জিরো জিরো সেভেন, গ্যাসের মূল্য ও নিউজরুমের চাপ

  কাকন রেজা ০২ জুলাই ২০১৯, ১৯:১১ | অনলাইন সংস্করণ

জিরো জিরো সেভেন, গ্যাসের মূল্য ও নিউজরুমের চাপ
জিরো জিরো সেভেন, গ্যাসের মূল্য ও নিউজরুমের চাপ

এক.

‘গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদের খবরটা ধরিয়ে দিয়েন। আরে ভাই, জিরো জিরো সেভেন ক্রসফায়ারে, বড় মশলা, এইটা ছাড়া খিচুড়ি পাকবো কেমনে! গ্যাসের দাম বেড়েছে এটা তো ভাই জাতীয় ইস্যু। রাখেন, মিয়া ইস্যু। পাবলিক কী খায় দেখেন। দেখেন না, ফেসবুকের একজন কইছেন, জিরো জিরো সেভেন ক্রসফায়ারে না গেলে ক্রসফায়ারের যৌক্তিকতাই হারাইব। পাবলিক লইছে বিষয়টারে।’

হ্যাঁ, এটা নিউজরুমেরই কথোপকথন। এটাই আমাদের অবস্থা। কিছু কিছু মৃত্যু কিংবা ঘটনা খুব অ্যাডভান্টেজ পায় তাৎক্ষণিক ভিডিও থাকার ফলে। শুধু থাকলেই চলবে না, সেটা আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে হবে। তবেই কেল্লা ফতে। রিফাত সেই অ্যাডভান্টেজটা পেয়েছে।

রিফাতের ঘটনার পরদিনই ঠাকুরগাঁওয়ে একইভাবে হত্যা করা হলো তানজিনা আক্তার নামের এক তরুণী নার্সকে। সেই ‘জিরো জিরো সেভেন’ ধরণের বখাটের কোপে প্রাণ হারান সেই নার্স। কিন্তু কপাল মন্দ, এই হত্যার ভিডিও নেই, ভাইরাল হবার প্রশ্নও উঠে না। সুতরাং অতটা চাপও নেই নিউজরুমে। বলতে পারেন, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা।

নুসরাতের ঘটনাও তাই। তার কপাল ভালো সোশ্যাল মিডিয়া তাকে ভাইরাল করেছে। তার হত্যায় অভিযুক্তরা আজ কারাগারে। কিন্তু জান্নাতির ব্যাপারে কি ঘটেছে? তাকেও তো পুড়িয়ে মারা হয়েছে। কদিন আগেও একজন গেলেন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তার নামটাও বোধহয় এ মুহূর্তে কারো মনে পড়ছে না। আহারে, তাকে পোড়ানোর কোন ভিডিও নেই, থাকলেই হতো কেল্লা ফতে। অতএব, ভিডিওটা জরুরি। ইচ্ছা করলে কেউ কেউ ভিডিওগ্রাফার সঙ্গে রাখতে পারেন। ভবিষ্যতে কাজে দেবে।

দুই. আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি, যেখানে সামাজিক মাধ্যমে হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টার ভিডিও না থাকলে সেই হত্যার বিপরীতে মাধ্যমগুলো উত্তেজিত হয়ে ওঠে না। যেমন, বিএনপির সংরক্ষিত কোটার এমপি রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাকে দেখলেই বিপক্ষের লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠেন’।

কারণ রুমিন ফারহানার কথায় উত্তেজনা ছড়ানোর উপাদান রয়েছে। তেমনি প্রকাশ্য হত্যার ভিডিওতেও মানুষ উত্তেজিত হয়। আর সেই উত্তেজনা ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। টপ টু বটম। ষাঁড় নড়ে খুঁটির জোরে। তখন খুঁটির জোরটা থাকে পুরোদমে। ভ্যানচালক শাহিনের কথাই ধরেন না কেন। বাচ্চা ছেলেটাকে কুপিয়ে তার ভ্যানটা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শাহিনের কপাল ভালো তার বিষয়টিকে সামাজিক মাধ্যম ভাইরাল করেছে। তার কাজ হয়েছে। সে চিকিৎসা পাচ্ছে, ভ্যানটাও উদ্ধার হয়েছে। সঙ্গে অভিযুক্তও গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনজন।

আমার জেলা শেরপুর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, গুগল খুলে দেখুন তো গত এক বছরে কতজন সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক, ভাড়ার মোটরসাইকেল চালক খুন হয়েছেন। খুন করে তাদের রিক্সা-বাইক নিয়ে গেছে দুষ্কৃতিরা। এসব ঘটনার কটার ফলোআপ জানি আমি, আপনারা। জানি না তো। এই যে, ‘না জানা’ কিংবা ‘না জানতে দেয়া’ যেটাই হোক, তা আজকে আমাদের এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা বিচারে আস্থা হারিয়ে, আস্থা খুঁজে বেড়াচ্ছি ‘মব জাস্টিসে’, ‘লিঞ্চিং’য়ে!

তিন. আমি আগেও বলেছি আমাদের সয়ে নেয়ার ক্ষমতা অসীম। ‘শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাও তাই সয়’, এই প্রবাদটাকে আমরা করে নিয়েছি অনেকটা এরকম ‘বাঙালের নাম মহাশয়, যা চাপাবে তাই লয়’। না হলে কী এমন ঘটলো এক যুগে যে, আড়াইশ টাকার গ্যাসের চুলা, চলে গেল পৌনে এক হাজারে।

আয় বৃদ্ধির সঙ্গে এর অনুপাতের যৌক্তিক কোন মিল কি খুঁজে পাওয়া যায়? হয়তো জিডিপি গ্রোথের মতন কোন ব্যাখ্যায় পাওয়া যেতে পারে। তবে সেই গড় হিসাবের টাকা কিন্তু আমজনতার পকেটে ঢোকে না। সেই কাজীর কেতাবি গরুর মতন। কেতাবেই থাকে, গোয়ালে নয়। ভারত তাদের রান্নার গ্যাসের দাম কমিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী গ্যাসের দাম কমানো হয়েছে এমনটাই জানিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। আমাদের নিজেদের গ্যাস রয়েছে। সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম কমেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কেন আমাদের এই উল্টো যাত্রা? উত্তরে হয়তো শুনবেন, ‘ওটাতো এলপিজি’।

এখন প্রশ্নটা আরেকটু বাড়াতে পারেন, সিলিন্ডারের গ্যাসের দামের সঙ্গে সমন্বয়ের অজুহাতেই তো সিএনজি’র দামটা বাড়ানো হয়েছে। সিলিন্ডারে তো এলপিজি’ই থাকে। এলপিজি কি খনিজ গ্যাস নয়? এলপিজি’র সঙ্গে সিএনজি’র পার্থক্য হলো এটা বাতাসের চেয়ে ভারি এবং জমে থাকে অনেক নিচুতে। কিন্তু রুটটা তথা মূলটা হলো কিন্তু খনিই। দুই মায়ের সন্তান হলেও বাপটা মানে রুটটা এক। পুনশ্চ: সব অন্যায় আর দুর্নীতির রুটটাও কিন্তু এক।

কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×