আমাদের জেন্ডার ভাবনা ও সম্পর্কায়ন

  ফখরুদ্দিন মেহেদী ৩০ মে ২০১৯, ১৯:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

আমাদের জেন্ডার ভাবনা ও সম্পর্কায়ন
আমাদের জেন্ডার ভাবনা ও সম্পর্কায়ন

খেলার বয়সে বাচ্চারা যখন অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মিশে, আমরা সেখানে জেন্ডার (লিঙ্গ) বিবেচনায় আনি না। সুতরাং ওই বয়সে যখন তারা (ছেলে বাচ্চা, মেয়ে বাচ্চা) এক সঙ্গে মিশে, খেলে, বেড়ে উঠে, আমরা সেটাকে খারাপ চোখেও দেখি না। কিন্তু বাচ্চা যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশরে পা দেয়, আমরা তাদের মেলামেশাকে আড় চোখে দেখা শুরু করি!

বুঝিয়ে দেই ছেলে-মেয়ে সম্পর্ক মানেই নিষিদ্ধ কিছু্! আমাদের সমাজ শিশু বয়সেই অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী ইত্যাদি নামের নানান দেয়াল।

মূলত আমরা আমাদের নিজস্ব মতামত, চিন্তা-চেতনায় বাচ্চাদের বড় করে তুলি। যার প্রতিফলন আমরা দেখি তাদের আচরণেও। যেমন ধরি, বয়:সন্ধিতে আমাদের সন্তানদের সামনে যখন ‘সম্পর্ক’ শব্দটি আসে তারা তার ওপর নেতিবাচক অর্থ স্থাপন করে। ‘সম্পর্ক’ মানেই তারা বুঝে খারাপ বা নিষিদ্ধ কিছু একটা। সম্পর্ক মানেই তারা বুঝে যৌন বা শরীরবৃত্তীয় কোন বিষয়। সমাজের, পরিবারের শেখানো রীতি অনুসারে তারা সম্পর্কে শরীর নিয়ে আসে। এই শরীর শব্দের নেতিবাচকতার ভীড়ে আমাদের সন্তানদের আমরা ভুলিয়ে দেই, সম্পর্ক মাতা-পিতায় হয়।

সম্পর্ক ভাই-বোনে হয়। সম্পর্ক শিক্ষক-শিক্ষার্থীতে হয়। সম্পর্ক বন্ধুতে বন্ধুতে হয়। সর্বোপরি সম্পর্ক মানুষে-মানুষে হয়। অথচ সম্পর্ক শব্দটি একটি নিদিষ্ট দিকে নিষেধ অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে, হয়। শব্দের নিজস্ব কোন শক্তি না থাকলেও সে আমারদের চিন্তায় বসে থাকে অযাচিত ও অতিরিক্ত বোঝা হয়ে। আমরা সন্তানদের মাথায় লিঙ্গ পার্থক্য বুঝিয়ে দেই শুরু থেকেই।

আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, একটা ছেলে আরেকটা মেয়েতে কখনো বন্ধুত্ব হয় না। ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গে মানেই শরীর সমন্ধীয় সম্পর্ক। কিন্তু ছেলে-মেয়ে কেন বন্ধু হতে পারে না? এর উত্তর হয়তো আমরা শরীর ভিত্তিক সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

আমাদের স্ব-শিক্ষিত মাথায় হয়তো খেলেই না, শরীর ছাড়াও আরও গভীর বা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক থাকতে পারে। আমরা ভুলেই যাই শরীরবৃত্তীয় সম্পর্কের বাইরেই আমাদের লেনদেন করতে হয় বেশি। যে সমাজ ভুল শিক্ষা দেয় সেই সমাজে শরীরভিত্তিক সম্পর্ক লেনদেনের একটা অংশ মাত্র।

