এই শুভ্র এই...

  পিয়াল হাসান ১২ জুন ২০১৯, ২২:০৯ | অনলাইন সংস্করণ

পিয়াল হাসান

মানুষ কি হয় ফুলের মত? জীবন কি হয় শিশিরের মত? মানুষ কি তুলতুলে মাটিতে বৃক্ষের মত শেকড় ছড়ায়? চৈতালি চাঁদের মত,সূর্যের মত আলোক বিলায়? মানুষ কি কখনো সমুদ্র হয়? পাহাড় কিংবা ছিপছিপে নদী হয়? পরিপাটি দ্বীপ হয়?

মানুষের কি কোমল ঈর্ষা করার মত জীবন হয়? হয় বৈ-কি, অনেক মানুষের দেখেছি পদ্ম ফুলের মত জীবন, জীবনানন্দের কবিতা, রবীঠাকুরের ছোটগল্প কিংবা মানিকের অসাধারণ উপন্যাসের মত জীবন।

কেউ কেউ তো সত্যজিতের চিত্রনাট্যের মত গুছানো জীবন যাপন করে। আমার দেখা শুভ্র জ্যোতিক টিকাদার ছিল এমনই একজন মানুষ।

শুভ্রদা দেখতে ছিল ফুলের মত, মনটা ছিল আকাশের মত। তার চলন ছিল প্রবাহমান তটিনীর মত। সে যখন কথা বলত ঝরনার মত ঝনঝন শব্দ হত। তার হাসির পেছনে কলকলানো আওয়াজ পেতাম। অত সুন্দর মানুষটা নাই। নেই মানে মানুষটা অভিমান করে চলে গেছে।

বহু দূরে সাত সমুদ্র তেরো নদী, গ্যালাক্সী, মিল্কওয়ের ওপারে। সকল কিছুর উর্ধ্বে। এই শহরের অলিগলিতে খোঁজলেও মানুষটাকে আর পাওয়া যাবে না। কোথাও আর ভুলেও দেখা হবে না। জানতে চাইবে না কেমন আছিস। সব কিছু আছে সে নাই। সে চলে গেছে শূন্য করে।

বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী শুভ্র জ্যোতিক ছিল আমার এক বছরের সিনিয়র কিন্তু তার মস্তিষ্কের বয়স ছিল ঢের বেশি। অসম্ভব সৃষ্টিশীল মানুষ। চিন্তায়-কর্মে আমাদের তো বটেই সময়ের চেয়েও অনেক বেশি এগিয়ে ছিল। সে এমন একজন মানুষ ছিল যার আশেপাশে কিছুক্ষণ থাকলে, একটুখানি কথা বললে তার মত হতে মন চাইত।

তার জীবনের নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল, ছন্দ ছিল। বিজ্ঞান শাখার প্রায় শিক্ষার্থীদের বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন থাকে। শুভ্রদারও ছিল।

স্বপ্নের পথেই হেঁটেছেন। পড়েছেন বুয়েটের পছন্দের সাবজেক্টে। ছাত্রজীবনে করেছেন ছাত্র-রাজনীতি। ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক।

যেখানে সবাই পড়ার চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যেত সেখানে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে। তৈরি করেছেন ছাত্রলীগের কর্মী বাহিনী। শুভ্রদা মন থেকে সংগঠনটাকে ভালোবাসতেন।

মৌলবাদীদের চাপাতির আঘাতে নিজের বন্ধু দ্বীপকে মরতে দেখেও পিছপা হয়নি। বরং বজ্রকণ্ঠে স্লোগান ধরেছে। আমার সোনার বাংলায় মৌলবাদের ঠাঁই নাই। ছাত্রলীগ করতে গিয়ে একবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও হয়েছিল। ঝামেলার কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মানুষ ছিল শুভ্রদা। খুব কাছ থেকে দেখেছি ছাত্রলীগের জন্য অনেক কিছু করেছে সে। মেধার অনেকটা ঢেলে দিয়েছে সেখানে। সর্ব শেষ আওয়ামী লীগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপকমিটির সদস্যও হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে হঠাত জল ঢেলে পৃথিবীর মায়া ফেলে চলে গেল। একটা অভিমান সব শেষ করে দিল।

জীবনানন্দ দাশ এই জন্যই কি বলেছিলেন, “আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতর খেলা করে/আমাদের ক্লান্ত করে:”?

