জীবন দিয়ে চরম সংকটের বার্তা দিয়ে গেলেন আবরার ফাহাদ

  এ টিএম নিজাম ১০ অক্টোবর ২০১৯, ০২:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

বন্ধুদের সঙ্গে আবরার ফাহাদ। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
বন্ধুদের সঙ্গে আবরার ফাহাদ। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

এবার বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ সহপাঠীদের হাতে জীবন দিয়ে জাতিকে শিক্ষাঙ্গনে সভ্যতার চরম সংকট বিরাজের বার্তা দিয়ে গেলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের জেরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের পরিচয় বহনকারী তারই সহপাঠী শিক্ষার্থীরা আবরারকে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

এ বীভৎস ঘটনায় জাতি বিস্মিত হয়েছে। আতঙ্কগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবক, সুশীল সমাজসহ নানা মত-পথের সচেতন নাগরিক সমাজ। এ ঘটনার পর নিন্দা-ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিচার দাবির ঝড় ওঠেছে সেই সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ভিন্নমত দমনের এ নারকীয় কৌশলকে কেউই মেনে নিতে পারছেন না। এ ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেরা কেদেঁছেন, গোটা জাতিকেও কাঁদিয়েছেন। জ্ঞান আহরণের পাশাপাশি শৃঙ্খলাবোধ ও চরিত্র গঠনের জন্য যে বিদ্যাপীঠে প্রবেশ, সেই বিদ্যাপীঠের এহেন অবস্থাকে সভ্যতার সংকট হিসেবে দেখছেন অনেকে। আর সে সংকটের কারণ হিসেবে উঠে আসছে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্কুল -কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কথা।

আলোকিত মানুষ হতে সর্বোচ্চ এসব বিদ্যাপীঠে প্রবেশকারী মেধাবী শিক্ষার্থী এবং মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের একাংশের অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিত্তবৈভবের উচ্চাবিলাস আজ দেশব্যাপী আলোচিত বিষয়।

সাম্প্রতিককালে মিডিয়া-সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জাতির সামনে এসব অপকর্ম ও কুকীর্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ওঠে এসেছে রাজনীতি, গণতন্ত্র ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির নানাবিধ মতামত এবং সমালোচনা। উঠে এসেছে এসবের রাশ টেনে না ধরা গেলে ভয়ঙ্কর ও বীভৎস পরিণামের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ইশারা। এ-সব ঘটনার আর উদাহরণ টানবার অপেক্ষা রাখে না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার (Freedom of expression) জন্য ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি সর্বজনবিদিত, "তোমার মতের সঙ্গে আমার দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে পারি।"

এছাড়া এ কথা বলা যায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জন্মগত অধিকার নয়, আামাদের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল স্বীকৃতও বটে। এ দৃষ্টি ভঙ্গি থেকেই আধুনিক চীনের জনক মহামতি মাও সে তুং ১৯৫৬ সালে সামাজিক তাড়নার মুখে "শত ফুল ফুটতে দাও" নীতি গ্রহণ করেন।

তখন থেকেই বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল লোকজন মুক্তপ্রাণে লেখালেখির করার এবং মত প্রকাশের সুযোগ পান। কেননা জাতির ভিত রচনায় এ শ্রেণি-পেশার মানুষের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সরকার, সংসদ, বিরোধী দল, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের বাইরেও যে, জাতির ভিত এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ওই মুক্ত প্রাণ বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও চিন্তাশীল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আজ নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ তাগিদ অনুভবের সময় বয়ে যাচ্ছে।

এখানে চেতনাগত ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকার কোনো কারণ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি, খুন-গুম, ধর্ষণ-নির্যাতন,সন্ত্রাস -নৈরাজ্যে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অর্থসম্পদ লুঠের কারণে নাগরিক সমাজে নাভিশ্বাস উঠার নিষ্ঠুর পরিণতির বার্তা এবং পথ প্রদর্শন করে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করতে ওই শ্রেণির আরও সরব ভূমিকা জরুরি হয়ে ওঠেছে। এহেন পরিস্থিতিতে কবিগুরু রাবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের অশীতিবর্ষপূর্তি উৎসবের অভিভাষণ সভ্যতার সংকট প্রবন্ধের "সিভিলিজেশন" এর আক্ষরিক ও তাত্বিক ব্যাখ্যা এবং পরিণতি সম্পর্কে হুশিয়ারি প্রণিধান যোগ্য।

১৯৪১ সালের ১৪ এপ্রিল উপনিবেশিক ইংরেজ শাসনামলে উদয়নে জন্মদিনের অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি সাহিত্য, (সিভিলিজেশন) শিষ্টাচার, শিক্ষা এমনকি মানবিকতা বোধের কিছু কিছু বিষয়ের প্রশংসা করেছিলেন বটে। তবে তিনি বলেছিলেন,"সিভিলিজেশন" যাকে আমরা সভ্যতা নাম দিয়ে তরজমা করেছি তার যথার্থ প্রতিশব্দ আমাদের ভাষায় পাওয়া সহজ নয়।

এই সভ্যতার যে রূপ আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল মনু তাকে বলেছেন সদাচার। অর্থাৎ, তা কতকগুলি সামাজিক নিয়মের বন্ধন। সেখানে তিনি সরস্বতী ও দৃশদবতী নদীর মধ্যবর্তী বিখ্যাত ব্রহ্মাবর্ত দেশের পারম্পর্য ক্রমে চলে আসা আচারকেই সদাচার বলেছেন।

আর এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, এই আচারের ভিত্তি প্রথার ওপরেই প্রতিষ্ঠিত- তারমধ্যে যত নিষ্ঠুরতা, যত অবিচারই থাক। এই কারণে প্রচলিত সংস্কার আমাদের আচার-ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিয়ে চিত্তের স্বাধীনতা নির্বিচারে অপহরণ করেছিল। এখানে রবীন্দ্রনাথের চিত্তের স্বাধীনতা অপহরণের বার্তা ভারতবাসীর দৃষ্টিভঙ্গির অবিশ্বাস্য পরিবর্তন আনে। একটি কথা মনে রাখা জরুরি যে , গতকাল যেমন আজকের নিয়ন্ত্রণে - ঠিক তেমনি আজও কিন্তু আগামীকালের নিয়ন্ত্রণে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা,অমোঘ সত্য ।

তবে, ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, ইতিহাস কেউ মনে রাখে না। এসব কারণেই ভারতবর্ষে বৃটিশ সূর্য ডুবার প্রাক্কালে জীবনের শেষ অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ সতর্ক বার্তা ও হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, " এই কথা আজ বলে যাব, প্রবল প্রতাপশালীরও ক্ষমতার মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে, নিরাপদ নয় তারই প্রমাণ হবার দিন আজ সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে ; নিশ্চিত এ সত্য প্রমাণিত হবে যে - অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশ্যতি। ততঃ সপত্নান্ জয়তি সমূলস্ত্ত বিনশ্যতি।"

মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রতিপক্ষ দমনে নিপীড়ন-নির্যাতন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে আবরার ফাহাদের নিষ্ঠুর পরিণতিই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সুতরাং, এ ধরনের কোনো অবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটুক এমন আকুতিই শান্তিপ্রিয় নাগরিক সমাজের সোশ্যাল মিডিয়া ( ফেসবুক) স্ট্যাটাসে উঠে এসেছে।

দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। উচ্চারিত হোক " চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ সেথা শির" আদর্শ ও চেতনাকে বুকে ধারণ করে দেশ ও সমাজ এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র।

লেখক: এ টিএম নিজাম, যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ

ই-মেইল: [email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×