ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই সমাধান

  এ টি এম নিজাম ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

আবরার ফাহাদের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে বুয়েট শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি। ছবি: যুগান্তর
আবরার ফাহাদের খুনিদের ফাঁসির দাবিতে বুয়েট শিক্ষার্থীরা নানা কর্মসূচি পালন করে। ছবি: যুগান্তর

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনা জাতির সামনে নতুন করে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির ভয়ঙ্কর চেহারা উন্মোচন করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনীতির মূলধারার আদর্শিক ও নৈতিক সংকটের কারণে আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির ধারাও বারবার পথভ্রষ্ট হচ্ছে। আদর্শিক ও নৈতিকতার ভিত্তির ওপর না দাঁড়িয়ে বলপ্রয়োগ ও পেশিশক্তির ব্যবহারে এ ধরনের অনভিপ্রেত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

যে রাজনীতি গোটা ছাত্র সমাজের অধিকার ও দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেই আন্দোলন রূপ নিচ্ছে প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমত দমনের ঘৃণ্য প্রতিযোগিতায়। যে ছাত্র সংগঠনটির প্রাণপুরুষ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুষ্টির চাল সংগ্রহ করতেন, লজিং এর ব্যবস্হা করতেন, সেই ছাত্র সংগঠনের আজকের এ অবস্থা গোটা জাতির জন্য লজ্জা বয়ে আনে বৈকি।

ছাত্র রাজনীতির এ কলঙ্কিত অধ্যায় আজ জাতীয় -আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শীর্ষ শিরোনামে ঠাঁই পেয়েছে। প্রতিদিনই বেরিয়ে আসছে নির্যাতনের যতসব লোমহর্ষক কাহিনী। আবিষ্কার হচ্ছে বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন 'টর্চার সেল'-এর অস্তিত্ব। আর এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায় বটে। তাই বলে এসব ভয়ঙ্কর রাজনীতি পরিপন্থী ঘটনা এবং উদ্ভবের কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকারের ব্যবস্হা না করে রাতারাতি বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা মোটেই সমীচীন নয়।

কেন না, এ রাজনীতি বন্ধ করতে হলে শুধু বুয়েট কেন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বন্ধ করতে হবে। এ সিদ্ধান্ত মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলারও শামিল বটে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের দেশের ছাত্র রাজনীতির রয়েছে বর্ণাঢ্য গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রাম এমনকি জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকার গর্বিত ইতিহাসগাথা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, '৫৪র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৬২র শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, '৬৬র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, '৬৯র গণঅভ্যুত্থান, '৭০-এর নির্বাচন, '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং '৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এ সবই সচেতন ও দায়িত্বশীল ছাত্র রাজনীতির এবং স্বদেশ প্রেমের অনন্য ও স্মরণীয় অধ্যায়ের ঐতিহাসিক স্মারক বহন করে।

স্বাধীনতাপূর্ব স্বৈরাচারী পাকিস্তান সরকারের মদদপুষ্ট এনএসএফ'র নিপীড়ন-নির্যাতনও পিছু হটাতে পারেনি আদর্শিক ও নৈতিকভাবে গড়ে ওঠা ছাত্র রাজনীতিকে। অবশ্য, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার নারকীয় ঘটনার অব্যবহিত পর থেকেই এনএসএফের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ক্ষমতাসীন সমর্থিত ছাত্র সংগঠন।

তবে, পরবর্তী সময়ে ছাত্র সমাজ নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দল-মত নির্বিশেষে একসারিতে এসে দাঁড়ায়। তাদের যুগপৎ দুর্বার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন হয়। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক তৈরির কারখানা হিসেবে বিবেচিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের কর্মকাণ্ড রহস্যজনক কারণে বন্ধ রাখা হয়। আর এ সুদীর্ঘ সময় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে বঞ্চিত থাকে।

ছাত্র রাজনীতির এ বন্ধ্যাত্বের সুযোগ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সেনা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অরাজনৈতিক লোকজনের একটি বড় অংশ রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। কোঠারি স্বার্থের রাজনীতির চক্করে আজ আদর্শিক ও নৈতিক সংকটে পরে ঘূরপাক খাচ্ছে ছাত্র রাজনীতি।

এ টালমাটাল অবস্থায় আবারও কলঙ্কবিদ্ধের অপবাদে ছাত্র রাজনীকে দূরে ঠেলে দেয়ার একরকম প্রয়াস বলা যায়। সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশকারী মুখ চেনা রাজনীতিকরাও আজ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। তাদের অনুপস্থিতিতে রাজনীতির হাল ধরার যোগ্য নেতৃত্বের সংকটের মুখোমুখি হবে জাতি। পর্যায়ক্রমে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এ ধরনের পদক্ষেপ ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকটকেরই অশনিসংকেত মাত্র।

কিন্তু ইতিহাস ও সমাজ দর্শন ভিন্ন কথা বলে। বিখ্যাত চৈনিক ধর্মগুরু,সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক কনফুসিয়াস'র মতে, "সেই সরকারই সেরা, যে ঘুষ ও বলের পরিবর্তে আচার-আচরণ ও মানুষের নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। যদি শাস্তির মাধ্যমে সমতা আনয়নকারী আইন দ্বারা জনগণ পরিচালিত হয়, তাহলে তারা শাস্তি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো লজ্জা থাকবে না। কিন্তু তারা যদি আচরণ ও নীতি-নিয়মের শুদ্ধতা থেকে সৃষ্ট সৎগুণ সমতা দ্বারা পরিচালিত হয়, তাহলে তাদের মধ্যে লজ্জাবোধ থাকবে এবং তারা ভালো হয়ে পড়বে।

এই লজ্জাবোধ থেকেই দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হবে, যার ফলে আইন অনুযায়ী মন্দ কাজের পর শাস্তির পরিবর্তে মন্দ কাজ করার পূর্বেই শাস্তির কথা মনে হবে।"

এ ক্ষেত্রে তিনি আরও বলেছেন, "একটি নিপীড়ক সরকার বাঘের চেয়েও অধিক ভীতিকর। নিজের ক্ষেত্রে তুমি যা ঘটতে দেখতে চাও না, অন্যের ক্ষেত্রেও তা ঘটিও না। অন্যায়ভাবে ধনদৌলত ও সম্মানপ্রাপ্তি ভাসমান মেঘের মতো, যা অতি ক্ষণস্থায়ী। "

সুতরাং, মনে রাখতে হবে রাজনীতিকে তার আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আদর্শিক ও নৈতিক ভিতের ওপর গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: এ টি এম নিজাম

যুগান্তরের কিশোরগঞ্জ ব্যুরো চিফ

ঘটনাপ্রবাহ : বুয়েট ছাত্রের রহস্যজনক মৃত্যু

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×