পুরস্কারটা পরিষ্কার নয়

  মুরশিদুজ্জামান হিমু ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ১৯:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

পুরস্কারটা পরিষ্কার নয়

লি ডাক থো। খুব বেশি পরিচিত নাম নয়। কিন্তু এই ব্যক্তিই এক সময় তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। ভিয়েতনামের এই রাজনীতিবিদকে ১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।

কিন্তু ডাক থো তো বুকের পাটাওয়ালা লোক। সোজা বলে দিলেন, তিনি পুরস্কার নেবেন না। কেন নেবেন না? ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতার জন্য তাকে মনোনীত করা হয়েছে। তার ওপর আবার পুরস্কার পেয়েছেন ঝানু রাজনীতিবিজ্ঞানী কিসিঞ্জারের সঙ্গে।

তবুও নেবেন না? উত্তর, না। লি ডাক থো’র বক্তব্য, যুদ্ধবিরতি হয়েছে মাত্র, শান্তি তো ফেরেনি। তাই নোবেল নয়। পুরস্কার পেলেই যে একেবারে আবেগে কাত হয়ে তা নিতে হবে, তার কোন যুক্তি নেই।

ডাক থো হয়ত ভেবেছিলেন, এই পুরস্কার গ্রহণ ভবিষ্যতের কাছে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। তাই নোবেল হলেও স্ব-সম্মানে তা ফিরিয়ে দিয়ে ইতিহাসের এক অন্য ক্যাটাগরিতে স্থান নিয়েছেন।

নোবেলের সঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের তুলনা করা ঠিক হবে না। তবে, জাতীয় প্রেক্ষাপটে তা তো ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। আদতে বড় অর্জনই বটে। আলোচনার বিষয়, এবার তেমন পুরস্কারই ফিরিয়ে দিয়ে ডাক থো’র পদাঙ্ক ছুঁয়ে ফেললেন অভিনেতা মোশাররফ করিম।

তিনি ২০১৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কৌতুক অভিনেতা ক্যাটাগরিতে যৌথভাবে সেরা হয়েছেন। সিনেমার নাম ‘কমলা রকেট’। সিনেমাটির বেশ নামডাক হয়েছে। দেশে মানুষ দেখেছে, বিদেশেও ভালই কামিয়েছে সুনাম।

সেই সিনেমার অন্যতম চরিত্রের জন্য অ্যাওয়ার্ড। কিন্তু স্বয়ং শিল্পী যখন বলেন, যে ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, আদতে সিনেমার সেই চরিত্র, পুরস্কারের ক্যাটাগরির সঙ্গেই যায় না; মানে কোনভাবেই তা কৌতুক অভিনেতার চরিত্র নয়, তাহলে তো পুরস্কার নিয়েই আরও অনেক প্রশ্ন ওঠে।

আচ্ছা শিল্পীর কথা বাদ দিলাম। ধরে নিলাম, মোশাররফ করিম নিজেকে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। ভীষণ সিরিয়াস অভিনেতা, অথচ দেয়া হচ্ছে মানুষ হাসানোর জন্য পুরস্কার, তাই প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন।

তাহলে সিনেমার যিনি স্ক্রিপ্ট রাইটার, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামান’র একটি মন্তব্য জানাই। তিনিও মোশাররফ করিমের কৌতুক অভিনেতা ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বেশ বিব্রত।

বলেছেন, যখন চরিত্রটি রচনা করেন তিনি, তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি, তা কমেডি কিছু হবে বা হয়েছে। চরিত্রটি নিঃসন্দেহে বহুস্তরি। তাই পুরস্কার প্রাপ্তির খবর তাকে যেমন বিস্মিত করেছে, করেছে কৌতুকাচ্ছন্ন-ও।

কমলা রকেট দেখেছেন, এমন একাধিক সিনেমা বুঝনেওয়ালা ব্যক্তির কাছেও প্রশ্ন করেছি। তারাও আর যাই হোক, মোশাররফ করিমের চরিত্রটিকে শুধুমাত্র হাসির খোরাক যোগানোর কোন চরিত্র বলে মানতে নারাজ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অভিনেতা বলছেন, গল্পের রচয়িতা বলছেন, যারা সিনেমা দেখেছেন, তারাও একই কথা বলছেন। তাহলে কোন যুক্তিতে এই পুরস্কার? নাকি অভিনেতা বা লেখকই বোঝেননি যে কোন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বা কী লিখেছেন?

জুরি বোর্ডের কাছে উত্তর জানার সবিনয় নিবেদন। তাই শেষ পর্যন্ত যদি জাতীয় পুরস্কারের ‘লোভ’টি মোশাররফ করিম সংরবণ করতে পারেন, তাহলে ৫০-১০০ বছর পর হয়ত লি ডাক থো’র মত তাকে নিয়েও কেউ লিখবেন।

সবসময় পুরস্কার নিয়েই যে সবাই ইতিহাস রচনা করবেন, তা কেন হবে? যথাযথ না হওয়ায় পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েও তো ইতিহাস রচনা করা যায়। মোশাররফ করিম শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে মন্দ হবে না।

লেখক: মুরশিদুজ্জামান হিমু, সাংবাদিক, [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×