পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দলদাস না ক্ষমতাদাস?

  সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৪১ | অনলাইন সংস্করণ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি গণমাধ্যমে আলোচিত বিষয়সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলী ‘দলদাস’ এ পরিণত হয়েছেন। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাই এ অভিযোগটি বেশি করে থাকেন।

বিশেষ করে শিক্ষকদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কথাটি বারবার উঠে আসে। আসলেই কি ‘দলদাস’ ও ‘রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি’ এ দুটো বিশেষ পরিভাষা দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করা যায়?

বাংলাদেশের পেশাজীবী সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে বাকি কোনো সম্প্রদায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো এতটা বিভক্ত নন। এ বিভক্তির কারণ অনুসন্ধান করলে লেখাটির শিরোনামের ব্যবচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

এদেশের চালু ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৫টির উপাচার্য,উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে যারা আছেন তাদের মাঝে গুটিকতক প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা তাদের ধ্যানজ্ঞান-মতাদর্শ নিজেরা ধারণ করেন।

কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রকৃত অর্থে উপাচার্যদের ‘দলদাস’ হওয়ার সুযোগ নেই। বরং উপাচার্য পদটিকে ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করেন। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিকে দলীয় আনুগত্য হিসেবে চালানো যায় না। ব্যক্তিগত জীবনে উপাচার্য কোনো না কোনো রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করতেই পারেন। বাকিরা তবে কীভাবে নির্বাচিত হলেন?

পেরিফেরির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসন চালনায় দক্ষ হোমগ্রোন প্রফেসর বা সিনিয়র শিক্ষক না থাকায় সরকার প্রথম দিককার চারটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন আসে তারা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দলবাজি অর্থাৎ নিয়োগদান করা সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন নাকি নিজেদের আশীর্বাদপুষ্ট বলয় সৃষ্টি করেন? সরকার বা বিরোধীদল পন্থী কথিত ‘দলদাস’ অনেক শিক্ষক আছেন যারা কিন্তু উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যের দাস হতে পারেন না। বরং উপাযার্য অন্যায় করলে তারা এর সঙ্গে আপস না করে বিরোধী অবস্থানে চলে যান। সুতরাং এক্ষেত্রে এক দাগের সাধারণীকরণ নীতি খাটছে না।

‘দলদাস’ এবং 'ক্ষমতা বা চেয়ারের দাস' ভিন্ন অর্থবহন করে। ‘দলদাস’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু শিক্ষক সুকৌশলে নিজেদের সব দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন। এসব শিক্ষকই সব সরকার ও উপাচার্যের সময় ‘ক্ষমতাদাস’ হয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলদাস চেয়ে ক্ষমতাদাসদের দাপট বহুলাংশে বেশি। এখানে ক্ষমতা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যস্তরীণ প্রশাসনিক ক্ষমতা বুঝানো হয়েছে। শিক্ষকরা নিজস্বার্থে তার রাজনৈতিক ভাবনার বিপরীতে গিয়ে ক্ষমতার সঙ্গে আপস করেন এমন নজির বা অভিযোগ বর্তমান বাংলাদেশে নেহায়েতই কম নয়।

শিক্ষকরা যে কোনো রাজনৈতিক ধ্যানধারণা লালন করতেই পারেন এটি নাগরিক অধিকার। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পঠন,পাঠন ও গবেষণার প্রয়োজনে রাজনৈতিক সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়ে। তাদের গবেষণাক্ষেত্র বা এর ফলাফলের অংশীজনদের ভালো খারাপের কথা বলতে গিয়ে যে কোনো জননীতির গঠনমূলক প্রশংসা বা নিন্দা করতেই পারেন। এসব প্রতিটি শিক্ষকের মুক্তবুদ্ধি চর্চার অধিকার।

দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের বড় পার্থক্যটাই হচ্ছে এখানকার ছাত্র-শিক্ষক বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অধিক রাজনৈতিক সচেতন ও মতপ্রকাশে সচেষ্ট হবেন।

