ডাক্তার হয়েও আরেক ডাক্তারের শাস্তি চাচ্ছি!

  ডা. তারাকী হাসান মেহেদী ০৭ জুলাই ২০১৯, ২০:৫৮ | অনলাইন সংস্করণ

ডাক্তার হয়েও আরেক ডাক্তারের শাস্তি চাচ্ছি!
ভৈরব থানায় ডাক্তার কামরুজ্জামান আজাদ (সাদা শার্ট পরিহিত)। ছবি: যুগান্তর

অপারেশন টেবিলে রোগীর এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। এটা সুস্পষ্ট অপরাধ। তিন বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় জুয়েল মিয়ার বাম হাতের হাড় ভেঙে যায়। সে সময় কিশোরগঞ্জ ভৈরবের একটি ক্লিনিকে ডা. কামরুজ্জামান আজাদ তার হাতে স্ক্রু প্লেট লাগান, যা অপসারণ করার ডেট ছিল বৃহস্পতিবার।

রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে ডা. কামরুজ্জামান অপারেশনে সাহায্য নিতে চট্টগ্রাম থেকে গৌরাঙ্গ রায় নামে এক যন্ত্রপাতি সাপ্লাইয়ারকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করে আনেন।

অস্ত্রোপচার কক্ষে তখন ছিল তিনজন। সার্জন ডা. কামরুজ্জামান, অ্যানেসথেসিয়া দেয়ার জন্য ডা. ইমরান, আর অপারেশনে সাহায্য করার জন্য গৌরাঙ্গ। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া দেয়া নিয়ে ডা. কামরুজ্জামান আর ডা. ইমরানের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা দেয়। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্লক অ্যানেসথেসিয়া দেয়ার অপরাগতা প্রকাশ করেন ডা. ইমরান।

তখন গৌরাঙ্গ এসে অ্যানেসথেসিয়া দেয়ার কাজ শুরু করে। এর পরপরই রোগী জুয়েলের দেহ নিথর হয়ে পড়ে ও হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা যায়। (সূত্র: প্রথম আলো, ০৫ জুলাই ২০১৯)

এবার আসি মূল কথায়। গৌরাঙ্গর পরিচয় নিয়ে। মেট্রিক পাস গৌরাঙ্গ পেশায় হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অর্থোপেডিক অপারেশনের জন্য স্ক্রু, প্লেট, নাট বল্টুসহ নানা যন্ত্রপাতির সাপ্লাইয়ার।

যন্ত্রপাতির সাপ্লাইয়ার হওয়ার সুবাদে সে দীর্ঘদিন বিভিন্ন অর্থোপেডিক স্যারদের সঙ্গে থেকে কিছু কাজ শিখে ফেলে। এতে সেসব অর্থোপেডিক স্যারদেরও সুবিধা হয়৷ বেশি টাকা দিয়ে জুনিয়র ডাক্তারদের অপারেশন সহকারী না বানিয়ে অল্প খরচে তাকেই অপারেশনের সহকারী বানিয়ে নেন।

ধীরে ধীরে তারা এই গৌরাঙ্গর ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি অনেক হাসপাতালে তাকে ছাড়া কোনো বড় ধরনের অর্থোপেডিক অপারেশন হয় না। সে ফাঁকা না থাকায় অপারেশনের শিডিউল পর্যন্ত পাল্টে ফেলা হয়। এমনকি স্বয়ং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগে পর্যন্ত এমনটা হয়েছে। কিছু বড় বড় অর্থোপেডিক সার্জনরা পর্যন্ত তাকে তোয়াজ করে চলে। সেটা চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে ভৌরব পর্যন্ত চলে গেছে।

শুধু চট্টগ্রামেই নয়, অর্থোপেডিক অপারেশনে এরকম কিছু গৌরাঙ্গ প্রায় সারা দেশেই চোখে পড়ে৷ দেশে হাজার হাজার এমবিবিএস জুনিয়র ডাক্তার রয়েছে। অথচ কিছু কিছু বড় ডাক্তার স্যাররা অপারেশনে এসব গৌরাঙ্গ ছাড়া অন্য কাউকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিতে চান না।

সব কাজ গৌরাঙ্গদের দিয়ে করিয়ে শেষে অপারেশনের টাকাটা নিজের পকেটে ঢুকান। প্রতিদান হিসেবে গৌরাঙ্গদের সাপ্লাই ব্যবসা আরও শক্তিশালী হয়, তারা ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী হয়ে অর্থোপেডিক বিভাগে ছড়ি ঘুরাতে থাকে। এদের সাপ্লাইয়ার থেকে এতদূর আনার পেছনে আমাদের পূর্ববর্তী সিনিয়ররাই দায়ী। এভাবেই চট্টগ্রামে গৌরাঙ্গ, বগুড়ায় সুজন, রংপুরে বাবলু, পঙ্গু হাসপাতালে সাত্তারদের উত্থান।

কিছু সার্জনের লোভ এত বেশি যে সহকারী হিসেবে নেবেন ওটি বয়দের যাদের অপারেশন শেষে হাতে কিছু টাকা ধরে দিলেই খুশি। আবার তারা এর বিনিময়ে পরে তার জন্য রোগীও ধরে আনবে!

অপারেশন টেবিলে রোগীর মৃত্যু হতেই পারে নানা কারণে। কিন্তু ভৈরবের যে ঘটনা এটা সুস্পষ্ট ক্রাইম, অনেক বড় ধরনের অপরাধ। সবচেয়ে বড় কথা গৌরাঙ্গ একজন যন্ত্রপাতি সাপ্লাইয়ার। তাহলে এরকম পুরোপুরি নন-মেডিকেল ব্যক্তিকে ওটিতে ঢুকিয়ে তাকে অপারেশনে যুক্ত করা মানে হলো সেই রোগীকে ইচ্ছে করে হত্যা করা।

ঘটনা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে সেই সার্জনসহ গৌরাঙ্গকেও এমন শাস্তি দেয়া উচিৎ, যাতে পরবর্তীতে আর কেউ কখনও নন-মেডিকেল কাউকে দিয়ে অপারেশন করানোর সাহস না পায়। এভাবে যেন আর কেউ প্রাণও না হারায়।

লেখক: ডা. তারাকী হাসান মেহেদী, মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)।

ভৈরবে রোগী মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসক গ্রেফতার

ঘটনাপ্রবাহ : ডা. তারাকী হাসান মেহেদীর লেখাসমূহ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×