একজন মহামানবের হাতের পরশ

  সৈয়দা আফরোজা বেগম ২৪ মার্চ ২০১৯, ০০:১৭ | অনলাইন সংস্করণ

সৈয়দা আফরোজা বেগম
সৈয়দা আফরোজা বেগম

সময়টা ১৯৬৯-৭০ হবে। ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি। আব্বা একদিন বললেন, ইউনাইটেড স্কুলের মাঠে শেখ মুজিবের ভাষণ শুনতে যাবেন, সঙ্গে আমাকে নেবেন। মা বললেন, অত মানুষজনের মধ্যে আমাকে নেওয়ার দরকার নেই। আব্বা শুনলেন না।

আমিও বাবার নেওটা মেয়ে, চললাম বাবার সঙ্গে ইউনাইটেড স্কুলের জনসভায়। কিন্তু না, মাঠে লোক গিজগিজ করছে, ঢোকা গেল না। অনেকে পাশের টিএন্ডটি অফিসের ছাদে উঠেছে। তাই দেখে আব্বাও দৌড়ালেন আমার হাত ধরে ওই ছাদের উদ্দেশ্যে। তার কথা-নেতাকে দেখা ও নেতার বক্তব্য নিজ কানে শোনা।

আব্বা ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী, তবে অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন, পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে তার ছিল প্রচণ্ড ক্ষোভ। তাই ৬৯-৭০ এর আন্দোলনে তার ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন আর তখনকার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন তারও নেতা। সরকারি চাকরি করেও সবসময় পাকিস্তানবিরোধী কথা বলাসহ এ ধরনের সভা সমিতিতে তিনি প্রায়ই অংশ নিতেন, কারো নিষেধ শুনতেন না।

কুষ্টিয়া ইউনাইটেড স্কুলের মাঠে ঢুকতে না পেরে টিএন্ডটি অফিসের ছাদে দাঁড়িয়ে ভাষণ শোনার সময় চারপাশে তাকিয়ে দেখি অনেকে আশপাশের গাছে উঠে ভাষণ শুনছে। সভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা আমার হাত ধরে ছাদ থেকে নেমে দৌড়াতে দৌড়াতে ভিড় ঠেলে জনসভার মাঠে ঢুকে চলে গেলেন সভামঞ্চের কাছে নেতাকে কাছে থেকে একনজর দেখবেন বলে।

আমি তো অত বুঝিনি তখন। তবে আজ থেকে ৪৮/৪৯ বছর আগের ঘটনা হলেও আমার পরিষ্কার মনে আছে যে , সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা উঁচু লম্বা হাস্যময় সুদর্শন একজন মানুষ সভামঞ্চ থেকে নেমে একটি সাদা প্রাইভেটকারে উঠতে যাচ্ছেন আর মানুষ তাকে ঘিরে ধরেছে একটু কথা বলা আর করমর্দন করার জন্য।

আমার আব্বাও ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে নিজে হ্যান্ডশেক করলেন আর আমার হাত এগিয়ে দিয়ে বললেন, নেতা আমার মেয়ে একটু আপনার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করবে। তিনি হাসিমুখে আমার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আর আব্বা গদগদভাবে খুশিতে ডগমগ করে আমাকে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিলেন।

এ ঘটনা যখন ঘটে তখন আমার মনে তা তেমন আলোড়ন তোলেনি। তবে ঘটনাটি আমি কখনও কেন যেন ভুলিনি। ওই সময় নামও মনে রাখিনি, পরে ১৯৭০ এর নির্বাচনের সময় তার নাম জেনেছি- শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে উপাধি দেয়া হয় ‘ বঙ্গবন্ধু ‘। স্যার থেকে সঠিক উপাধি আর হয় না। বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু এতে অপরের পরিপূরক, একটি ছাড়া অপরটি অচল।

এরপর ৭০ এর নির্বাচন আর ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। ৭১ এর শুরু থেকেই আব্বা চাচাদের মুখে নানা আলোচনা শুনি। মার্চের ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে শুনি বাড়ির সবাই মিলে। আব্বা ও দুই চাচা বললেন, তারা বঙ্গবন্ধুর কথার বাইরে যাবেন না। আমাকেও প্রচণ্ড আলোড়িত করে রেডিওতে শোনা নেতার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। যখন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, তখন তিনি যেন জীবিত থাকেন এবং ফিরে আসেন আমাদের মাঝে - এ জন্য আমার মা , যিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ তিনিও নফল নামাজ পড়েন আর রোজা রাখেন।

তখন আমরা স্কুলে যাই না, সারা দিন আব্বা-চাচাদের আলাপ শুনি আর স্বাধীন বাংলা বেতার শুনি। ১৯৭১ এর মু্ক্তিযুদ্ধই আমাকে দেশ নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। কারণ খুব কাছে থেকেই কেবল না, আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই সে সময়গুলি পার করেছি।

