ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২৪-এর জুলাই এদেশের চিরসংগ্রামী জনতার মুক্তিসংগ্রামে যুক্ত করেছিল আরেকটি গৌরবময় অধ্যায়। প্রতিবেশী সম্প্রসারণবাদী শক্তির সমর্থনে বলীয়ান হয়ে দেশবাসীর ঘাড়ের ওপর সিন্দাবাদের দেওয়ের মতো সওয়ার হয়ে বসা নির্দয় এক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে যেভাবে ৩৬ দিনের এক ঝটিকা অভিযানে এদেশের মানুষ হার মানতে বাধ্য করেছিল তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।
তবে, তাদের রক্তের দামে কিনতে হয়েছিল এই মুক্তি। দেশ মাতৃকাকে আধিপত্যবাদী শক্তির সেই নিষ্ঠুর ক্রীড়নকের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এদেশের তরুণরা যেভাবে নিশ্চিত মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে বুলেটের মুখে পাহাড়ের মতো অবিচল হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, তা ব্যতিরেকে এ হার্মাদদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা আক্ষরিকভাবেই অসম্ভব ছিল।
কোমলে কঠোরে মেশানো এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো কখনো চরমপন্থাকে নিজেদের কর্মপন্থা হিসাবে বেছে নেয়নি। কিন্তু, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তারা যেভাবে বারবার আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে তা তাদের কারও কাছে মাথা না নোয়ানোর এক সহজাত অদম্য স্পৃহারই স্বাক্ষর বহন করে। এজন্য খুব বেশি পেছনে যাওয়া লাগবে না। ৪৭, ৫২, ৬৯, ৭১, ৭৫, ৯০ এবং সর্বশেষ ২৪- সাম্প্রতিক ইতিহাসের সাড়া জাগানো এ বাঁকগুলোর দিকে খানিকটা অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি দিলেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে, এদেশের মানুষ কখনোই অন্যায়-জুলুমের সঙ্গে আপস করেনি।
তবে, মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার পোড়ামাটি নীতিকে অগ্রাহ্য করে ২৪-এর জুলাইয়ে জুলুমবাজ ফ্যাসিস্ট শক্তির সর্বগ্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে দেশের আনাচে-কানাচে যে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠে, যা ফ্যাসিবাদী শক্তির আস্ফালনকে চুরমার করে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, সেটা সম্ভবত এদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সিলসিলায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে মানুষ বিশ্বের আনাচে কানাচে স্বৈরশাসক এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বেশকিছু শক্তিশালী গণজাগরণ দেখেছে। এর মধ্যে ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত যে গণ-বিক্ষোভ ২০১০ সালে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়ে মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই গণ-বিক্ষোভের তোড়ে আরব বিশ্বের এসব দেশে দীর্ঘদিনের ক্ষমতা কাঠামো তছনছ হয়ে যায়। কাছের অতীতে দক্ষিণ এশিয়ার দুটো প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকা ও নেপালেও আমরা গণমানুষের শক্তিশালী জাগরণ দেখেছি। দেশে দেশে এভাবে গণমানুষের জাগরণ থেকে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছিল, বাংলাদেশেও যে কোনো মুহূর্তে গণবিস্ফোরণ ঘটতে পারে। অবশেষে ২৪-এর জুলাইয়ে সেই সম্ভাবনাই বাস্তবে রূপ নেয়। তবে, ব্যতিক্রমীভাবে বাংলাদেশে এ গণবিদ্রোহ এমন শক্তিশালী রূপ পরিগ্রহ করে যে, ক্ষমতাসীন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী- এমনকি তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মিডিয়া অঙ্গনের সুহৃদরা পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে কিংবা লোকচক্ষুর অন্তরালে আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়। এদেশে ইতঃপূর্বে আর কোনো গণ-আন্দোলনে ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃশ্যপটের অবতারণা হতে দেখা যায়নি।
প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের মতো একটি গণভিত্তিক দল, যার নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয় তার এরকম করুণ পরিণতি হলো কেন? শেখ হাসিনার সরকার প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবখানে নিজেদের একান্ত অনুগত লোকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যে কোনো ধরনের বিরোধিতা ও বিরোধী মতকে কঠোর হাতে দমন করে। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪৮ দিনের মাথায় পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের নামে এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সারির প্রায় সব নেতাকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’য়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের কওমি ধারার আলেম-ওলামাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মোদির আগমনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এদের ওপর আরেক দফা চণ্ডনীতি চালিয়ে বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ইসলামপন্থিদের দমনের জন্য একের পর এক জঙ্গি নাটক সাজিয়ে অনেক নিরপরাধ তরুণ-যুবককে হত্যা করা হয়। