কৃষির উন্নয়নে ৭ প্রস্তাব

  প্রদীপ অধিকারী ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:৫১ | অনলাইন সংস্করণ

ধার করা প্রযুক্তি দিয়ে ধান চাষ হবে না

ধানের বাজার মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক, এ কারণে ধান চাষীরা মহাসংকটে। সংকট উত্তরণের শেষ পন্থা ব্যয় হ্রাস, শেষ অবলম্বন প্রযুক্তির ব্যবহার। যদিও অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে উঠা নগরে, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যেমন দুঃসাধ্য, তেমনি অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা কৃষিক্ষেত্রে, আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার তেমনি দুঃসাধ্য। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি হতে হবে একান্তই নিজস্ব আঙ্গিকে, ভূ-প্রাকৃতিক আবহাওয়ার নিরিখে, প্রয়োজন, পারিপার্শিকতার সাপেক্ষে, বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য এবং গবেষণার ভিত্তিতে। কোনো ধার করা প্রযুক্তি এখানে লাগসই-ব্যবহারযোগ্য হবে না।

ধান চাষীদের অস্তিত্বসংকটের সুযোগে, কৃষিপ্রযুক্তি আমদানিকারক সিন্ডিকেট, উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের তকমা ব্যবহার করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপযোগী বিস্তর যন্ত্রপাতির বিজ্ঞপ্তি-বক্তৃতা-প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী সাফল্যের ফিরিস্তি এবং এসব ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকি প্রদানের আশ্বাস এক ধরণের মরীচিকা-আই ওয়াশ।

সরকারের সদিচ্ছা থাকলে প্রচলিত ক্ষেত্র যেমন বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ যন্ত্র, সেচ যন্ত্রে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ডিজেল অথবা সৌর শক্তি চালিত পাম্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা করলে আমরা সরাসরি উপকৃত হব, ধানের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে।

ধান চাষের পর্যায়গুলো হচ্ছে বীজ, জমি চাষ, সেচ, বীজতলা তৈরি, বীজ বপন বা চারা রোপন, আগাছা পরিষ্কার, সার-কীটনাশকের ব্যবহার, ধান কাটা, ধান খোলায় নিয়ে আসা, ধান মাড়াই, ধান শুকানো, ধান উড়ানো, খর শুকানো, খর সংরক্ষণ, ধান-বীজ সংরক্ষণ, ধান বাজারজাত করণ। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ব্যবহৃত আলোচ্য যন্ত্রপাতিগুলো হচ্ছে, চাষের ক্ষেত্রে পাওয়ার টিলার, হুইল ট্রাক্টর, সেচের জন্য গভীর-অগভীর নলকূপে ব্যবহৃত পাম্প, ধান বোনার জন্য ড্রাম সীডার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ধান কাটার জন্য রিপার, হার্ভেস্টার, ধান মাড়াইয়ের জন্য থ্রেসার, কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার নিড়ানির জন্য উইডার ইত্যাদি।

ধান চাষে প্রযুক্তির ব্যবহারের যোগান জোরালো হয়েছে ধানকাটাকে কেন্দ্র করে। যন্ত্রপাতি ব্যবসায়ীরা সোচ্চার হয়েছেন রিপার, হার্ভেস্টার, কম্বাইন হার্ভেস্টার ইত্যাদি ধান কাটা একই সংগে মড়াই করা, ইত্যাকার নানা কৌশলের যন্ত্রপাতি নিয়ে। চলছে বিস্তর বিজ্ঞাপন-বক্তৃতা-প্রদর্শনী।

আমাদের কৃষি অভিভাবকগণও তাদের সঙ্গে সুর মিলাচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই যন্ত্রগুলো কি আদৌ আমাদের ধান কাটার উপযোগী? ধরা যাক রিপার যন্ত্রটি, ধানকেটে জমিতে ফেলে রাখে। এতে শ্রম লাঘব হলো, না আরও বেড়ে গেল?

