‘বিএমডব্লিউ’র শো-রুম এবং ‘হরিলুটে’র কথকতা

  কাকন রেজা ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

‘বিএমডব্লিউ’র শো-রুম এবং ‘হরিলুটে’র কথকতা

‘বিএমডব্লিউ সেভেন সিরিজ এখন বাংলাদেশে’, এটা বাংলাদেশি গণমাধ্যমের একটি শিরোনাম। এতে অনেকে বিস্মিত হবেন না, কিন্তু আমি হয়েছি। একসময় বাংলাদেশে হাতেগোনা কজন ধনী লোক ছিলেন, যারা বিদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে গাড়ি আমদানি করতেন।

এটা ছিল বিত্ত-বৈভবের বিশেষ প্রদর্শনী। ‘বিএমডব্লিউ’ তখন ছিল স্বপ্নের মতন। এখন সেই স্বপ্ন হকিকতে রূপ নিয়েছে। ‘বিএমডব্লিউ’র গাড়ি এখন বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে। এটা আমাদের মত ছা-পোষার জন্য একাধারে বিস্ময় এবং হুতাশনের বিষয়।

যারা বিস্মিত হননি তারা বলবেন, এতে বিস্মিত বা হুতাশনের কি আছে, দেশ এগিয়েছে এটা তারই প্রমাণ। এই শ্রেণিটি মূলত ইতিহাস বিমুখ। নাইজেরিয়ার সাম্প্রতিক অতীত তারা বিস্মৃত, না হয় জানা নেই। তেল সমৃদ্ধ দেশটিতে হঠাৎ একশ্রেণীর নব্যধনিকের জন্ম হয়েছিল।

মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ এসবের আধিক্য দেখা দিয়েছিল অনেকটা আমাদের মতই। সে অবস্থাকে উন্নতির পরাকাষ্ঠা বলেও উপস্থাপন করা হয়েছিল। অথচ এখন নাইজেরিয়ার অবস্থা কী? এখন তো সেখানে গাড়ি রাখলে গাড়ির চাকাও চুরি হয়ে যায়।

বালিশ, পর্দা, সাইনবোর্ডসহ নানা কাণ্ডে ‘হরিলুটে’র কিয়দংশ প্রমাণ আমরা পেয়েছি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগাভাগি ও ‘ন্যায্য পাওনা’র গল্পও আমাদের শোনা হয়েছে। সাথে শুনেছি দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতায় উপাচার্যের পারিবারিক উপাখ্যান। আচার্য শব্দটি ধর্ম শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট।

সংস্কৃত শিক্ষালয়ের প্রধানকে বলা হতো আচার্য। সে অর্থে একজন আচার্যের পুত-পবিত্র থাকার ধারণাটি সঙ্গত। উপাচার্য বিষয়টিও তাই। বিপরীতে উপাচার্যদের যে গল্প-কাহিনী শুনছি তাতে তো ‘টাস্কি’ খাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এমন সব গল্প থেকেই ‘বিএমডব্লিউ’ কেনো বাংলাদেশে শো-রুম খুলেছে তার কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়।

আরেকটি ধারণার কথা বলি, দেড় হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প। যা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে করা। বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে এক হাজার দুই’শ কোটি আর বাকিটা আমাদের অর্থায়ন। সেই প্রকল্পের সাতান্ন কোটি টাকা ইতোমধ্যে নাই হয়ে গেছে। অথচ প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

‘টেকসই বন ও জীবিকা নির্বাহ’ নামক এই প্রকল্পটি অবশ্য কাগজে-কলমে শুরু হয়েছে চৌদ্দ মাস আগে। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ অন্তত তাই জানিয়েছে। গণমাধ্যমটি বলেছে, সাতান্ন কোটি টাকার একটি বড় অংশ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে খরচ হয়েছে।

বিদেশ সফর বিষয়টি আমাদের দেশের বড়কর্তাদের বড় পছন্দের বিষয়। নানা কারণে তারা বিদেশ যান। মশা মারা শিখতে যান, পানি নিষ্কাশন শিখতে যান, ক্যামেরা দেখতে যান, বনের পশুপাখি সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে যান, আরও নানা বিষয়ে তারা বিদেশ যান। সুযোগে কারো পরিবার-পরিজনের বিদেশ ভ্রমণটাও হয়ে উঠে।

শুধু বিদেশ ভ্রমণ বলে কথা, ক্ষেত্র-বিশেষে রয়েছে মোটা অংকের ভাতাও। সেই ভাতা দিয়ে গাড়ি কেনার খাতাটা খোলাও অসম্ভব নয়। উল্টোদিকে ‘গাল্লি বয়’ খ্যাত পথশিশু রানার গানের কথা বলি। ‘ভাইরাল’ হওয়া গানটিতে এ পথশিশুটি বলছে, ‘শিক্ষার আলো নাকি ঘরে ঘরে জ্বলবে, আমাদের ঘর নাই সে কথা কে বলবে।’

এখানে যে ‘কনট্রাস্টে’র কথা উদ্ধৃত হয়েছে, যে বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয়েছে, যারা তা অনুভব করেন, ‘বিএমডব্লিউ’র শো-রুম খোলার কথায় তাদের বিস্মিত হবারই কথা। আর যারা বিস্মিত হন না, তারা বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা থেকেই হন না। যেহেতু বিদেশের দামী গাড়ি দেখে তাদের অনুভূতি অভ্যস্ত হয়ে উঠে, তারা ‘টিউনড’ হন উন্নতি আর উন্নয়নের সঙ্গে।

কিন্তু আমরা যারা ‘গাল্লি বয়’ রানা’র গানে অভ্যস্ত আমাদের অভ্যস্ততা সঙ্গতই বিপরীতমুখী। অনেকেই বিদেশ সফরের ছবি, ‘পশ’ রেস্তোরাঁ আর খাবারে ছবি, কেনাকাটার ক্যামেরাবন্দী দৃশ্য সামাজিকমাধ্যমে আপলোড করে আনন্দিত হন। কখনো দেন সদ্য কেনা ‘বিএমডব্লিউ’র ছবি।

মনে মনে বলেন, ‘দেখ ব্যাটা আমি কত বড় ইয়ে’। মানুষকে ‘জেলাস’ করার গুটিকয়েকের এই প্রক্রিয়া সামাজিক বিপন্নতা ঢেকে আনে। এ প্রক্রিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ঈর্ষান্বিত করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিশোধ প্রবণ করে তোলে। তলে তলে ক্ষোভ বাড়তে থাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি। এক সময় তা বিস্ফোরিত হয়, ইতিহাস অন্তত সেই কথাই বলে।

পুনশ্চ: লুটেপুটে খাওয়ার ইত্যাদিসব চিত্র আমাদের ক্ষুধার্ত চোখে এখন ক্রম দৃশ্যমান। যেখানে একজন শিক্ষক, যিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও, সে এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে যখন ‘হরিলুটের’ বখরা’র উপেক্ষা অযোগ্য অভিযোগ উঠে তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক। প্রশ্ন উঠে রাজনৈতিক বিপন্নতার।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×