দেশটা কি তবে শুধুই পরিবহন শ্রমিকদের?

  ফুয়াদ খন্দকার ২০ মার্চ ২০১৯, ১৯:০২ | অনলাইন সংস্করণ

দেশটা কি তবে শুধুই পরিবহন শ্রমিকদের?
রাজধানীর গণপরিবহনের ছবি। যুগান্তর

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকের কথা। বইমেলা শেষ করে শাহবাগ থেকে গুলিস্তানের একটি বাসে উঠলাম। রাত প্রায় ৯টা বাজে। সিট পেলাম একদম শেষের দিকে। বসে বসে মোবাইলে নেট চালাচ্ছিলাম হঠাৎ হেল্পারের কথা শুনে ফিরে তাকালাম। জনৈক এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা-কাটাকাটি করছে হেলপার। এটা খুবই সাধারণ ঘটনা।

আমাদের দেশে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়ার পরেও এই ভাড়া নিয়ে সমস্যা কোনোদিনই দূর হবে না। এদিকে বাস প্রায় গুলিস্তানের কাছাকাছি চলে এসেছে। হঠাৎ হেলপারের আচরণ পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেল।

সবার সামনে সেই ভদ্রলোককে বলল 'দেহেন ভাই আমার লগে ঝামেলা কইরেন না। আমরা পরিবহনের লোক। খুব খারাপ। পরে কিন্তু এমনেই পস্তাইবেন।' শুনে আমরা বাকিরা একদম হা হয়ে গেলাম। এই রকম প্রকাশ্যে একজন সাধারণ যাত্রীকে হুমকি দিতে পারে তা আমার ধারণাতেও ছিল না। আসলে তাদের স্ট্যান্ডে আসার কারণেই যে তাদের এত দৌরাত্ম্য তা বোঝার বাকি রইল না।

এ ধরনের ঘটনাগুলো আজকাল আমাদের দেশের একটা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কপথে পরিবহন শ্রমিকদের প্রভাব যেন দিনকে দিন বেড়েই চলছে। তাদের ক্ষমতা এখন এতটাই বেশি যে সাধারণ যাত্রীদের গায়ে হাত তুলতেও তারা চিন্তা করছে না।

যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা, এক জায়গায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে জ্যামের সৃষ্টি করা, এর সঙ্গে সড়কপথের অসুস্থ পাল্লা তো রয়েছেই। দিনকে দিন এ ঘটনাগুলো যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনের পর অনেক আশার বাণী শোনালেও দিনশেষে দেখা গেছে, যেই লাউ সেই কদু। বরং এখন তারা আগের চেয়ে আরও বেশি ভয়ংকর। এত বড় আন্দোলন করেও তাদের কিছু করা যায়নি। সাহস তো তারা আরও পাবেই।

প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই দেখি কেউ না কেউ দুর্ঘটনায় নিহত। দেশের পুরো সড়কপথই যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

আজকাল বাসে উঠেও তাদের কিছু বলা যায় না। একের অধিক হেলপার থাকে। কিছু বললেই একত্রে তেড়ে আসে। তাই নিজের সম্মানের কথা চিন্তা করে বেশির ভাগ যাত্রীরাই চুপ করে থাকেন। আর দু'একজন যদি প্রতিবাদ করেই ফেলে তাহলে আর রক্ষা নেই।

সেদিন শুনলাম এ রকম কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হেলপাররা চলন্ত বাস থেকে যাত্রীকে ফেলে দিয়েছে। এসব দেখবে কে? কে-ই বা বিচার করবে?

অভিনেত্রী অহনার কথা মনে আছে? মাস খানেক আগের কথা হয়তো। শুটিং শেষ করে গাড়িতে বাসায় ফিরছিলেন। এক ট্রাক এসে গাড়িতে লাগিয়ে দেয়। তিনি যখন ট্রাক ড্রাইভারকে নামার জন্য বলেন তখন ট্রাক ড্রাইভার উলটো গালাগালি করেন। তখন তিনি ট্রাকের ওপরে উঠলে তাকে নিয়েই ট্রাকচালক সজোরে গাড়ি ছোটেন।

একসময় ট্রাকটি উল্টে যায় আর প্রচণ্ড ব্যথা পান অভিনেত্রী অহনা। এই যদি হয় সেলিব্রিটিদের অবস্থা তবে সাধারণ যাত্রীদের অবস্থা বেশ বোঝা যায়। প্রশাসনের কাছে গেলে শুধুই সান্ত্বনার বুলি আর অমুক কমিটি তমুক কমিটি। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত প্রভুর ইশারায় কোনো উদ্যোগ-ই আর বাস্তবতার মুখ দেখে না।

মঙ্গলবার বিইউপির স্টুডেন্ট তার বাবার চোখের সামনে ঘাতক বাসের আঘাতে প্রাণ দিলেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সেসব সময় সক্রিয় ছিল। তখন যদি এই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হাতুড়িপেটা না করে তাদের ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকার চেষ্টা করত তাহলে আবরারকে জীবন দিতে হতো না।

আজ যখন আবরারের ফেসবুক প্রোফাইলে ঢুকে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্ল্যাকার্ড ছবিগুলো দেখি। তখন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। বুক থেকে একটা বড় চাপা আর্তনাদ বের হয়ে আসে।

'এ দেশ আমাদের নয়, এ দেশ পরিবহন শ্রমিকের'

ঘটনাপ্রবাহ : বাসচাপায় আবরার নিহত

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×