আপনি তাদের একশোতে কত দিতেন?

  ডা. মারুফ রায়হান খান ০৯ জুন ২০১৯, ১৬:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বকাপ ক্রিকেট

এই ক্রিকেট দলের দুটো বিশ্বরেকর্ড আছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে টানা ২৩ ম্যাচে পরাজয়। টেস্ট ক্রিকেটে টানা ২১ ম্যাচে পরাজয়। এই রেকর্ড আজতক কেউ ভাঙতে পারেনি।

১৯ বছর পেরিয়ে গেছে। এক যুগ পেরিয়ে আরও ৭ বছর। ১১৪টি টেস্টের মধ্যে জেতার তালিকায় কেবল এবং কেবলমাত্র ১৩টি টেস্ট; তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল জিম্বাবুয়ের সঙ্গেই ৬টি।

তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্র হয়েও সে দেশ ক্রিকেটের পেছনে দুহাত ভরে খরচ করতে কোনো কার্পণ্য করেনি। তবুও এহেন দশা।

আপনি বুকে হাত রেখে বলুন, আমি যাদের কথা বলছি সে দেশটি যদি আপনার দেশ না হতো, আপনি তাদের একশোতে কত দিতেন? কেবল একটা টেস্ট ম্যাচ জিতলে তৃতীয় বিশ্বের একটি রাষ্ট্র ক্রিকেটারদের কোটি টাকা উপহার দিলে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতেন? আর কতো এখনও খোকা, এখনও বাচ্চা, ওরা শিখছে এখনও বলে খুশি থাকতেন?

ম্যাচ ৪ দিনে নিয়ে যেতে পেরেছে, ফলোঅন এড়াতে পেরেছে এই তো বেশি বলে আত্মগরিমায় ভুগতেন?

শুক্রবার ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ গিয়েছিলাম। একদম কম করে হলেও ২০ জন ভিক্ষুক আমার কাছে ভিক্ষে চেয়েছেন। এই কয়েক ঘণ্টার পথে। কোটি টাকা দিয়ে তাদের ১০০ জনকে স্বাবলম্বী করা যেতো কিনা আপনি বলুন? একটা রিকশা, একটা মুদির দোকান, একটা চা-পানের সেন্টার? হতো না?

আপনার আত্মীয়-স্বজনের দিকে তাকান। কতজনকে দেখতে পাচ্ছেন অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে এখনও একটা চাকরির পেছনে বুভুক্ষুর মতো ঘুরছে এ দ্বার থেকে ও দ্বার হতাশ বদনে?

খবর কি রাখি আমরা পরিবার আর বন্ধুদের ‘কী করছো এখন? এখনও চাকরি পাওনি?’-- এ ধরনের কথাগুলো কেমন সুঁচের মতো তীব্রভাবে বিঁধে?

নীরবে প্রতি রাতে তারা কতো ফোঁটা জল ফেলে যায় সে হিসেব কেউ জানে না। কোটি টাকা দিয়ে তাদের কতজনের কর্মসংস্থান করা যায় বলুন তো? অন্তত ৫০টা পরিবারের মুখে তো হাসি ফোটানো যেতোই।

বাংলাদেশের বহু ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন শুরু হয় ৬-৮ হাজার টাকায়। সত্যি! খোঁজ নিয়ে দেখুন। এমনকি আমি এমনও ইঞ্জিনিয়ারের খোঁজ জানি যিনি কোনো বেতন পান না, শুধু খাবারের বিনিময়ে কাজ করেন। কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) বেসিসে কাজ করেন।

আমরা যখন বলি একজন এমবিবিএস ডাক্তার কয়েক বছর একেবারেই বিনা পয়সায় সরকারি মেডিকেলে সেবা দিয়ে যান আর মানবেতর জীবনযাপন করেন--তাদের কিছু ভাতার ব্যবস্থা যদি করা যেতো...উত্তর রেডি থাকে, এই টাকাটা কোথা থেকে আসবে? আমরা ভেবে পাই না, এই কিছুদিন পরপর এতো এতো টাকা ফ্ল্যাট-গাড়ি দেওয়ার সময় টাকা কোথা থেকে আসে?

