চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও স্ট্যালিনের আচরণ!

  ডা. নাজিরুম মুবিন ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ২০:১৮ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের চিকিৎসক

৮ই এপ্রিল। ১৯৭১।

সিলেট শহর।

হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তায় হেঁটে চলেছেন সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. শামসুদ্দিন আহমদ।

জনমানব শূন্য হয়ে পড়েছে ছোট্ট শহরটি। সবাই শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে।

নিজের পরিবার পরিজনকেও তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। মহিলা নার্সদেরকে দিয়েছেন ছুটি। কিন্তু তিনি থেকে গেছেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য থেকে গেছেন আরো কয়েকজন।

মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল কর্নেল ডা. জিয়াউর রহমান স্যারকে ইতিমধ্যেই ধরে নিয়ে গেছে পাক হানাদার বাহিনী। হয়তোবা আর বেঁচে নেই তিনি। বুকের মধ্যে হঠাৎ কেমন যেন শূন্যতার সৃষ্টি হয় তাঁর। পথিমধ্যে পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা ডা. শামসুদ্দিনের।

“ একি! আপনি এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালে যাচ্ছেন কেন ?” শুরুতেই প্রশ্ন।

“ ভাই, কিছু রোগী হাসপাতালে রয়ে গেছে। তাদের ফেলে কোথায় যাই বলুন। আমার শিক্ষাই যে মানবতার সেবা।” হাসি মুখে উত্তর দিলেন ডা. শামসুদ্দিন।

প্রশ্নকর্তা একটু লজ্জা পেলেন।

৯ই এপ্রিল।

১৯৭১।

আকাশে হিংস্র শকুনের চাইতেও পাক হানাদার বাহিনীর আনাগোনা।

হাসপাতালের পূর্বপাশে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ। পাক বাহিনীর ক্যাম্প। উত্তর পাশে টিলার উপর সিভিল সার্জনের বাংলো। সকাল ৯টায় মুক্তিবাহিনী সেই বাংলো থেকে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি কনভয়ের উপর। মারা যায় তিন পাক সেনা। বেপরোয়া পাক বাহিনী তখন পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের।

ডা. শামসুদ্দিন অপারেশন থিয়েটারে বসে আছেন। রক্তের অভাবে অপারেশন করা যাচ্ছে না আহত মানুষগুলোর। নিজের অসহায়ত্ব তাঁকে যেন মৃত্যুর চেয়েও বেশি পীড়া দিচ্ছে। হঠাৎ করেই মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয় মেজর রিয়াজসহ সশস্ত্র কয়েকজন পাক সেনা।

মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে ডা. শামসুদ্দিনসহ পাঁচজনকে লাইন ধরে দাঁড় করানো হলো।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নিজের ব্যক্তিত্বে তখনো অনড় ডা. শামসুদ্দিন। নিজের জীবন ভিক্ষা চাননি। চেয়েছিলেন অপারেশন থিয়েটারে রেখে আসা মুমূর্ষু রোগীগুলোর অপারেশন শেষ করে আসতে। কিন্তু বর্বর পাকিস্তানি সেনারা প্রথম গুলি তাকেই করে। প্রথম গুলিটি লেগেছিল তাঁর বাম উরুতে। দ্বিতীয়টি পেটের বাম পাশে। তিনি তখনও দাঁড়িয়ে। চোখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে ভাবছিলেন, কর্তব্যরত ডাক্তার কারো শত্রু হয় কিভাবে? তৃতীয় গুলিটি লাগে তাঁর বুকের বাম পাশে, হৃৎপিণ্ডে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ডা. শামসুদ্দিন।

এরপর একে একে হত্যা করা হয় ডা. শ্যামল কান্তি লালা, নার্স মাহমুদুর রহমান, এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলীকে।

শোনা যায় কিছু আদিম উল্লাস।

তারপর শুধুই নীরবতা...............।

শহরে এরপর থেকে টানা কারফিউ।

১৩ তারিখ মাত্র এক ঘন্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হলে ডা. শামসুদ্দিনের পায়ের জুতো দেখে তাঁকে শনাক্ত করা হয়। হাসপাতালের ভিতর একফুট গর্ত করে দ্রুত তাঁর দাফন করা হয়।

গতকাল ছিল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলজের ইতিহাসের কালো দিন। শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদের শাহাদাত বার্ষিকী। কর্তব্যরত অবস্থায় তাঁকে খুন করা হয়।

দেশে এখন কোন যুদ্ধাবস্থা চলছে না। তবুও ডা. শামসুদ্দিনের মতো কর্তব্যরত ডাক্তারদের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে এদেশেরই কিছু মানুষ।

৩০শে নভেম্বর।

২০১৩।

দক্ষিণখান, ঢাকা।

ব্র‍্যাক মালিকানাধীন একটি হাসপাতালে আমার মেডিক্যাল কলেজেরই বড় বোন ডা. সাজিয়া আফরিন ইভা নাইট ডিউটিতে ছিলেন। নিজ কক্ষে বিশ্রাম গ্রহণকালে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় ফয়সাল কর্তৃক শারীরিক আক্রমণের শিকার হন তিনি। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য চেষ্টায় সফল হতে না পেরে ওয়ার্ড বয় তার অপরাধ ধামাচাপা দিতে ডা. সাজিয়াকে হত্যা করে।

