বাজারের অনুমোদন দেওয়া এবং রোহিঙ্গাদের জন্য পণ্যসামগ্রীভিত্তিক খাদ্য সহায়তার পরিবর্তে নগদ অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা; যা পরিচালন ব্যয় কমাবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিকে গতিশীল করবে। 

শরণার্থী জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিবিরগুলোর সম্প্রসারণ করাও এখন আবশ্যক। নতুন অথবা বর্ধিত শিবিরগুলো উন্নত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তহবিল আকর্ষণেও সাহায্য করতে পারে, যার মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে তহবিল পাওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। 

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার মানবিক সংস্থাগুলোকে আরও টেকসই সামগ্রী দিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেওয়া শুরু করে। এটি পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া প্রতি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করতে হয় এমন বাঁশ ও ত্রিপল ব্যবহারের কড়া নির্দেশনার চেয়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ছিল। 

যদিও নতুন এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নির্মাণে তিন গুণ বেশি খরচ হয়, তবে সময়ের ব্যবধানে এগুলো অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং দাতাদের কাছে এটি একটি ভালো বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হতে পারে; পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও একই ধরনের সুফল পাওয়া যেতে পারে। 

তবে এখন পর্যন্ত মানবিক তহবিলের তীব্র ঘাটতির কারণে কেবল অল্প সংখ্যক নতুন বাসস্থানই তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এদিকে ভাসানচরের দ্বীপ শরণার্থীশিবিরটি বন্ধ করার বিষয়েও বিএনপির পরিকল্পনা করা উচিত—যে সম্ভাবনার কথা দলটি তার ২০২৩ সালের নীতিমালায় আগেই উল্লেখ করেছিল। সেখানে কক্সবাজারের তুলনায় সেবা প্রদানের খরচ অনেক বেশি।

সরকারের উচিত শরণার্থীশিবিরিগুলোতে নির্ভরযোগ্য রোহিঙ্গা বেসামরিক নেতৃত্বের জন্য পথ উন্মুক্ত করা, পাশাপাশি শিবিরের কর্তৃপক্ষ যেন কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা তাদের সমর্থকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয় তা নিশ্চিত করা। বিএনপি তার ২০২৩ সালের নীতিমালায় যেভাবে লিখেছিল, সেই অনুযায়ী এর লক্ষ্য হওয়া উচিত—’নতুন, শিক্ষিত এবং ভবিষ্যৎ-মুখী বেসামরিক নেতৃত্ব তৈরি করা’। 

এই নেতৃত্বদানকারী সংগঠনগুলোতে নারী ও মেয়েদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে উৎসাহিত করা উচিত, বিশেষ করে মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে ঐতিহ্যগতভাবে তাঁদের বাদ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করে। এ ছাড়া শিবিরগুলোতে ব্যাপকভাবে ঘটে চলা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে এবং মানবপাচারের মতো বিষয়গুলোর কারণেও নারীদের অন্তর্ভুক্তি জরুরি।

রাখাইনের পরিবর্তিত পরিস্থিতি

শরণার্থীশিবিরের অভ্যন্তরীণ সংস্কারগুলো অপরিহার্য হলেও, বাংলাদেশ যদি সীমান্তের ওপারের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারে, তবে এর সুফল হবে সামান্যই। শরণার্থীদের যেকোনো ধরনের চূড়ান্ত প্রত্যাবাসন সর্বোপরি রাখাইন রাজ্যের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করবে। 

তবে নেপিদো (মিয়ানমার জান্তা) ও আরাকান আর্মি এখনো যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় ঢাকার পক্ষে এখনই একটি দ্রুত প্রত্যাবাসন চুক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এর পরিবর্তে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে কীভাবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়, এখন থেকেই তার ভিত্তি প্রস্তুত করা উচিত।

নেপিদোর সামরিক জান্তাকে অবশ্য উপেক্ষা করা যাবে না। মূলত শরণার্থীরা যে এলাকায় ফিরে যাবে, সেসব এলাকায় সামরিক বাহিনী ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ হারালেও তারা এখনো রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে—যার মধ্যে নাগরিকত্ব এবং অন্যান্য নথিপত্র (ডকুমেন্টেশন) প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত। 

ফলে যেকোনো ভবিষ্যৎ ব্যবস্থায় তারা প্রতিবন্ধক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঢাকাকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে যে, রাখাইন রাজ্যের ওপর সামরিক বাহিনীর এখন আর নিয়ন্ত্রণ নেই—এই বাস্তবতার বাইরেও, গত কয়েক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নিপীড়নে সেনাবাহিনীর মূল ভূমিকা ছিল। তাই শরণার্থীদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা একটি আন্তরিক অংশীদার হবে—এমনটা ভাবার সুযোগ কম।