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে বেগম খালেদা জিয়াকে প্রথমে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং পরে কারারুদ্ধ করে যথাযথ চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের জেল-জুলুম ও গুম-খুনের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে রীতিমতো দৌড়ের ওপর রাখা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে বিরোধী মতের শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়মিত নিগ্রহ চালিয়ে তাদের শিক্ষা জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হয়। এভাবে সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ এবং বিরোধী মত দমনে নির্যাতনের স্টিম-রোলার চালিয়ে পতিত ফ্যাসিজম আশা করেছিল, এদেশের ক্ষমতায় তাদের একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হয়ে গেছে। কিন্তু, ফল হয়েছে উলটো। মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের যখন বিস্ফোরণ হলো, তখন তাদের সব ধরনের কৌশল ব্যর্থ তো হলোই, সব জায়গা থেকে তারা পুরোপুরি উচ্ছেদ হয়ে গেল।
আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভের পথে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মানসিকতার পাশাপাশি বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ একটি বড় বাধা হিসাবে কাজ করে। ভিনদেশি এসব সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তি নিজ নিজ স্বার্থে আমাদের মতো তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশগুলো জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তি কিংবা সামরিক একনায়কদের ক্ষমতায় আনে। দেশে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের নামে যে সেনা-সমর্থিত সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠান হয়, সেটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিএনপির কিছু ভুল পলিসি এবং তৎকালীন সেনা নেতৃত্বের উচ্চাভিলাষকে পুঁজি করে পশ্চিমা বলয় ঘটিয়েছিল বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।
পরে ওই সময়ের ক্ষমতাসীনদের চাওয়া-পাওয়া প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়া অনমনীয় অবস্থান নেওয়ায় ষড়যন্ত্রের মূল হোতারা ভারতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ উপরোল্লেখিত বিভিন্ন কায়দাকানুনের মাধ্যমে দেশের সব সেক্টরে তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করে। একটি পর্যায়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বলয়ের প্রধান অংশ এক্ষেত্রে কিছুটা অবস্থান পরিবর্তন করলেও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সরকারের অন্ধ সমর্থনের কারণে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এসব কারণে এদেশের গণমানুষের মনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ফ্যাসিজম এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।
যখনই সুযোগ এসেছে, মানুষ ফ্যাসিস্ট সরকারের নিগড় থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছে, ভারতীয় আধিপত্যবাদের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছে। এ কারণেই, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে যখন আলেম-ওলামারা জমায়েত করে, দেশের মানুষ তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। একইভাবে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ সব অ্যাস্টাবলিশমেন্ট বিরোধী আন্দোলন এদেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করে। কিন্তু, পতিত ফ্যাসিজমের সর্বব্যাপী কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও নির্দয় দমনপীড়নের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনগুলো চূড়ান্ত পরিণতি লাভে সক্ষম হচ্ছিল না। অবশেষে ২৪-এর জুলাইয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সমুপস্থিত হয়, যখন পতিত ফ্যাসিজম আন্দোলন দমনে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করার ফলে আবু সাঈদ ও মুগ্ধের মতো নিরস্ত্র তরুণরা শাহাদতবরণ করে। এর ফলে আন্দোলন দাবানলের মতো প্রথমে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এবং পরবর্তীতে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। নির্বিচারে গুলি, ব্লক রেইড এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে হত্যার মতো নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকার এখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু, এবারে আর শেষ রক্ষা হয়নি। ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতা ছাড়তে ত বটেই, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ আন্দোলনে ১৪০০ প্লাস মানুষ শহীদ হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ তথা ১৫০ জনের অধিক ছিল শিশু। এর বাইরেও প্রায় বিশ হাজার মানুষ আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছে, প্রায় ৫৮৭ জন বিকলাঙ্গ হয়েছে, এমনকি অনেকে তাদের চোখ হারিয়েছে।