বাস্তব অভিজ্ঞতা হচ্ছে ধান কাটা শ্রমবহুল কাজ নয়। প্রকৃত শ্রমটা হোলো, ৩ গুছি করে ধান কেটে ১ টি করে আঁটি বাঁধতে হয়, আঁটিগুলো দিয়ে আবার বোঝা বাঁধতে হয়, যার ওজন হয় ৬০ কেজি থেকে প্রায় ১০০ কেজি। এই বোঝা বয়ে নিয়ে আসতে হয় ধানের খোলায়, মাড়াই কলে। সরু পিচ্ছিল আলপথ, ড্রেন, প্রায় ৪৫০ক্যাল/বর্গ সেমি সৌরতাপ , জল-কাদা ডিঙ্গিয়ে এ বোঝা বয়ে আনার শ্রম বড্ড নিষ্ঠুর। হাড়-মাংসে শুরু হয় ঘুর্ণিঝড়। যদি দয়া হয়, এই শ্রম লাঘবের প্রযুক্তি দিন। সেটা অবশ্যই কম্বাইন হার্ভেস্টার নয়, যা জমি থেকে শুধু ধানটা নিয়ে আসবে, খড়টা চাকায় পিষিয়ে, জল-মাটি-কাদায় মিশিয়ে দিয়ে আসবে।

মনে রাখতে হবে ধান আমাদের যতটা প্রয়োজন খড়ও ঠিক ততটাই প্রয়োজন। ভাত যেমন ১৬ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য, খড় তেমনি সাড়ে ৫ কোটি গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য। খড়কে ফেলে আসা যাবে না।

ভরা মৌসুমে এক মণ ধান যখন ৬০০ টাকা তখন মাঝারি এক বোঝা খর ২০০ টাকা। এ সব প্রযুক্তিগুলো যেখান থেকে আমদানি করা হয়েছে তাদের রয়েছে বিস্তর গোচারণ ভূমি, আমাদের নেই।

জমি চাষ পর্যায়টি প্রযুক্তির প্রভাবে পূর্ণযান্ত্রিকায়ন হয়ে গরুটানা কাঠের লাঙ্গল অবলোপন করেছে। সাশ্রয় হয়েছে শ্রম এবং সময়। কিন্তু এ পর্যায়ে পাওয়ার টিলার, হুইল ট্রাক্টর ইত্যাদি সর্বাংশ ধার করা যেসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে তা কি আমাদের জমির জন্য উপযোগী?

এ ক্ষেত্রে অবশ্য প্রয়োজন অনুপযোগিতাকে হার মানিয়েছে, কারণ যন্ত্রগুলো উঁচু-নিচু পথ অতিক্রমে সক্ষম। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হচ্ছে সাধারণত মাঠের মাঝখানের অপেক্ষাকৃত নিচু জমি থেকে চাষ এবং বোনা শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বিধায় ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে যন্ত্রগুলো নেয়া আনা সম্ভব হয়। তৃতীয়ত জমি চাষ ছাড়াও নানাবিধ কাজে সবসময় যন্ত্রগুলো ব্যবহার করা যায়। স্থানান্তরে ব্যাপক কষ্টসাধ্য যন্ত্রগুলো ব্যবহার করেও কি ব্যয় সংকোচন হচ্ছে?

প্রতি শতাংশ জমি একবার হাল চাষে খরচ গুণতে হয় মৌসুমভেদে ১১ টাকা থেকে ১৮ টাকা। আগাছা পরিষ্কারসহ জমি চারা লাগানোর উপযোগী করতে ৩ বার চাষ ও একবার মই দিতে হয়। তাতে গড়ে শতাংশপ্রতি চাষ বাবদ খরচ হয় প্রায় ৫০ টাকা।