দেশ স্বাধীন হয়, বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন, দেশটাকে নতুনভাবে গড়ার জন্য কাজ শুরু করেন। তাকে কাছে থেকে দেখা, তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার স্মৃতি মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। ১৯৭৫ এ কলেজে পড়ার সময় একদিন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শুনি দেশীয় ঘাতকদের গুলিতে তার মৃত্যুর কথা। মনে হয়েছিল আমরা আবার পরাধীন হয়ে গিয়েছি। আসলেও নিজ দেশে আমরা যেন সত্যিই আবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আটকে পড়লাম।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর দেশ চলতে লাগলো উল্টোপথে। স্বাধীন দেশ হারাল স্বাধীনতার ডাক দেয়া মানুষটির নাম উচ্চারণের স্বাধীনতা। সব আবার পাকিস্তানি আদলে চলতে থাকল। তখন আমার খুব বেশি করে মনে পড়ত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হাতে হাত মেলানোর অবিস্মরণীয় সেই ঘটনার কথা।

২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় দেশ পরিচালনায় আসে। আমি তখন পডালেখা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরি করি, সংসার করি। সে সময় আমার খুব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হ্যান্ডশেকের কথা মনে পড়ত। যে কারণে একদিন এক সিনিয়র কলিগকে খুব আবেগভরে সেই হ্যান্ডশেকের গল্প বলি। কিন্তু তিনি হাসতে হাসতে উত্তরে যা বললেন তা শুনতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, বাহ্ আপনি তো এই গল্প বলে সরকারের কাছ থেকে অনেক সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবেন।

আমি তার এ কথায় খুব বিব্রত হই, স্তম্ভিত হই, আমার খুব খারাপ লাগে।

আমি এত কষ্ট পাই এ কথা ভেবে যে, আমি তো কোনো সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য আমার মনের ভেতরে সযত্নে লালন করা এ স্মৃতির কথা বলিনি বা স্বপ্নেও তা ভাবিনি। যার কারণে বাংলাদেশের জন্ম , যারা কোনোদিন রাজনীতি করেনি বা বোঝেনি তারাও যার জন্য যার নামে যুদ্ধ করল, জীবন দিল, সাধারণ গৃহবধূরা যার মুক্তির জন্য রোজা রাখল, সেই মহামানুষটির দল এত দিন পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, তারই কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী- এটা আমার কাছে এবং আমার মতো মানুষের কাছে এ এক পরম পাওয়া, এ আনন্দের কোনো তুলনা নেই আমাদের।

শুধু আমার কাছে না- আমার আব্বা, যার কারণে ওই মহামানবের হাতের ছোঁয়া লেগে আছে আমার হাতে, যার কারণে দেশের জন্য অনুভূতি কাজ করেছে সব সময়, সেই আব্বা দেখে গেছেন তার প্রিয় নেতার কন্যা যে দেশ চালাচ্ছেন। মনে হতো যেন আব্বা নতুন করে জীবন পেয়েছেন।

আব্বা সব সময় বলতেন- দেশপ্রেম চোখে দেখা যায় না, হাতে ধরা যায় না, তা অনুভবের বিষয়, কাজের মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে হয়। সময়ের কাজ সময়ে করা, কাজের প্রতি সৎ থাকা, মানুষকে কষ্ট না দেয়া, মানুষের বিপদের সময় এগিয়ে, অন্যায় না করা- ইত্যাদি এগুলোই দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ।

আব্বার এ কথা আমি আজীবন মেনে চলেছি। আমার কর্মজীবনে জানামতে কখনও অন্যায় কাজ করিনি, কাজ করতে গিয়ে অনেক সিনিয়রদের স্নেহের ও সুনজরে পড়েছি কিন্তু কখনও কারো কাছ থেকে কোনোরকম সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করিনি বা ভাবিওনি তা। আর যে কারণে যদি কেউ ভুল বোঝে এ কথা চিন্তা করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার এই সুন্দর স্মৃতির কথাও মনের কোণেই রয়ে গেছে, বলা হয়নি আর।

খুব কাছের সমমনা দু-একজনকে বলেছি কর্মজীবনের শেষে এসে। তবে এটা আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ ঘটনা, শ্রেষ্ঠ স্মৃতি- যা আমাকে দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, আর অন্যায় থেকে, খারাপ বা মন্দ কিছু থেকে দূরে থাকার সাহস জুগিয়েছে, লোভের হাতছানিকে দূরে ঠেলে সৎ থাকতে উৎসাহ দিয়েছে।

এত বছর পর মনে হলো, এই মার্চে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৭ মার্চ তার জন্মদিনকে সামনে রেখে আমার মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা সেই সুন্দর অবিস্মরণীয় ঘটনাটিকে এবার একটু ছড়িয়ে দিই সবার মাঝে। তাই এ লেখার অবতারণা। মনের মধ্যে সযত্নে লালন করা অমর স্মৃতিটুকু এবার মুক্তি পাক, আর কিছু নয় চাওয়া।

লেখক: সৈয়দা আফরোজা বেগম, অতিরিক্ত সচিব (অব. )

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×