৫ই ডিসেম্বর।

২০১৩।

গলাচিপা, পটুয়াখালী।

গনস্বাস্থ্য মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক ডা. মাখলুকুর রহমান মুরাদ একটি মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেদিন রাতেই তিনি কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ হন। ঘটনার তিনদিন পর কর্মক্ষেত্রের পোষাক পরিহিত অবস্থায় তাঁর মৃতদেহ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় মেডিকেল ক্যাম্প সংলগ্ন পুকুরে।

১৩ই এপ্রিল।

২০১৪।

বারডেম, ঢাকা।

এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগে দেশবরেণ্য চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন জনাব সিরাজুল ইসলাম। তার ডায়াগনোসিস ছিলো অ্যাড্রেনাল ক্রাইসিস। বিকালের দিকে রোগীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়। তাতেও রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রাত ৮টা ১৫ মিনিটে রোগী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। রোগীর মৃত্যুর পর পরই রোগীর স্বজনরা ৫০-৬০ জন দুষ্কৃতিকারীসহ ডা. কল্যাণ ও ডা. আনোয়ারকে আটক করে বেধড়ক পিটাতে থাকে।

ডক্টরস রুমে থাকা বিভিন্ন আসবাবপত্র ছুঁড়ে ফেলে তাদেরকে মারতে থাকে। একজন নারী চিকিৎসক প্রাণ বাঁচাতে ওয়াশরুমে আশ্রয় নেয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ওয়াশরুমের দরজা ভেঙে তাকে পিটানো হয় এবং বেসিনের সঙ্গে বারবার আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে ফেলা হয়। রক্তাক্ত চিকিৎসকদের বাঁচাতে এসে সহকারী অধ্যাপক কিরোজ আমিন দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নির্যাতিত হন। রাত সাড়ে ১১টায় সন্ত্রাসীরা ক্লান্ত হয়ে চলে গেলে চিকিৎসকরা মুক্তি পায়।

২২শে মে।

২০১৫।

টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভর্তি রোগী খাদিজার অবস্থার অবনতি হয়। এ সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালের নার্স কাকলি লতা পাল রোগীকে একটি ইনজেকশন দেন। এর কিছুক্ষণ পর খাদিজা মারা যান।

উল্লেখ্য, খাদিজা এর কিছুদিন পূর্বে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। গুজব উঠে কর্তব্যরত নার্স ধর্মীয় বিদ্বেষবশতঃ তাকে হত্যা করেছেন। উক্ত গুজবের ভিত্তিতে স্থানীয় জনতা হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক কর্মচারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায় এবং হাসপাতাল ভাঙচুর করে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. পবিত্র কুমার কুণ্ডুকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করা হয়। মাথায় আঘাত এবং প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। মৃত ভেবে তার ওপর একটি আলমারি ফেলে দিয়ে চলে যায় স্থানীয়রা। পরবর্তীতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ডা. পবিত্র।

এই তালিকা অনেক লম্বা এবং প্রতিনিয়ত বর্ধনশীল। বেশিরভাগ নামই মনে নেই। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ডা. শম্পা, শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. তন্ময়, নেত্রকোনার ডা. রিজন, ডা. অমিত, ডা. পরাগ................

সবশেষে আমার ৩৫তম বিসিএস ব্যাচমেট কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. ফাহিম।

পাকিস্তান আর্মি না হয় ডা. শামসুদ্দিনকে হত্যা করেছিল এই জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণরা তাদের দেশের ডাক্তারদের কেন মারছে? এই দেশকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে মেধাশূন্য করে তাদের কী লাভ? আমার সীমিত জ্ঞানে আমি এর উত্তর খুঁজে পাই না।

দেশের ডাক্তারদের ওপর নির্যাতন নিয়ে অনেকগুলো সত্য ঘটনা বললাম। এবার দেশের বাইরের একটা সত্য ঘটনা বলে শেষ করি।

১৯৫১ সাল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন।

জোসেফ স্ট্যালিন। নন্দিত নিন্দিত সোভিয়েত নেতা। নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ শেষে ডাক্তার তাকে কাজ কম করতে এবং বিশ্রাম বেশি নিতে বলেন। ক্ষুদ্ধ স্ট্যালিন সেই ডাক্তারকে ইংরেজ গুপ্তচর হিসেবে অভিহিত করেন। ডাক্তারকে গ্রেফতার করা হয় এবং জেলে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে স্ট্যালিন ব্রেইন স্ট্রোক করেন এবং হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। কিন্তু কোন ডাক্তারই জেলে যাওয়ার ভয়ে তাকে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের ব্যাপারে নিষেধ করেননি।

শেষবারের স্ট্রোকে স্ট্যালিন মারা যান৷ ভয়ংকর প্রতাপশালী স্ট্যালিন নিজের মল - মূত্র গায়ে মেখে মেঝেতে পড়েছিলেন সারা দিন। কেউ ভয়ে ঘরে ঢোকেনি। তার হাত পা নাড়ানোর শক্তি ছিল না। কথা বলারও শক্তি ছিল না। একদিন পরে একজন ডাক্তার এসে শুধু ডেথ ডিক্লেয়ার করেন।

আপনারা স্ট্যালিনের মতো আচরণ করলে আমরাও হয়তোবা তার ডাক্তারের মতো আচরণ করবো। আপনারা যেভাবে চাইবেন সেভাবেই চিকিৎসা দিবো।

সিদ্ধান্ত এখন আপনাদের।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×