বাংলাদেশের জন্য এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি হলো আরাকান আর্মির সঙ্গে, যারা বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা মিয়ানমারের সম্পূর্ণ সীমান্তসহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে রাখাইনে এখনো বসবাসরত কয়েক লাখ রোহিঙ্গা তাদের কর্তৃত্বের অধীনে রয়েছে এবং যেকোনো শরণার্থী ফিরে গেলে এই গোষ্ঠীটিই কার্যত তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত হবে। 

রাখাইনে সামরিক বাহিনীর পালটা আক্রমণের চেষ্টা সত্ত্বেও রাজ্যের বেশিরভাগ অংশের ওপর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বেশ শক্তিশালী বলেই মনে হচ্ছে। পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন অসম্ভব না হলেও অদূর ভবিষ্যতে তা ঘটার সম্ভাবনা কম। এর অর্থ হলো, ঢাকাকে এই অনুমান মাথায় রেখেই এগোতে হবে যে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি আগামী বছরগুলোতে এক অনিবার্য মধ্যস্থতাকারী বা পক্ষ হিসেবে থাকবে।

রাখাইন রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তিত সমীকরণের কারণে যোগাযোগের নতুন মাধ্যম তৈরি করা প্রয়োজন। আরাকান আর্মির সঙ্গে দ্রুত একটি গোপন কিন্তু অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরুর জন্য বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বা দূত মনোনীত করা উচিত। এই যোগাযোগের অর্থ দলটির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা বা তাদের রাজনৈতিক প্রকল্পকে স্বীকৃতি দেওয়া নয় এবং তা হওয়াও উচিত নয়। 

প্রাথমিক আলোচনাগুলো হওয়া উচিত পারস্পরিক আস্থা তৈরির ওপর জোর দিয়ে, যা বাস্তব সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে শরণার্থী প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। যেমন—সীমান্ত স্থিতিশীলতা, অনানুষ্ঠানিক আন্তসীমান্ত মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্য, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ। 

একই সঙ্গে ঢাকার উচিত শরণার্থীশিবিরের ভেতরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রাখাইন রাজ্যে অভিযান চালানো থেকে তাদরে নিবৃত্ত রাখা। এই পদক্ষেপগুলো একদিকে যেমন আন্তসীমান্ত অস্থিরতার ঝুঁকি কমাবে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির নেতৃত্বের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি করবে।

বিএনপি সরকার ইতিমধ্যেই ওই পথে এগোচ্ছে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ বাংলাদেশ এবং উত্তর রাখাইনের মধ্যে আধা-আনুষ্ঠানিক (সেমি-ফরমাল) বাণিজ্য সীমিত আকারে পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি সীমান্তের উভয় পাড়ের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। এটি মিয়ানমার সামরিক বাহিনী কর্তৃক রাখাইনের অভ্যন্তরীণ সীমান্তগুলোতে আরোপিত অবরোধের মধ্যে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। 

তবে ঢাকার উচিত হবে না আরাকান আর্মির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে সহযোগিতার পরিসর বাড়ানো। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং এই দলটির মধ্যকার সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। গত দুই বছরে আরও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, যাদের অনেকেই এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন। তাই আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত হবে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাধীনভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়া, সেবা ও জীবিকার অধিকার প্রদান এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও অন্যান্য নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি আদায়ে চাপ দেওয়া। 

রাখাইনে যুদ্ধ চলমান থাকা পর্যন্ত এই দ্বিমুখী কূটনীতি পরিচালনা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয় দেশের সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে আরাকান আর্মির সঙ্গে সহযোগিতা যথাসম্ভব বিচক্ষণতার সঙ্গে সামাল দেওয়া উচিত। ঢাকার উচিত বাংলাদেশি গবেষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাখাইনের সমকক্ষদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করার মাধ্যমে এই দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিসর আরও বাড়ানো। 

এই পদক্ষেপটি তথ্যের আদান-প্রদান বাড়াবে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সরকারি মাধ্যমের ওপর কম নির্ভরশীল করবে, পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করবে এবং সম্ভব হলে রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত আলোচনাগুলোতে যুক্ত করবে। 

রাজনৈতিকভাবে লোভনীয় হলেও ঢাকার উচিত হবে না তাড়াহুড়ো করে কোনো প্রত্যাবাসনের জন্য চাপ দেওয়া। একটি ব্যর্থ প্রত্যাবাসন উদ্যোগ ঢাকা, আরাকান আর্মি এবং স্বয়ং শরণার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করবে। যখন প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা সামনে এগোবে, তখন আলোচনার টেবিলে শরণার্থীশিবিরের রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাঁদের সম্মতি ছাড়া ভবিষ্যতের কোনো প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টাই টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কৌশল পরিবর্তনের জন্য সমর্থন গড়ে তোলা

এসব সংস্কার করতে গেলে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ, কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশ এবং সাধারণ জনগণের একাংশসহ বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিরোধ ও সমালোচনা আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। 

