দ্যায়ার ওয়াজ নো ওয়ান লেফট টু স্পিক

  কাকন রেজা ১০ জুলাই ২০১৯, ১৮:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

চারিদিকে চলছে মৃত্যুর উৎসব
চারিদিকে চলছে মৃত্যুর উৎসব

একজন সাইকিয়াট্রিস্টের লেখা পড়লাম। তার ধারণা আমরা জাতি হিসাবে খুবই বুদ্ধিমান। একইসাথে তিনি ভীতিকর একটি সম্ভাবনার কথা বলেছেন, ‘সহসাই আমরা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী জাতিতে পরিণত হবো।’ কারণ হিসাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, খাদ্যসামগ্রীতে ভেজাল ও ক্যামিকেলের ব্যবহারকে।

একজন মনোবিশারদ হিসাবে তার এ পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা অনেকটাই ঠিক ছিল, তবে ঝামেলা লাগলো লেখার শেষ প্যারাতে। সেখানে তিনি ভেজাল ও ক্যামিকেল ব্যবহারকারীদের কঠিন শাস্তি এবং যেনতেন কঠিন নয় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড চাইলেন।

একজন মনোবিশারদ সাধারণত সমস্যার আগপিছু শুনে-জেনে তারপর কোন সিদ্ধান্ত দেন। হুট করে সিদ্ধান্তে আসা মনোবিশারদদের কাজ নয়। অথচ এই মনোবিশারদ সরাসরি ভেজালকারীদের ফায়ারিং স্কোয়াডে দিয়ে দিতে চাইলেন। অথচ একটিবার ভাবলেন না, এই ভেজাল প্রক্রিয়ায় কি তারা একাই দায়ী? তাদের আগে পিছে কি কেউ নেই?

আমাদের দেশে কথায় কথায় মৃত্যু প্রার্থনাটা প্রচলিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাও এক ধরণের মনোবৈকল্য। জানি না, সাইকিয়াট্রিস্ট সাহেব মনোবিজ্ঞানের এই অধ্যায়টি ভুলে গিয়েছেন কিনা! না হলে, তিনি কিভাবে আরও অনেকের মতই মেতে উঠতে চাইলেন মৃত্যু উৎসবে। আমাদের দেশে মৃত্যু এখন উৎসবই।

নয়নবন্ড গুলিতে মারা গিয়েছে, এলাকায় এলাকায় মিষ্টি খাওয়া হয়েছে, উল্লাস হয়েছে। অথচ নয়নবন্ডকে যে তৈরি করলেন, তাকে ভুলেও ছোঁয়ার সাহস রাখেন না এই উল্লাসকারীরা। এক নয়নবন্ড গিয়েছে তাতে কি হয়েছে, বিকল্পে আরও দশ নয়নবন্ড সৃষ্টি করবেন সেই বন্ড সৃষ্টির কারিগর।

এক বন্ডের জায়গায় দশ বন্ড আরও দশ রিফাতকে হত্যা করবে। এরমধ্যে হয়তো দু’একজন আবার ক্রসফায়ারে যাবে, আবার মিষ্টি খেয়ে উল্লাস করবেন সেই মিষ্টিখেকোরা। মৃত্যু হয়ে উঠবে উৎসবের উপসর্গ।

মানুষ মেরে ফেলা এখন খুব সহজ। আমি সাংবাদিকতা করি, আমার ছেলেও সাংবাদিকতা করতো। ট্রেনে আসার সময় আমার ছেলে ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনকে (ফাগুন রেজা) মেরে ফেলে দেয়া হয়েছে। ট্রেনে অনেক লোক ছিল, কেউ বাধা দেয়নি।

এমনকি জানায়নিও পুলিশকে কারা এর জন্য দায়ী। নিজেরা ঝামেলা নিতে চায়নি। অথচ আমার ছেলের খুনিদের ক্রসফায়ারে দেয়া হলে, তারাই হয়তো মিষ্টি খাবে উল্লাস করবে। অথচ সে সময় রুখে দাঁড়ালে আমার ছেলেও বাঁচতো, বাঁচতো রিফাতও। এই ‘মৃত্যু উৎসবে’র উপসর্গ সৃষ্টি হতো না।

না, আমি দোষ দেই না কারো। যে দেশে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট ফায়ারিং স্কোয়াডে মানুষের মৃত্যু কামনা করেন, বিচার কামনা না করে, সেই দেশে মৃত্যুটা উৎসব হয়ে উঠাই স্বাভাবিক। উৎসব প্রবণ আমাদের জাতি। তাদের প্রয়োজন একটা উপলক্ষের। অন্য কিছু না পেলে মৃত্যুটাই সহি। প্রাচীন মিশরে যেমন হতো।

পিরামিডে ফারাওদের কবরস্থ করা ছিল রীতিমত বিশাল কর্মযজ্ঞ, এক করুণ উৎসব। আমরাও এখন মিশরের ফারাওদের রীতিনীতি অনুসরণ করে মৃত্যুকে উৎসবে রূপান্তরিত করেছি।

কেন একজন নয়নবন্ড গড়ে উঠে, সে কারণটা না খুঁজে আমরা নয়নবন্ড নিধনে মেতেছি। একজন ছোটখাটো মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যুতে মূল হোতাদের কোন কিছু যায় আসে না। একজনের বিকল্পে তারা পাঁচজনকে দাঁড় করায়। একজনের মৃত্যুর পর আবার বন্দুক ঘুরে বেড়ায় সেই পাঁচজনের পিছে।

সেই পাঁচজনের বদলে আবার তৈরি হয় পঁচিশ জন। আমার মৃত্যু ঘটে, উল্লাস হয়। বুক ফুলিয়ে কেউ বলেন, ‘দেখো কেউ পার পাবে না’। চলতে থাকে মৃত্যুর এই বৃত্তবন্দী খেলা, উল্লাস আর উৎসব। এর যেন শেষ নেই। এভাবে এই নিষ্ঠুর উৎসবের ইতি হতে পারে না।

এর শেষ হওয়ার রাস্তা একটিই, আমাদের জেগে উঠতে হবে। একত্রিত হতে হবে মজলুম মানুষদের। ইতিহাস বলে প্রতিটা বিপ্লবই সফল হয়েছে যখন মজলুমরা একত্রিত হয়েছে। ধর্মও বলে, মজলুমদের প্রতি রয়েছে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। এখন শুধু জেগে উঠার বাকি।

আর জেগে না উঠতে পারলে, নিজেদেরও হয়তো একদিন মৃত্যুর উপসর্গ হতে হবে। সেই মৃত্যুকে ঘিরে ঘটবে আরেক মৃত্যু, হবে আরেকটা উৎসব। একসময় এমন দিন আসবে হয়তো উৎসব করারও কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না। ওই যে বলি, ‘দ্যায়ার ওয়াজ নো ওয়ান লেফট টু স্পিক’।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : কাকন রেজার কলাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×