এক বর্বর প্রথা করে জাতির অন্যতম মেধাবী তরুণদের যেভাবে শোষণ করা হচ্ছে, বড় ডিগ্রির মুলো দেখিয়ে বিনা পয়সায় কাজ করানো হচ্ছে--একবারও কি ভেবে দেখেন না তারা তাদের পরিবারে মুখ দেখায় কী করে?

ডাক্তার হয়ে যাবার কয়েক বছর পরেও যখন পরিবারের কাছ থেকে হাত খরচের টাকা আনতে হয় তখন আত্মসম্মানটা কোন চুলোয় রেখে আসতে হয় তা কি কেউ ভাবেন?

পিজি হসপিটালের ডাক্তার! এমবিবিএস পাস করার পর সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সবাইকে পেছনে ফেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হবার জন্যে দৌঁড় শুরু করেন। তার মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা!

সেই সঙ্গে বাইরে কোনো চাকরি করা নিষেধ। একজন প্রায় মধ্যবয়স্ক চিকিৎসক কীভাবে তার স্ত্রী-সন্তান-মা-বাবা নিয়ে চলবেন কে ভেবে দেখবে? এ ২০ হাজার টাকা পেতেও ভোগান্তি কম না। মাঝে মাঝেই বেতন আটকে যায়।

যখন বলা হয়, বেতন বাড়ানো হোক; তখন জানানো হয় এই টাকাই কতো কষ্ট করে ব্যবস্থা করা হয়েছে আরও টাকা কোথা থেকে আসবে? আর ডিপ্লোমা কোর্সরতদের বিনা বেতনের হাহাকার বলে আর লেখা বড় করতে চাই না।

ধরা যাক, এই টাকা এই ফ্ল্যাট এই গাড়ি তাদের সম্মান জানিয়ে দেওয়া হয়। আমার প্রশ্ন অত্যন্ত বিরল রোগে আক্রান্ত খুলনার আবুল বাজানদার সাহেবের (বৃক্ষমানব) এপিডার্মো ডিসপ্লেশিয়া ভেরুকোফরমিস রোগের সফল অস্ত্রোপচার করে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করা চিকিৎসককে কি আপনারা কোনো সম্মান জানিয়েছেন?

কনডম ব্যবহার করে পোস্ট পার্টাম হেমোরেজ কন্ট্রোলে (ডা. সায়েবার আবিষ্কার) বিশ্বব্যাপী তাক লাগিয়ে দেওয়া চিকিৎসককে? পরিত্যক্ত শ্যাম্পুর বোতল দিয়ে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা সহজলভ্য করা চিকিৎসককে?

মায়ের পেটে গুলিবিদ্ধ শিশুর সফল চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকগণকে? রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কোনো স্বাধীনতা বা একুশে পদক?

এতো সীমিত লজিস্টিক নিয়ে যারা এই দেশের স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বহুদূর তাদের জন্যে কোনো সম্মান? শিশুমৃত্যুর আর মাতৃমৃত্যুর হার আল্লাহর রহমতে কতটা কমে এসেছে সে খবর কি কেউ জানে?

অনেক স্বল্প খরচে বিশ্বমানের অপারেশন করে যাচ্ছেন আমাদের যে চিকিৎসকরা তাদের খবর কেউ রাখেন?

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পান না কেন আমার সেই ম্যাডাম যার এনআইসিইউতে একমাসে একটা নবজাতকও মৃত্যুবরণ করেনি, প্রতিটি নবজাতকই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে? রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পায় না কেন আমার সেই স্যার গত ১ বছরে যিনি ৪০০টি গল ব্লাডারই সফলভাবে পেট না কেটেই শুধু ফুটো করে অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন?

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তিবর্গ খেলুড়েদের নিয়ে আহ্লাদে আটখানা হয়ে কথা বলেন। দেশের মিডিয়াগুলো হেডলাইন করেন তাদের। আর যারা সত্যিকারার্থেই জ্ঞানে-গুণে, বিজ্ঞান-কৃষিতে- চিকিৎসায়-গবেষণায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা না পায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের একটু উৎসাহ, না পায় মিডিয়ার একটু কাভারেজ। কী আশা করেন? যে দেশে গুণীর কদর করা হয় না, সে দেশে গুণী জন্মায় না।

লেখক: ডা. মারুফ রায়হান খান

লেকচারার,ফার্মাকোলজি এন্ড থেরাপিউটিক্স,এনাম মেডিকেল কলেজ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×