তবে বহু শিক্ষক ক্ষমতাবলয়ের দাসত্ব বরণ করে নেন যেক্ষেত্রে তাদের দলীয় মতাদর্শ গৌণ হয়ে যায়। এদের দলান্ধ নয় বরং স্বার্থান্ধ বলা চলে। ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রয়াসে যখন এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের তল্পিবাহকে পরিণত হন, তখন তাকে ‘দলদাস’ না বলে ‘ক্ষমতাদাস’ বলা চলে।

আমরা যখন ‘ক্ষমতাদাস’কে ‘দলদাস’ বলি তখন এতে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রয়াস থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এরা বাধা হয়ে দাঁড়ান।

ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করবার প্রয়াসে তারা একাডেমিক কাজে সময় দেয়ার চেয়ে উপাচার্যের ভাঁড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকেন। অনেক মেধাবী এমনকি পান্ডিত্যের ঘাটতি নেই, এমন শিক্ষককেও দেখা যায় ক্ষমতার কাছে নিজেকে সপে দিতে। তারা এক আত্মপ্রতারণার শিকার হন এইভেবে যে, উপাচার্যের দাসত্ব করলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের দাসত্ব করা হয়, তবে সেটি অন্যায় হবে কেন?

কিন্তু এ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তিনি যে নিজের মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিলেন তা আমলে নেন না। বরং সবার কাছে প্রচার করেন এসব অন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কাল্পনিক এ নিয়মের দোহাই দিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে নিজের অপরাধের দায়মুক্তি ঘটাতে চান। কিন্তু অনিয়ম কখনোই নিয়ম হতে পারে না। একজন শিক্ষকের দাস মনোভাব সৃষ্টি হওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য নব্বই দশকের প্রথম দিক থেকে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত সংস্কৃতি সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যকে এত বেশি ক্ষমতা দেয়া আছে যে, তিনি চাইলেই শর্ত সাপেক্ষে যে কাউকে অনেক সুবিধা দিতে পারেন।

উপাচার্যের যদি এ সুবিধা দেয়ার বিশেষ ক্ষমতা দেয়া না থাকতো তাহলে একজন শিক্ষক নিজের নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে তার দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হতেন না। সরকার উপাচার্যগণকে যে লক্ষ্যে নিয়োগ করেন সে লক্ষ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপাচার্যরা স্থির থাকেন না। কোনো সরকারই নিশ্চয় কোনো উপাচার্যকে এ জন্য নিয়োগ দেন না যে তিনি তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবেন। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করবেন।

গত দশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সবসময়ই চেয়েছেন দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাধাহীনভাবে ন্যায়সঙ্গত পথে চলুক।

কার্যত দেখা যায়, কিছু উপাচার্য দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর কিছু শিক্ষক নিয়ে নিজস্ব ক্ষমতারবলয়ের সৃষ্টি করেন যা তাদের যে কোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। এ ক্ষমতার বলয় সৃষ্টির সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন প্রশাসনিক দ্বায়িত্ব প্রাপ্তির সুযোগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণর সুযোগ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার বাসনা।

শিক্ষক সমিতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রথমদিকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলেও বা নেয়ার চেষ্টা করলেও কার্যকাল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্যপন্থী শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

অপরদিকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে কিছু শিক্ষক উপাচার্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করতে করতে পালটা মেরুত অবস্থান নেন। এ দু-মেরুর মাঝের দ্বন্দ একসময় চরম আকার ধারণ করে।

এ দ্বন্দ্বে উভয়পক্ষ একে অপরকে ঘায়েল করতে আশেপাশের সব অনুষঙ্গকে করায়ত্তে আনার চেষ্টা চালিয়ে যান। এসব অনুষঙ্গ রাজনৈতিক আদর্শই হোক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোই হোক কিংবা বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীই হোক। মোটাদাগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় যার ফলাফল ভোগ করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়পক্ষই।

জাতি গঠনের এ কারিগররা কিছু মৌলিক মূল্যবোধের প্রশ্নে দৃঢ় থাকলে এ অস্বস্তিকর অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এ কথা সত্য। এর মানে এই নয় যে দলদাসত্বের জন্যে দায়ী। বরং ক্ষমতার দাসত্ব ভাবমূর্তির এ নিম্নগামিতার মূল কারণ।

লেখক: সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী, শিক্ষক- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×