শুভ্রদার হঠাৎ চলে যাওয়ায় কেবল মনে হচ্ছে, কচি একটা সূর্য মাঝ আকাশে পৌছে হঠাৎ তার সব আলো নিভিয়ে অস্ত চলে গেছে।

আফসোস! তার জ্বলে ওঠার, নিজেকে আরো বেশি মেলে ধরবার প্রচুর সময় ছিল। এই মরণ অভিমান কেনো করলে দাদা?

‘জীবনের এই স্বাদ- সুপক্ক যবের ঘ্রাণ হেমন্তের বিকেলের-তোমার অসহ্য বোধ হল? মর্গে কি হৃদয় জুড়ালো/মর্গে - গুমোটে থ্যাঁতা ইঁদুরের মত রক্তমাখা ঠোটে!’

অতীতে আপনার সব চিন্তা ও কাজকে স্বাগত জানালেও এই সিদ্ধান্তটার জন্য ঘৃণা করব। বড় স্বার্থপরের মত, কাপুরুষের মত কাজ করেছেন। আপনার মত সৃজনশীল মেধাবী মানুষের কাছে এটা প্রত্যাশা করিনি কখনো। কিসের অভাব ছিল? কিসের এত দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা ছিল? কত মানুষ ধুকে ধুকে জীবনের শেষ ভোরটা দেখার জন্য বেঁচে আছে।

চলতশক্তিহীন, বাকহীন কত মানুষ আরো এক মুহূর্ত বেঁচে থাকার জন্য আক্ষেপ করছে। কি এমন তাড়া ছিল? জীবন সঙ্গিনী সে তো প্রেয়সী। তার সঙ্গে মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ পাওয়া না পাওয়ার গল্প হবে। এটাই স্বাভাবিক।

মানুষের সব আশা কি পূরণ হয়? তাই বলে এভাবে লোকান্তরে, একবারে চোখের আড়ালে চলে যেতে হবে? যে মানুষটার সঙ্গে অভিমান করেছিলেন সেই মানুষটা কিভাবে বেঁচে থাকবে, ভেবেছেন কখনো? এই যে জীবনে চলার পথে এত এত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হল, সমাজে গাছের মত শেকড় গজাল কিভাবে পারলেন সব পরিচয় মুছে দিতে?

সমস্ত বন্ধন একটানে শিকড়ের মত তুলে ফেলতে? একটুও খারাপ লাগেনি? আপনি যখন দড়ি হাতে এগুলেন সময়ও কি একটু প্রতিবাদ করেনি? বলেনি ঢের সময় বাকী? আমাদের কথাও মনে হয়নি একবারও? মনে হয়নি কাল ঈদ! অনেকের ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে যাবে। অনেকেই সংবাদটা শুনে বিষন্ন হবে?

অথচ দেখেন আপনার জন্য মায়া হচ্ছে। চলে যাওয়ার পর কতবার যে আকাশে তাকিয়েছি। আচ্ছা আপনি আকাশটার কোন পাশে থাকেন? কোন তারাটা আপনি? আপনি কি আমাদের দেখছেন। এই যে লিখছি পড়তে পারছেন? নাকি এখনো অভিমান করে আছেন?

বলেন কোথায় থাকেন, কোনো কারণে আপনাকে ভেবে মন খারাপ হলে একবার দেখে নিব। অমন অভিমান আর করবেন না। শুনেননি কবি কি বলেছেন, কাপুরুষ ভেঙে পড়ে। প্রেমিক পুরুষ বুকপকেটে বিরহ নিয়ে তেপান্তরে হাটে। উথাল পাতাল জোছনা হবেন। কারো সুখের কারণ হবে।

এই ভুবনে হয়ত দেখা হবে না তাতে কি আমরাও তো এক সময় না এক সময় আসছি

বিদায় শুভ্র জ্যোতিক টিকাদার

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×