সমালোচকরা যুক্তি দিতে পারেন, শরণার্থীদের নিয়মতান্ত্রিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া, আরও টেকসই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার অনুমতি দেওয়া এবং বৃহত্তর নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে দেওয়া স্থানীয়দের জন্য ক্ষতিকর এবং এটি মূলত সুকৌশলে তাদের (বাংলাদেশের) সমাজে মিশে যেতে দেওয়ারই শামিল। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং উত্তর রাখাইনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ও বাণিজ্যের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিকে দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত একটি অরাষ্ট্রীয় পক্ষকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

এই ধরনের দাবি বা সমালোচনা মোকাবিলায় শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপনের প্রয়োজন হবে। এর মূল বার্তাটি হওয়া উচিত এমন—শরণার্থীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের নীতিগুলো, যেমন আরও ভালো শাসনব্যবস্থা, নিয়মতান্ত্রিক কর্মসংস্থান এবং গ্রহণযোগ্য সামাজিক নেতৃত্ব তৈরি করা মূলত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করার পরিবর্তে বরং রক্ষা করবে। 

সরকারের উচিত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার ক্ষেত্রে যে ঝুঁকিগুলো রয়েছে তাও স্পষ্ট করে তুলে ধরা; যার মধ্যে রয়েছে আরও বড় আকারের অবৈধ অর্থনীতি গড়ে ওঠা, আরও বেশিসংখ্যক শরণার্থীর অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করা এবং শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয়ের জন্যই সহিংসতা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়া। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে আরও ব্যাপক বোঝাপড়া তৈরি করতে কর্মকর্তাদের উচিত চিন্তন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করা। এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ারে পরিণত করা এড়াতে এবং সর্বদলীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন দলের উচিত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, যেমন—জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো দলগুলোর সঙ্গেও নিজ থেকে যোগাযোগ স্থাপন করা।

কক্সবাজারে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য ক্ষোভ বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া রুখে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া উচিত সরকারের। স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ার ঝুঁকিটি বাস্তব, তবে শরণার্থীদের আইনগতভাবে কাজ করা ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার পদক্ষেপের চেয়ে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার কারণেই এমনটা ঘটার সম্ভাবনা বেশি। সে যাই হোক, স্থানীয় অর্থনীতির বাইরেও কক্সবাজারের ওপর এই শরণার্থী সংকটের প্রভাব বিস্তৃত। বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বন উজাড় হচ্ছে, পানির সংকট তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় সেবা খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। 

স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে আরও ভূমিকা রাখতে হবে। এটি করার একটি উপায় হতে পারে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করতে আরাকান আর্মির সঙ্গে কাজ করা। এর পাশাপাশি মৎস্য আহরণ শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের ঝুঁকিও কমিয়ে আনা উচিত; কারণ মিয়ানমারের জলসীমায় অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে ইতিমধ্যেই এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি কয়েক শ বাংলাদেশি মৎস্যজীবীকে আটক করেছে।

পরিশেষে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে গুরুত্বের তালিকায় ওপরের দিকে রাখতে বাংলাদেশের উচিত তার বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করা। বিশ্বজুড়ে একের পর এক মানবিক সংকট তৈরি হতে থাকায় এই কাজটি করা একটি কঠিন লড়াই হতে পারে, তবে বিদেশি সহায়তা আরও কমে যাওয়া ঠেকানোর এটাই একমাত্র উপায়। রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী—উভয় পক্ষকে সহায়তার জন্য বহু বছর মেয়াদি প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে শরণার্থী কার্যক্রমের ব্যয় কমিয়ে আনার মতো সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সরকার যে প্রস্তুত, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বিএনপি সরকার এই সমর্থন আকর্ষণে সাহায্য করতে পারে। মানবিক সংস্থাগুলো ও দাতারা বহু বছর ধরেই এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছেন।

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি ঢেলে সাজানোর এবং সামনের দিনগুলোর জন্য আরও টেকসই একটি পথনকশা তৈরির ক্ষেত্রে আগামী মাসগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ। বিশেষ করে মিয়ানমারে যখন গৃহযুদ্ধ চলছে এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন অধরা রয়ে গেছে, তখন সহজ কোনো সমাধান খোঁজা অলীক কল্পনা। তবে এটি নীতিগতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার কোনো অজুহাত হতে পারে না। 

শরণার্থীদের কর্মসংস্থান নিয়মতান্ত্রিক করা, শিবিরের শাসনব্যবস্থা ও নিরাপত্তা উন্নত করা, গ্রহণযোগ্য রোহিঙ্গা বেসামরিক নেতৃত্বকে ক্ষমতাবান করা এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে বিচক্ষণ সম্পর্ক আরও গভীর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন একদিকে তার সামনের ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকেও বাঁচিয়ে রাখতে পারে।


টমাস কিয়ান

মিয়ানমার ও বাংলাদেশ বিষয়ক সিনিয়র পরামর্শক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম