বৈশাখ আমার ছোটবেলার রুদ্র শখ

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:০০ | অনলাইন সংস্করণ

  প্রতীক মাহমুদ

শাহবাগে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ছবি: যুগান্তর

স্মৃতিকাতরতা নয়, স্মৃতি বিহ্বলতায় বেঁচে আছি। রঙিন স্বপ্নের বুদ্বুদের মতোই আমার ভেতরে স্মৃতিরা বসে আছে। অনেকেই বলে স্মৃতি হারিয়ে যায়, অনেকেই বলে ফেলে এসেছি। আমি বলি ধারণ করে আছি। স্মৃতি কি হারিয়ে যায় বা কেউ ফেলে আসে? আমরাতো আসলে মুহূর্ত ফেলে আসি। আর মুহূর্তের আবেগই স্মৃতি হয়ে সারা জীবনের জন্য আমাদের ভেতরে বাসা বাঁধে। 

স্মৃতিতো জীবনের আয়না। এই আয়নায় সতত বেড়ে ওঠে আমার ছোটবালার রুদ্র শখ। ছোটবেলা থেকেই আমি উড়নচণ্ডী গোছের মানুষ। অনেকেই বলত বৈশাখী হাওয়ার মতো রুদ্র। অনেকেই তিরষ্কার করত বন্ধুরা বলত চালিয়ে যা; পরিবার বলত এখনও সময় আছে শুধরে যাও। তবে ভেতরের মানুষটা আমাকে পুরস্কৃত করত। আর সে কারণেই আমি ছিলাম একটু অন্যরকম।

আমি যখন প্রাইমারি শিক্ষার্থী, তখন আর এমনকি বয়স। হবে হয়ত দশ-এগারো বছর। ওই সময় আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন বাড়ির পাশের সরকারি অফিস ‘শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রে’ গিয়ে কত যে কার্টুন আর প্রিয় সিরিয়াল ম্যাকগাইভার দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই। 

মাঝে মধ্যে অন্য পাড়ায় গিয়েও টিভিতে নাটকসহ বিভিন্ন সিরিয়াল দেখেছি; তবে সেটা বড় বোনদের সঙ্গে। আর এভাবেই রাতের বেলা বাইরের জগতের সঙ্গে আমার পরিচয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের রঙিন স্বপ্নের ঘোরে এখনও জ্বলজ্বল করে ‘কমলা সুন্দরী’ ‘সীতার বনবাস’ ‘সাতভাই চম্পা’ ‘বেহুলা সুন্দরী’ ও ‘দেওয়ানা মদিনা’র মতো যাত্রাপালা। 

অনেকেই এই যাত্রাপালাকে ঘেঁটু যাত্রাও বলে থাকেন। এর অভিনয় হতো মুক্তমঞ্চে। দর্শক হয়ে গেলে বসতে হতো খড়ের ওপর। কেবলমাত্র সুতলী দিয়ে মঞ্চটা ঘেরা থাকত। ওই সুতলী ঘেরা মঞ্চে আমি যে কতবার রাজা সেজে উঠে পড়েছি (স্বপ্নের মধ্যে) তার হিসাব নেই। এই ঘেঁটু যাত্রার টানে আরও বেশি আকৃষ্ট হতাম এর বিজ্ঞাপন শুনে।

“হ্যাঁ ভাই, অদ্য রাত্রি ১১ ঘটিকার সময় মিরপুরের কালাচান্দের মোড়ের রঙ্গমঞ্চে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ভূবন বিহারী পরিচালিত দেশের বিখ্যাত সেভেন স্টার অপেরার যাত্রাভিনয় ‘কমলা সুন্দরী’। এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করবেন- চম্পা রাণী, রেবেকা রাণী, জয়তী রাণী, সত্যানন্দ রায়, জয়নাল সরকার, অমল বোস, বিমান বসুসহ আরও অনেকে। এ ছাড়াও সেখানে দেখতে পাবেন পাহাড়ী নৃত্য, মণিপুরী নৃত্য আর আকাশ থেকে নেমে আসা এক ঝাঁক উড়ন্ত বলাকার ঝুমুর ঝুমুর নৃত্য।”

বাদল দা’র ভরাট কণ্ঠে এ রকম মাইকিং শুনেই যাত্রা দেখার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে যেত। এমনকি মাঝে মধ্যে বাদল দা’র ঢঙে আমিও যাত্রার বিজ্ঞাপন পড়তাম আর ভাবতাম ইস্ আমি যদি তার মতো বলতে পারতাম। আবার লুকিয়ে যাত্রা দেখতে গিয়ে নিজের ভেতরে যাত্রাপালার চরিত্রগুলো ধরে নিয়ে আসতাম। পরে সেই চরিত্রে নিজেই নিজকে সাজিয়ে হয়ে যেতাম এক নটরাজ।

স্বভাবত প্রতিবছর শীতের সময় যাত্রাপালা হলেও একবার এর আয়োজন হয়েছিল বাংলা নববর্ষের রাতে। সে রাতে যথারীতি আমিও যাত্রার দর্শক। সন্ধ্যা থেকেই আকাশে মেঘের আয়োজনটা ছিল বেশ পাকাপোক্ত। তবে সেদিকে মানুষের খেয়াল ছিল কমই। রাত ১১টা বাজতেই ঢোলে বাড়ি, বাঁশিতে ফুঁ। 

মঞ্চে আসবেন রাজা তার সভাসদসহ। হঠাৎ-ই পশ্চিমের আকাশে বিদ্যুৎ চমক। রুদ্র মূর্তি নিয়ে এগিয়ে আসছে ঝড়। বাতাসের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে দূর থেকেই। মনে হচ্ছে সমস্ত কিছু তুলে নিয়ে যাবে ঝড়-দেবতা। সবাই দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছে। জুয়ার আসর ভেঙে যাচ্ছে। যাত্রার নট-নটীরাও অস্থির হয়ে ছুটছে আশ্রয়ের সন্ধানে। 

কেবল একলা আমি দাঁড়িয়ে আছি মঞ্চের সামনে রাজার ভূমিকায়। সমস্ত ভয়-শঙ্কা দূরে ঠেলে দিয়ে ঝড়কে জয় করার পণ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। একে একে উড়ে যাচ্ছে যাত্রার মঞ্চ, দর্শকরা পালিয়ে যাচ্ছে, আকাশে উড়ছে টিন, গাছের মাথা নুয়ে যাচ্ছে মাটির সঙ্গে। তুমুল বৃষ্টি আর বাতাসের শব্দে মানুষের চিৎকার ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। 

আশ্চর্য! বাতাস সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে গেলেও আমাকে এর তীব্রতা স্পর্শ করছে না। কেবলমাত্র বাতাসের কয়েক ঝাঁপটা এসে আমাকে শীতল করে দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা। আমি এক রুদ্র বালক কি সাহসে ওইদিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম আজ ভাবতেই অবাক লাগে। 

পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছি উচ্চতায় ছোট ছিলাম বলে এবং পাশে একটি মোটা গাছ থাকায় ঝড় আমাকে আঘাত করতে পারেনি! তবে ওইদিন ঝড়ের আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও পারিবারিক শাসনের আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারিনি।

আসছি বৈশাখী মেলার কথায়। প্রতি বছরই বৈশাখের প্রথম দিন কালিয়া কান্দাপাড়ায় মেলা বসত। সেটি ছিল হাটের জায়গা, যা আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে। আমি প্রতি বছরই বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম ওই মেলায়। আর সেখান থেকে ফেরার পথে প্রায়ই ঝড়ের মুখে পড়তে হতো। 

মেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতাগুলোও ছিল দারুণ। কয়েক বন্ধু রেললাইন ধরে হেঁটে রওনা দিতাম মেলার দিকে। রেলের স্লিপার গুনতে গুনতে একসময় এসে পড়তাম বিশাল এক প্রান্তরের সামনে। সবুজের সমারোহে এক অন্যরকম ভালোলাগা আমাদের সব ক্লান্তি দূর করে দিত। 

ধানক্ষেতের অপার সৌন্দর্য গিলতে গিলতে যখন তুমুল পিপাসা চেপে যেত তখন ডিপ টিউবওয়েলের ঠাণ্ডা পানিতে গলা ভিজিয়ে নিতাম। কেউ আবার পকেটে করে নিয়ে আসত কাঁচা আমের ভর্তা। রাস্তায় সেগুলো আমাদের ক্লান্তি উপশমের দাওয়াই হিসেবে কাজ করতো। 

সবুজ প্রান্তরের পরই কয়েকটি পাড়া। ওই পাড়ার বাঁশ ঝোপ আর গাছপালার ভেতর থেকে এক ধরনের পাখির ‘চি’ ডাকে মনে হতো মেলার আয়োজন সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। মেলার বাঁশির সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বোধহয় পাখিগুলো এরকমভাবে ডেকে যেত। এর পর মেলার ভেতরে প্রবেশ করে নিজের পছন্দের জিনিস কিনতাম। 

ওই সময় মাত্র ৩০-৪০ টাকায় এত কিছু কেনা যেত যে, সেগুলো বাড়ি নিয়ে আসাটাই ছিল মুশকিল। মেলা থেকে যে জিনিসগুলো কিনতাম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- লাটিম, চরকি, কাঠের তৈরি গাড়ি, মাটির ঘোড়া, পুতুল, পাতিল, বাঁশের বাঁশি, বেলুন, কাচের খেলনা, মিছরির হাতি ঘোড়া, ঝুরি-বুন্দিয়া, খাজা, বাতাসাসহ আরও অনেক কিছু। 

তবে মাঝে মধ্যে দুরন্ত মনে নেমে আসতো দুষ্টুমির আলোকচ্ছটা। বাড়ির ফেরা পথে মেলা থেকে ফেরত কয়েকটি টাকা নিয়ে আলের ধারে বসা তিন তাসের ভেল্কিভাজিতে মেতে উঠতাম আমরা। তবে সেই তাসের আসর থেকে কোনোদিনই টাকা নিয়ে ফিরতে পারিনি।

প্রায় বছরই বাসায় ফেরার সময় সন্ধ্যা নেমে আসত। আর কেনো জানি না বছরের ওই প্রথম দিনের সন্ধ্যার সঙ্গে ঝড়ের তুমুল একটা সম্পর্ক এখনো আছে। বেশিরভাগ বছরের প্রথম দিন আমরা যখন মেলা থেকে ফিরতাম ওইদিন পশ্চিমাকাশ কালো মেঘে ঢেকে যেত। এর পর পৃথিবীর বুকে নেমে আসত বৃষ্টি আর বাতাসের তাণ্ডব। 

কোনোবার হয়তো আমাদের ঠাঁই মিলত পাড়া-গাঁয়ের কোনো নিভৃত বাড়িতে, আবার কোনোবার হয়ত গ্রামের মোড়ের দোকানে। তবে বেশিরভাগ সময় আমরা চেষ্টা করতাম দ্রুত হেঁটে গিয়ে রায়পুর রেলওয়ে স্টেশনে আশ্রয় নিতে। বলে রাখা ভালো রেলওয়ে স্টেশনটি আমাদের বাড়ি ও মেলার দূরত্বের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে। 

যখন রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন প্রায়ই স্কুল পালিয়ে বাজার স্টেশন থেকে ট্রেনে করে ওই রায়পুর স্টেশনেই যেতাম; আবার ট্রেনে করেই সেখান থেকে ফিরে আসতাম। যাহোক এই স্টেশন দু’টি আমার ছোলেবেলার অনেক কিছুকেই প্রশ্রয় দিত।

এখন হয়ত অনেক কিছুই নেই। যাত্রাপালা নেই, বাদল দা নেই, নেই ওই রকম বৈশাখী মেলা। তবে ভেতরটা আগের মতোই আছে। এখন নগর সভ্যতার যান্ত্রিক গৃহায়ণে যাত্রার নট-নটীর মতো অভিনয় করে চলেছি। বৈশাখী মেলার মতো গ্রামীণ মেলা না থাকলেও শহুরে মেলায় যাই মাঝে মধ্যেই। 

বাদল দার মতো যাত্রার বিজ্ঞাপন প্রচার না করলেও কবিতা পড়ি নিয়মিতই। এখন কাল বৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব মোকাবেলা না করলেও জীবনযুদ্ধের অনেক ঝড়কেই মোকাবেলা করতে হয়। আসলে ছোটবেলার রুদ্র শখের স্মৃতিই আমাকে সবকিছু মোকাবেলা করতে শেখায়। আর আমি সেগুলোর রূপান্তর ঘটিয়ে জেগে থাকি এক ব্যস্ত নাগরিক। 

লেখক: প্রতীক মাহমুদ, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী