শুকুর আলহামদুলিল্লাহ

  মুঈদ রহমান ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:০১ | অনলাইন সংস্করণ

মুঈদ রহমান

১২ ফেব্রুয়ারির দৈনিক প্রথম আলোর লিড নিউজ ছিলো, ‘বিএনপির সঙ্গে আর থাকছে না জামায়াত’। একটু অবাকই হলাম! বেশ কিছুদিন ধরে শুনে আসছিলাম জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির দেহে ক্ষত ধরেছে তাই জামায়াতকে ত্যাগ করা বা পরিহার করা বাঞ্ছণীয় হয়ে উঠেছে। এখন শুনছি জামাতই বিএনপিকে ছেড়ে যাচ্ছে।

একটা গল্পের কথা মনে হলো। এক ডাক সাইটে উকিল আদালতে বিচার চেয়েছেন এই অভিযোগে যে এক রিকশাওয়ালা তাকে চড় মেরেছে। বিচারক একটু অবাকই হলেন।

বিচারক বললেন, আপনার মতো ডাক সাইটে উকিলকে রিকশাওয়ালা চড় মারার সাহস পেল? জবাবে উকিল সাহেব বললেন, না মানে আমিই ওকে চড় মারার জন্যে গালের কাছে তিন-চারবার হাত নিয়েছিলাম কিন্তু কোন ধারায় মামলা হতে পারে তা ভাবতে ভাবতে মারা হয়নি। এর মধ্যে রিকশাওয়ালা বিরক্ত হয়ে উল্টো আমাকেই মেরে দিল। বিএনপির দশাও মনে হয় তাই হয়েছে।

কীভাবে জামায়াতকে আলাদা করা যায় তা ভাবতে ভাবতে জামায়াতই উল্টো বলে দিল- তোমার সঙ্গে আর ঘর করবো না। ১৩ বছর আগে ২০০৬ সালে শায়খুল হাদিসের দল খেলাফত মজলিস খালেদা জিয়ার জোট থেকে বেরিয়ে যায়। ২০১৬ সালে প্রয়াত মুফতি আমিনির ইসলামী ঐক্যজোটও বিএনপির ঘর ছাড়ে।

জামায়াত মনে করে যে বিএনপির সঙ্গে জোট করার ফলে দলটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়েছে। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে কোনঠাসা করে ফেলেছে। বড় বড় নেতাদের দ্বিধাহীনভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। বিএনপি তার বিপরীতে জামায়াতকে সুরক্ষা দিতে পারেনি।

জামায়াতের এই উপলব্ধির কারণও আছে। কেননা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত কেয়ার টেকার সরকারের দাবিতে বিএনপির বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছিলো। সে সময়ে আওয়ামী লীগের মুখ থেকে ‘স্বাধীনতা বিরোধী’ বিলাপ খুব একটা শুনতে পাইনি।

তার আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী আশীর্বাদ নিতে জামায়াতের আমির গোলাম আযমের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এসব বিবেচনা করেই হয়তো জামায়াতের এই উপসংহার। কিন্তু জামায়াতকে মনে রাখতে হবে যে ২০০১ সালে বিএনপির কারণেই জামায়াত তৎকালীন মন্ত্রিসভায় স্থান পায়। স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর সুযোগ এই বিএনপিই করে দিয়েছিল।

এখনো আওয়ামীবিরোধী এমন অনেকেই আছেন যারা বিএনপিকে পছন্দ করেন না, একমাত্র জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে। খোদ বিএনপিতেই অসন্তোষ জন্ম নিয়েছে।

এর প্রমাণ হলো উল্লেখিত সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন,‘ জামায়াত বেরিয়ে গেলে খুশি হব আমরা। বিএনপিরও উচিৎ হবে না আর জামায়াতকে জোটে যুক্ত রাখা। কারণ, এ মুহুর্তে জামায়াতকে সঙ্গে রাখা লাভজনক নয়, বরং দায় হয়ে গেছে।’

সুতরাং বিএনপির লোকসানটাও কম না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমানের প্রতিক্রিয়া হলো, ‘জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী দল। তাদের জোটে রাখাটা আমি কখনো পছন্দ করিনি, একথা সব সময় বলে আসছি। এখন যদি তারা বেরিয়ে যায়, সেটা তাদের ইচ্ছা। তবে আমি বলব, বিএনপি তাদের আশ্রয় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।’

বাংলাদেশে জামায়াত একটি মৌলবাদী দল হিসেবে আখ্যায়িত হলেও চরিত্রগত দিক দিয়ে দলটি আলজিরিয়া, মিশর, ইরান, সিরিয়া প্রভৃতি দেশগুলোর ইসলামী দলগুলোর চেয়ে ভিন্ন। সে সব দেশের দলগুলোর বাস্তবতা-কৌশল নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে ব্যাক্তিগতভাবে আর্থিক লাভালাভের বিষয় একেবারেই নেই।

‘কিন্তু এখনকার জামাত নেতারা কেউ ব্যাংক ডিরেক্টর, হাসপাতালের ডিরেক্টর, সংবাদপত্রের মালিক অথবা এ ধরনের কোনো দৃশ্য মালিকানা না থাকলেও কোনো বিদেশি অর্থ পাইপ লাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের মধ্যে আবার যারা অর্ধশিক্ষিত অথবা প্রায় শিক্ষাহীন তারা ফি নিয়ে ওয়াজ অথবা ধর্ম প্রচারের কাজ করে থাকে।’(বদরুদ্দীন উমর; ‘ধর্ম রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা’; পৃষ্ঠা: ১৩৯)।

সুতরাং দলটি ইসলাম ধর্মের নামে চললেও, ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামের যে একটি সরলতা আছে তার চর্চা থেকে ষোল আনা তিরোহিত। জাগতিক লোভ লালসা, ক্ষমতার দাম্ভিকতা ইত্যাদি বিষয়ে নির্মোহ নয়।

আবুল বারকাত লিখেছেন, ‘আমার ২০১৬ সালের হিসাবে বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা আনুমানিক ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা (৪০ কোটি মার্কিন ডলার; যেখানে ২০১৬ সালের শেষদিকের বিনিময় হার ধরা হয়েছে ১ ডলার = ৭৯ টাকা)।’( মৌলবাদের অর্থনীতি; পৃষ্ঠা: ১৩৮)।

স্বাভাবিকভাবেই চলমান বুর্জোয়া ব্যবস্থার শোষণ-শাসন ও আর্থিক সুবিধাদির ব্যত্যয় ঘটলে সে আর তার সঙ্গে নেই। তার কাছে খালেদা জিয়া আর শেখ হাসিনা বিষয় না, বিষয় হলো দলটির আর্থিক যে সংহতি তা কার দ্বারা অধিকতর সুরক্ষিত হবে। এখানে ধর্মের কথা ছেলেভোলানো ছাড়া আর কিছু নয়।

বিএনপি জামায়াতের হাত ধরে ভুল পথে হেঁটেছে, ভোটের আশায়। কারণ গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে আমরা জানি এবং মানি যে, নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার পরিবর্তন করা যায়। ‘তবে কোনো একটি সরকার নির্বাচনের পথ ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলেই যে দেশে গণতন্ত্র এসে যাবে এমনও বলবার উপায় নেই। কেননা গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার, এবং সেই অধিকার প্রয়োগ করে সার্বিক পরিস্থিতির উপর মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ উন্নত জীবন সম্ভব করে তোলা।’(সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী; ‘গণতন্ত্রের অভিমুখে’; পৃষ্ঠা: ৭)।

তারপরও প্রাথমিক শর্ত হিসেবে আমরা নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দিই। সেই গুরুত্বকে মাথায় রেখেই বিএনপির জামায়াতের সাথী হওয়া। বিএনপি ভুলে গিয়েছিলো যে এটি ৩০ লাখ শহীদের দেশ। এদেশে যুদ্ধাপরাধী নিয়ে রাজনীতি করা শুধু ভুলই না অপরাধও।

এর ফলটা যা হয়েছে বিএনপিতে সাংস্কৃতিক সংকট দেখা দিয়েছে। নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী করেনি কিন্তু চেতনা ধারনও করেনি, প্রয়োজনও মনে করেনি। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, বসন্ত উৎসব, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি দিনগুলোতে তাদের অংশগ্রহন থাকে অনেকটাই দায়সারা, প্রথাগত এবং মলিন।

‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান আমাদের সারা শরীর জুড়ে যে শিহরণ -আলোড়ন তৈরি করে তা তাদের করে না। আমি সবার কথা বলছি না, তবে বেশিরভাগই। এমনটা ছিল না।

বিএনপির অঙ্গ-সংগঠন জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক দল (জাসাস)-এর লোকমান হোসেন ফকির এক সময় গান লিখেছেন, ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা, অঘ্রাণে নবান্নের উৎসবে।’ অথচ বর্তমানে বিএনপি নবান্নের গন্ধের পুরোটাই হারাতে বসেছে। এটা হয়েছে দীর্ঘদিন জামায়াতের সঙ্গে মেলামেশা করার কারণে, সঙ্গদোষে।

জিয়াউর রহমানের ‘আই উইল মেক পলিটিকস ডিফিকাল্ট’-এর খপ্পড়ে বিএনপি নিজেই পড়েছে। এর থেকে বের হওয়ার একটা সৎ চিন্তা তাদের জন্যে অনিবার্য। নতুনভাবে রাজনীতি শুরু করতে হবে।

৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন সর্ম্পকে জানতে চাইলে দুটি জবাব পাওয়া যাবে। একটি হলো নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ হয়েছে। এমনটাই যদি হয় তাহলে বলতে হবে বিএনপিকে সাধারণ মানুষ প্রত্যাখান করেছে। তাহলে তার কারণগুলো কী, কীভাবেই বা দূর করে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া যায় তার একটা চেষ্টা থাকতে হবে। সেখানে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গটি অবশ্যই আসবে।

বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন বিষয়ে দ্বিতীয় জবাবটি আসতে পারে যে, নির্বাচন মোটেই ‘সুষ্ঠু’ হয়নি, তা ছিলো জবরদস্তিতে ঠাসা। তাই যদি হয় সেক্ষত্রেও বলতে হবে যে ‘কোনো অরাজকতা’ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করার মতো অবস্থা তার নেই। কেন নেই?

অতীতের কর্মকান্ডই কি বিএনপির প্রতি জনগণের আগ্রহ কিংবা সক্রিয় সমর্থন আদায়ে অসমর্থ হয়েছে? সেখানেও জামায়াতপ্রীতির কথা আসবে। সুতরাং বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে জামায়াতকে অবশ্যই প্রত্যাখান করতে হবে কেননা জামায়াতকে এদেশের মানুষ প্রত্যাখান করেছে আজ থেকে ৪৮ বছর আগে ১৯৭১-এ। বেলা অনেকখানি গড়িয়ে গেলেও জামায়াতের বিচ্ছেদ-বাসনাকে বিএনপির বলা উচিৎ- শুকুর আল হামদুলিল্লাহ। সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

মুঈদ রহমান: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন
--
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×