বীজ বপন বা চারা রোপনের জন্য বিজ্ঞাপিত যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের ড্রাম সীডার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ইত্যাদি। এর মধ্যে ড্রাম সীডার একটি সহজ কৌশল কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে ড্রাম সীডারে বীজ বপন করতে হয় বীজতলার চারা রোপনের প্রায় ১৫ দিন পূর্বে। কিন্তু আমন মৌসুমে জমিতে থাকে বর্ষার জল, আর বোরো মৌসুমে থাকে রবিশস্য। যেখানে ১ দিনও ছাড় দেয়ার কোন সুযোগ থাকে না। অপরদিকে একসাথে ৪ সারি রোপন উপযোগী একেকটা রাইস ট্রান্সপ্লান্টার প্রায় ২০০ কেজি ওজনের ও প্রায় ৪ ফুট ডানা বিশিষ্ট ভারি যন্ত্র। এর ব্যবহার, স্থানান্তর, রোপন কৌশল, ট্রে পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি, কোনটিই আমাদের নিকট স্বস্তিদায়ক নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের কেমন প্রযুক্তি প্রয়োজন। ১) সহজ পৃথকীকরণ ও সংযোজনযোগ্যঃ কারণ ১০০ কেজি থেকে ৫০০ কেজি ওজনের কোন যন্ত্র উঁচু হালট, সরু আলপথ, ড্রেন, জল-কাদা, খানা-খন্দ পেরিয়ে গন্তব্যে নিতে হলে যন্ত্রগুলোকে পৃথক পৃথক করে জমিতে নিয়ে সংযোজন করে ব্যবহার করতে হবে। ২) সহজ বহনযোগ্যঃ অর্থাৎ পৃথক যন্ত্রাংশগুলোও সহজ বহনযোগ্য হতে হবে। ৩) দেশজ প্রযুক্তিতে তৈরিঃ অর্থাৎ মূল যন্ত্রাংশ থেকে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, নাট-¯স্ক্রু পর্যন্ত স্থানীয় ভাবে উৎপাদনযোগ্য ও সহজপ্রাপ্য হতে হবে। ৪) একই যন্ত্রাংশ একাধিক যন্ত্রকৌশলে ব্যবহারযোগ্যঃ যেমন আমরা যে বৈদ্যুতিক মোটর বা ডিজেল ইঞ্জিন সেচের কাজে ব্যবহার করি, সেটাই থ্রিসার বা মাড়াই কলে ব্যবহার করি, আবার তাতে পাখা লাগিয়ে ধান উড়ানোর কাজে ব্যবহার করি, সেই মোটর বা ডিজেল ইঞ্জিনটাই যদি আমরা লাঙ্গল টানার কৌশলে বা ধান কাটার কৌশলে সংযোজন করতে পারতাম তাহলে ধান চাষে ব্যয় যথার্থই হ্রাস পেত। ৫) প্রাকৃতিক প্রতিকুলতাঃ প্রকৃতির আচরণ উৎপাদন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। প্রযুক্তি নির্বাচনে প্রাকৃতিক প্রতিকুলতাকে বিশেষ বিবেচনায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের ৪৫ লক্ষ হেক্টর জলজ কৃষি জমি রয়েছে এবং প্রতি বোরো মৌসুমে গড়ে প্রায় ৩৫০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়।

৬) সহজ সংরক্ষণযোগ্যঃ আমাদের দেশ ঝড়-ঝঞ্ঝা, বৃষ্টি-বাদল, কীট-পতঙ্গ, ছত্রাক-মরিচার দেশ। এ দেশে যন্ত্রপাতি ব্যবহারকালীন ক্ষয়ের চেয়ে অব্যবহারকালীন সংরক্ষণকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ব্যবহার হবে ৩ মাস অব্যবহৃত ৯ মাস। ৭) স্বল্প মূল্য সংগতি-সংযুক্তিসহ বিবিধ দুর্বলতাজনিত কারণে সাড়ে তিন লক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকা দামের প্রযুক্তির উপযুক্ত আমরা নই। সর্বোপরি প্রযুক্তি হতে হবে আমাদের মত প্রান্তিক চাষীদের সামর্থ উপযোগী।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক টঙ্গী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×