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৫০৪ জনের বেশি আন্দোলনকারী চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১১ জন চিরতরে দু-চোখের এবং ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। প্রসঙ্গত ওই সময় ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ বাহিনী এবং দলীয় লোকজনের হাতে সংঘটিত দু-চারটে নিষ্ঠুর ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৫ জুলাই রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও উপাচার্যের বাসভবনে আশ্রয় নেওয়া লোকজনের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সাংবাদিকসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার লুৎফুল এলাহী শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। এ হামলায় তিনি তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের রাবার বুলেটে মেহেদী মামুনসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। ১৮ জুলাই ব্যাংক কলোনি এলাকায় এমআইএসটি শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনকে গুলি করার পর পুলিশ তাকে এপিসিতে তুলে নেয়, পরে চলন্ত যান থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে নিচে রাস্তায় ফেলে দেয়। এরপর, রোড ডিভাইডারের ওপারে তার মৃতপ্রায় দেহ ঠেলে ফেলে রেখে চলে যায়।
আরেকটি হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে আশুলিয়া এলাকায়। ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে পুলিশের গুলিতে ৫ জন তরুণ নিহত ও ১ জন আহত হন। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের একটি পুলিশ ভ্যানে তোলার পর পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
প্রশ্ন হলো, এত ত্যাগ ও রক্তক্ষয় মানুষকে কী দিল? শুধু ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আর ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই কি মানুষ এত রক্ত দিয়েছে? সন্দেহ নেই, প্রাথমিক লক্ষ্য এগুলোই ছিল এবং এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু, পতিত ফ্যাসিজমের দেড় দশকের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং লুটপাটের কারণে মানুষের মনে এ প্রত্যাশা তৈরি হয়, দেশে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার এরকম ফ্যাসিস্ট হয়ে না উঠতে পারে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ যেন ফের ফিরে না আসতে পারে। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা তাদের মিছিল মিটিংয়ে যেসব স্লোগান উচ্চারণ করে এবং দেওয়ালে দেওয়ালে যেসব গ্রাফিতি আঁকে, সেগুলোর দিকে একবার নজর বুলালেই আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, আরও অনেক বড় লক্ষ্য তথা নতুন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ও প্রত্যয় এর পেছনে সক্রিয় ছিল।
জুলাই আন্দোলনের সফল পরিণতিতে দেশে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তার ওপর তাৎক্ষণিকভাবে দুটো দায়িত্ব অর্পিত হয়; এক, আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছে তাদের পরিবার পরিজনকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, আর যারা আহত হয়েছে তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা ও পুনর্বাসন, দুই, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা।
এর বাইরে আরও যেসব দায়িত্ব এ আন্দোলনের চাওয়া-পাওয়া হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের ঘাড়ে চাপে তা হলো: আন্দোলনে যে নির্মম নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং এর আগে ফ্যাসিস্ট সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ডসহ যেসব গুম-খুন হয়েছে সেগুলোর যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা করা, দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে এটাকে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার শহীদদের পরিবার-পরিজনকে আর্থিক সাহায্য প্রদান ও আহতদের সুচিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
তবে, এখনো কিছু আহত ব্যক্তি পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি কিংবা তাদের আরও সাহায্য প্রয়োজন বলে মাঝে-মধ্যেই অভিযোগ আসে। জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের সাহাযার্থে জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়, তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অর্থাভাবে যথাযথ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তার সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং ইতোমধ্যে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধানের মৃত্যুদণ্ডসহ কিছু বিচারিক রায়ও এসেছে। গুমের তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করে দায়ীদের বিচারের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, অনেকেই মনে করেন, এসব বিচারের গতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়, যা দীর্ঘ তদন্তের পর তার রিপোর্ট প্রদান করে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত এটার আলোকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একটি কমিশন গঠনের দাবি ছিল। তদনুযায়ী কোনো কমিশন গঠন না করা হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তদন্ত সংস্থা ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়েরের মাধ্যমে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করে।
সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, বিগত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এ ঘটনাকে সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ‘জেনোসাইড’ বা ‘গণহত্যা’ হিসাবে অভিহিত করে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করেন, যা ট্রাইব্যুনাল আমলে নিয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন একটি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। নির্বাচনে ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে গণনার ক্ষেত্রে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ এসেছে। তবে, পরাজিত পক্ষ কিছু আসনের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নিলেও সামগ্রিকভাবে ফলাফল মেনে নিয়েছে।
গোল বেঁধেছে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত উদ্যোগ নিয়ে। প্রফেসর ইউনূসের সরকার ছাত্র-জনতার জোরালো দাবির মুখে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জুলাই সনদ নামে একটি চার্টার প্রণয়ন করে। এটাকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যার ভিত্তিতে গঠিত একটি সংস্কার পরিষদ জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথা। কিন্তু, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ পক্ষে ভোট পড়া সত্ত্বেও নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি সরকার নানা অজুহাত খাড়া করে তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা বেশ কিছু মৌলিক সংস্কার বিষয়ক অধ্যাদেশ বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদে অনুমোদন করেনি, যার মধ্যে রয়েছে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শক্তিশালীকরণ অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কারবিষয়ক আলোচনায় প্রায়শ বিএনপিকে একটি রক্ষণশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে। কাজেই, আজকে বিএনপি সরকার সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ব্যাপারে যে ভূমিকা নিয়েছে তেমন কিছু ঘটতে পারে সে আশঙ্কা বরাবরই ছিল।
প্রশ্ন হলো, এটাকে বিবেচনায় না নিয়ে জামায়াতসহ বেশ কিছু দলের দাবি উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার কেন একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিল? সংস্কার প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার জাতীয় নাগরিক পার্টিও কেন আগে গণভোট অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হলো? উপরন্তু, জামায়াতসহ যেসব দল আগে গণভোট অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছিল তারাই বা কেন চাপপ্রয়োগ অব্যাহত রাখল না?
এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো একদিন পাওয়া যাবে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা ত হয়েই গেল। এখন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন চলছে। যদিও বিএনপি সরকার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে বলেছে, বিএনপি সহজে গণভোটের রায় যেভাবে এসেছে জুলাই সনদ সেভাবে বাস্তবায়নের পথে হাঁটবে কিনা বলা মুশকিল। তার মানে, যে দাবিটা জুলাই আন্দোলন সামনে নিয়ে এসেছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকার আরেকটু সিরিয়াস ও দূরদর্শী হলে তাদের সময়কালেই বাস্তবায়ন করে যেতে পারত, সেটা আদায়ের জন্য নতুন করে আরেকটি যুদ্ধ শুরু হলো। তবে, এটা দেশের জন্য ত বটেই, বিএনপির জন্যও নিশ্চয়ই ভালো কোনো ফল বয়ে আনবে না। বিএনপি ৯০-এর দশকে এবং পরবর্তীকালে ২০০১-২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে যে ভূমিকা নিয়েছিল সেটা তাদের জন্য কী পরিণতি বয়ে এনেছিল তা নিশ্চয়ই তারা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়নি।
ভারতের আশ্রয়ে থাকা পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের কর্ণধার শেখ হাসিনা এখন ওপার থেকে মাঝে-মধ্যেই নানা হুমকি-ধামকি দিয়ে চলেছে এবং আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মিডিয়ায় সক্রিয় ফ্যাসিবাদের দোসররা ফের গাঝাড়া দিয়ে উঠছে এবং পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে ফিরিয়ে আনার পক্ষে বয়ান তৈরির জন্য জোরালো তৎপরতা শুরু করেছে। এসব আঁচ করেই সম্ভবত সরকার সম্প্রতি ফ্যাসিবাদের সর্বশেষ দৃশ্যমান আইকন মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
আমরা আশা করব, সরকার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে গণভোট ও জুলাই সনদের আলোকে দ্রুত রাষ্ট্র সংস্কারের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। নচেৎ, বিরোধী দলগুলো এ দাবি বাস্তবায়নের জন্য রাজপথকে একমাত্র বিকল্প হিসাবে বেছে নিলে জাতীয় ঐক্যে ফাটল তৈরি হবে, যার ফাঁক দিয়ে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি ফিরে আসার পথ খুঁজে নেবে। এটা সরকারের জন্য তো বটেই, দেশের জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন : অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