অথচ আমরা এটাকে সংকীর্ণ করে ফেলি একটা ছকে। এর বাইরে মানুষে-মানুষে যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, যে আত্মার সম্পর্ক পৃথিবীতে এখনো কিছু সুখ অবশিষ্ট রয়েছে তাকে আমরা সীমাবদ্ধ করে দেই। আর তাইতো, একটা ছেলে এবং একটা মেয়ের সম্পর্ক আমরা যখন দেখি, শুরুতেই আড় চোখে তাকাই। কটু কথা বলি।

আমাদের মনের ঘোড়া চালিয়ে দিয়ে আমার একে এদিক-সেদিক নানা দিকে নিয়ে যাই। আমাদের সংকীর্ণতা আমাদের ভাবতেই দেয় না ছেলে এবং মেয়েতে বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্বের মধ্যে কোন শরীর নেই। কেননা শরীরের আকর্ষণ সেটা আর বন্ধুত্ব থাকে না।

এসবের মূলে রয়েছে সামাজিক শিক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের এর বাইরে গিয়ে ভাবতে শেখায় কিন্তু পরিবার অথবা সমাজ আমদের মনে মোহর মেরে দিয়ে রাখে। আমাদের শিক্ষা, আমাদের সন্তানদের দ্বন্দে ফেলে দেয়।

অন্য সব কিছুর মতোই আমাদের পরিবার সামাজিক শিক্ষাটা তাদের জানার সীমাবদ্ধতা নিয়েই সন্তানদের দিয়ে থাকেন। যার ফলে বাস্তবজীবনেও তারা এ থেকে বের হয়ে সহজে ভাবতে পারে না। যদিও পারে, তাকে নানান রকম কথা-কথিত সম্পর্ক বেড়াজালে লুকিয়ে রাখতে হয়।

আধুনিক বিশ্ব, প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা এগিয়েছি অনেক দূর। আমরা এখন আমাদের ভালোবাসার মানুষের কথা আমাদের পরিবারকে জানাতে পারি, কিন্তু মেয়ে বান্ধবীটি যার সঙ্গে শরীরবৃত্তীয় সম্পর্কর বাইরে আত্মসম্পর্ক, মানুষ হিসেবে মানুষের সম্পর্ক- তার কথা পরিবারকে সেভাবে বলতে পারি না।

এমনকি শতভাগ শিক্ষার হার আছে এমন পরিবারেও তা সাধারণ চোখে দেখা হয় না। তাহলে আমরা কতটুকু সহনশীল? সন্তানের মননে লিঙ্গ চিন্তাপ্রতিষ্ঠিত করে আমরা মানবিক এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করবো? এ বিভেদ কি আমার সমাজে তৈরি করা ফাঁদ নয়?

এ ফাঁদ আমাদের নানান রকম অনাচারের বেড়াজালে ফেলে দিচ্ছে। আমাদের এই অযাচিত সন্দেহবাদীমন পারিবারিক জীবনেও প্রভাব ফেলছে। কেননা আমাদের সন্তানরা যখন পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করছে, তখনো তারা এর বাইরে ভাবতে পারছে না।

স্বামী তার স্ত্রীর ছেলে বন্ধুটিকে সহজে মানতে পারছে না। তেমনি স্ত্রীর তার স্বামীর মেয়ে বান্ধবীটিকে সমস্যা মনে করছে। আর এর মধ্যে সমঝোতা করতে গিয়ে তারা তাদের প্রিয় বন্ধুর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। দুনিয়া ছোট হয়ে আসছে। একে অপরের প্রতি সম্মান বিসর্জন দিচ্ছে। একজন মানুষ, মানুষের প্রাপ্য সম্মান না পেয়ে বরং তার লিঙ্গ দিয়ে মূল্যায়িত হচ্ছে।

পরিবারের উচিত এই বৈষম্য বাচ্চাদের চিন্তায় না ঢোকানো। ছেলে-মেয়ে কিংবা অন্য কোন লিঙ্গ তাদের না শিখিয়ে বরং শেখানো উচিত সবাই মানুষ। মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি আমাদের দায়-দায়িত্ব আছে। সেই দায়িত্বে ব্রত হলেই কেবল মুক্তি আর শান্তি আসতে পারে।

লেখক: ফখরুদ্দিন মেহেদী, মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×